পক্ষী-পুরাণ
সুবিখ্যাত ফরাসী গ্রন্থকার আনাতোল ফ্রাঁস তাঁহার 'পেঙ্গুইন আইল্যান্ড' নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে দেখাইয়াছেন, কি করিয়া পেঙ্গুইন পাখিরা মানুষে রূপান্তরিত হইল এবং নানা বিবর্তনের ভিতর দিয়া শেষ পর্যন্ত তাহাদের কি পরিণতি ঘটিল। পাখিকে মানুষে পরিণত করিবার জন্য কোনও দুরূহ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সাহায্য লইতে হয় নাই। ভগবানের ইচ্ছা হইল—পাখিরা মানুষ হোক, অমনই তাহারা মানুষ হইয়া গেল।
প্রাগৈতিহাসিক যুগে বঙ্গদেশেও অনুরূপ ঘটনা ঘটিয়াছে। আনাতোল ফ্রাঁস বোধ হয় খবরটি টের পান নাই, পাইলে তাহা নিশ্চয় উক্ত পুস্তকের একটি অধ্যায় বৃদ্ধি করিত।
প্রাচীন আর্যগণ বাংলা দেশের তদানীন্তন অধিবাসীদের পক্ষীজাতি বলিয়াই বর্ণনা করিয়াছেন। সুধী-সমাজে এ কথা সুবিদিত। যে কথাটি সুবিদিত নয়, তাহাই আমি বর্ণনা করিতেছি।
পিতামহ ব্রহ্মা একদা নিভৃতে নীরবে মননশক্তি-সহযোগে দেবী সরস্বতীর সহিত নিরুক্ত আলোচনায় নিমগ্ন ছিলেন। সহসা একটা বেসুরা বিকট চীৎকারে আলোচনা বিঘ্নিত হইল। তিনি উঠিয়া আসিয়া একজন দেবদূতকে চীৎকারের কারণ নির্ণয় করিতে আদেশ করিলেন।
দেবদূত একটু পরে আসিয়া শুদ্ধ ভাষায় খবর দিল, কমলযোনি, বঙ্গদেশবাসী পক্ষীকুল কলরব করিতেছে। তাহাদের নিবৃত্ত হইতে অনুরোধ করিলাম, কিন্তু তাহারা আমার কথা শুনিল না।
মহা ফ্যাসাদে পড়া গেল তো!
পিতামহ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বীণাপাণির দিকে তাকাইলেন।
ওদের মানুষ ক'রে দিন। মানুষ হ'লে ওরা সভ্য হবে।
বীণাপাণি হাসিয়া অনুরোধ করিলেন।
পিতামহ বাংলা দেশের পক্ষীজাতিকে মানুষ করিয়া দিলেন। মনুষ্যাঁভূত পক্ষীগুলি কিন্তু বিপদে পড়িয়া গেল। পক্ষীরূপে তাহারা মন্দ ছিল না। এদিক ওদিক হইতে খাঁটিয়া আহার করিত, গাছের ডালে রাত কাটাইত, যৌবনকালে মনোমত সঙ্গী বা সঙ্গিনী জুটাইয়া প্রণয় করিত, খড়-কুটা সংগ্রহ করিয়া নীড় বাঁধিত, ডিম পাড়িত, ডিমে তা দিত, শাবকগুলি বড় না হওয়া পর্যন্ত তাহাদের প্রতিপালন করিত, তাহার পর তাহাদের পালক গজাইলে তাহারা উড়িয়া চলিয়া যাইত। সরল স্বাভাবিক জীবন ছিল তাহাদের। মানুষ হইয়া তাহারা বিপদে পড়িয়া গেল। অত সহজে খাবার, বাসা, সঙ্গী, সঙ্গিনী কিছুই পাওয়া যায় না।
এখন যেমন আমরা কথায় কথায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দৌড়াই তখন মর্তবাসীরা তেমনই সোজা বিধাতার কাছে দৌড়াইতে পারিত। বিধাতাকে খুব বেশী বিরক্ত করার ফলেই বোধ হয় অধুনা আমরা এই সুবিধাটুকু হারাইয়াছি।
বঙ্গদেশ হইতে কান-ছোট সম্প্রদায়ের দলপতি নিখিল-নব-সৃষ্ট-মনুষ্যজাতির প্রতিনিধিরূপে একদা পিতামহের দরবারে গিয়া হাজির হইলেন। নব-সৃষ্ট-মনুষ্য-সমাজও নানা দলে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। কান-ছোট, নাক-লম্বা, চুল-কোঁকড়া, চোখ-কটা, চিরুন-দাঁত, নাদা-পেটা প্রভৃতি নানারূপ শ্রেণী-বিভাগ ছিল তাঁহাদের। যে সময়ের কথা লিখিতেছি, সে-সময় কান-ছোট সম্প্রদায়ের খুব বাড়-বাড়ন্ত।
কান-ছোট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি পিতামহকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়া কহিলেন, প্রভো, আমরা মহা অসুবিধায় পড়িয়াছি। পক্ষীরূপে আমরা সুন্দর ছিলাম, মানুষ হইয়া আমাদের কষ্টের অবধি নাই। উপার্জন করিয়া খাইতে হইবে, কিন্তু কি করিয়া উপার্জন করিব তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। অন্য-প্রদেশবাসীরা শুনিয়াছি ব্যবসায় করে, কিন্তু ধন না থাকিলে ব্যবসায় করা যায় না। আমাদের কিছু ধন দিন।
পিতামহ রেবতী নক্ষত্র-মণ্ডলীতে একটি নব সৌরলোকের পরিকল্পনায় তন্ময় ছিলেন। কল্পনা বাধা পাওয়াতে অষ্ট ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া ক্ষুদ্রকর্ণ খর্বকায় ব্যক্তিটির দিকে চাহিলেন। তাহার পর ঈষৎ বিরক্ত-কন্ঠে বলিলেন, তোমাদের প্রত্যেককেই তো ধন দিয়েছি, আবার ঘ্যান ঘ্যান করছ কেন?
প্রতিনিধিটি সভয়ে শুদ্ধ বাংলা বলিতেছিলেন। পিতামহের মুখে চলতি বাংলা শুনিয়া একটু অবাক হইয়া গেলেন। সাহসও পাইলেন।
বলিলেন, কই, আমরা তো কিছুই পাই নি পিতামহ!
আরে, কি আপদ! ধন মানে শক্তি। তোমাদের প্রত্যেককেই প্রচুর শক্তি দিই নি? যাও চ'রে খাওগে, বিরক্ত করো না।
শুধু শক্তিতে কিছু হয় না পিতামহ। মনুষ্য-সমাজে ব্যবসা করতে গেলে মূলধন চাই। কিছু মূলধন দিন আমাদের।
তা হ'লে বিশ্বকর্মার কাছে যাও। বিশু, ও বিশু! —পিতামহের হাঁকা-হাঁকিতে বিশ্বকর্মা দ্বার-প্রান্তে আসিয়া উঁকি দিলেন।
আমাকে ডাকছেন?
হ্যাঁ, এ কি চাইছে একে দাও, যত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments