গণহত্যা
আমরা তাদেরকে খুঁজে খুঁজে খতম করছি।—মেজর বশির, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। রাত আটটা ধানমন্ডিস্থ ৩২নং সড়কের প্রবেশমুখে একটি গলিতে একটি পরিচিত রিকশা দ্রুতগতিতে এসে থামলো। যে ভবনের বাইরে এসে থেমেছে সে ভবনটি হলো শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন। রিকশা চালক কাশছিল এবং হাঁপাচ্ছিল। সে বললো, 'বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি জরুরি চিরকুট নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে রিকশা চালিয়ে এসেছি। বাংলায় লেখা স্বাক্ষরবিহীন চিরকুট বার্তাটি ছিল সংক্ষিপ্ত: "আপনার বাসভবন আজ রাতে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে।”
সে সময়ে সেখানে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের একজন আমাকে বলেছিলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আসন্ন হামলার খবর ঐ চিরকুটে তাঁরা প্রথমবারের মতো পেয়েছিলেন। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অঘোষিত প্রস্থান আওয়ামী লীগ মহলে বেশ নাড়া দিয়েছিল। তারপরেই যখন সেনাবাহিনীর অশুভ গতিবিধির লক্ষণ দেখা দিল তখন শেখ মুজিব তাঁর সহকর্মীদের সতর্ক করে দিলেন এবং গা ঢাকা দেয়ার প্রস্তুতি নিতে বললেন। বঙ্গবন্ধু নিজে কোনো সতর্কতা অবলম্বন করতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, 'আমার জায়গায়' অর্থাৎ নিজ বাড়িতেই থাকবো। তখন থেকেই ক'জন বাঙালি তার খবর রেখেছেন। শেখ মুজিবের বেশ ক'জন অনুসারী আধঘণ্টা পরপর তাঁর বাসায় টেলিফোন করে তাঁর নিরাপত্তা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন।' তাঁর গৃহভৃত্য 'হু' 'হ্যাঁ' ধরনের জবাব দিচ্ছিল। রাত দেড়টায়, আড়াই ঘণ্টা পরে, গোলাগুলির আওয়াজে আকাশ বাতাস উত্তাল। আগুনের চোখ-ধাঁধানো শিখায় রাতের আকাশ যখন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, সে সময় শেখ মুজিবের বাসার টেলিফোনটি স্তব্ধ হয়ে গেল। ভীষণ আতঙ্কের ভেতরে একথা প্রচারিত হলো যে, সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করেছে।
একজন প্রতিবেশী তিন সপ্তাহ পরে বাড়ির দেয়ালে বুলেটের গর্তের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে কীভাবে শেখ মুজিব শান্ত অবস্থায় গ্রেফতারকারীদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সেদিনের সে ঘটনা স্মরণ করে আমাকে সব বললেন।
তিনি বললেন, রাত দেড়টায় সেনাবাহিনীর দু'টি জীপ ও কয়েকটি ট্রাক ৩২নং সড়কের সদর দরজায় এসে থামলো। কয়েক মুহূর্ত পর পাকসেনারা পঙ্গপালের মত বঙ্গবন্ধুর বাড়ির বাগানে সমবেত হলো। বাড়ির ছাদ ও ওপর তলার জানালা লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়া হলো। সেনাবাহিনীর লোকেরা সরাসরি আক্রমণ করেনি শুধু ভয় দেখাচ্ছিল। তখন এই গোলমালের মধ্যে শেখ মুজিব তাঁর ওপর তলার শোবার ঘরে ছিলেন। সেখান থেকে শোনা গেল, 'তোমরা অমন বর্বরের মতো আচরণ করছো কেন? আমাকে তোমরা ডাকলেই তো আমি তোমাদের কাছে নেমে আসতাম।' পাজামার ওপর তামাটে লাল রঙের গাউন পরিহিত শেখ মুজিব সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন, সেখানে একজন তরুণ ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে ছিল। আমার সংবাদদাতা. আমাকে বলেছেন যে, এই অফিসারটি ছিল বিনয়ী ও নম্র স্বভাবের। সে দৃঢ় ও বিনয়ী কণ্ঠে বললো, আমার সঙ্গে চলে আসুন স্যার। তারপর শেখ মুজিবকে নিয়ে তারা সবাই গাড়িতে উঠে চলে গেল।
বেগম মুজিব ও তাঁদের শিশু পুত্র পাশের বাড়িতে পালিয়ে যাওয়ার এক ঘণ্টা পরে সেনাভর্তি আরেকটি ট্রাক ঘটনাস্থলে এসে দাঁড়াল। এবার পাক সেনারা মোটেই ভদ্র ব্যবহার করল না। তারা নিচের তলার প্রতিটি জনালার কাঁচ ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো করল। আসবাবপত্র, বিছানাপত্র ও পুস্তক রাখার আলমারিগুলো উল্টিয়ে পাল্টিয়ে তছনছ করে দিল। দেওয়াল থেকে আলোকচিত্র ও তৈলচিত্রগুলো বিচ্ছিন্ন করে ভেঙ্গেচুরে মেঝের উপর ইতস্ততঃ ছড়িয়ে ফেললো। হালকা রূপালী ফ্রেমে আঁটা চীনের চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর স্বাক্ষরকৃত একটি ছবি তার মধ্যে ছিল। আমি ভেবে বিস্মিত হলাম শেখ মুজিব এ ছবি কি করে পেলেন। পাকসেনারা ঠিক কোনো কিছুর খোঁজ করছিল না। তারা যেন শত্রুকে হাতের মুঠোয় পেয়ে তাকে ছিন্নভিন্ন করছিল যেমন আহত বাঘ বৃষকে আক্রমণ করে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমি যখন শেখ মুজিবের বাড়িতে যাই, তখন এসব কিছুরই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments