আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
লেখক: অজয় রায়
১৯৬৮-৬৯-এর গণআন্দোলন, স্বাধীনতা-পূর্ব স্বায়ত্তশাসন থেকে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং এর ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মচারীরা এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের অবদান, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং সর্বোপরি রণাঙ্গনে ছাত্রদের সাহসী অবদান আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। শুধু কি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়গুলোতে, এরও আগে ১৯৪৮ সাল থেকে ৫২ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি স্তরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি শিক্ষকরা প্রকাশ করেছিলেন। সেদিনের ছাত্রদের ভূমিকা আজ আর কারও অজানা নেই, কাজেই তাদের কথা আজ আর বলব না। শুধু এটুকু বলি, সেদিন আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য সেদিনের ছাত্র শেখ মুজিব, ভাষা মতিন ও ডাকসুর সহসভাপতি অরবিন্দ বোসসহ ২৬ জন ছাত্রছাত্রীকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। এ কথা তো অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, ভাষা আন্দোলনই হলো পরবর্তীকালের স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসন ও ছয় দফা আন্দোলনের পথিকৃৎ। ভাষা আন্দোলনের ফলেই অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের খোলস ছেড়ে বাঙালী মুসলমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছে, সাধারণ মানুষ দেখেছে কীভাবে ভাষা আন্দোলন ধর্মের সীমাকে অতিক্রম করে একটি সেক্যুলার অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, যে আন্দোলনে সকল ধর্মের মানুষ, সকল শ্রেণীর মানুষ একত্রে শামিল হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল যে, আন্দোলনের প্রথম দিকে সামান্য কিছু সময় ব্যতিরেকে এই আন্দোলন সব সময় প্রগতিশীল নেতৃত্বের হাতে ছিল। প্রথম দিকে ছাত্র প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাম ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশন, পরবর্তীকালে যুবলীগ, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পরিচালিত ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশ, ছাত্র ইউনিয়ন এর নেতৃত্ব প্রদান করেছিল।
এ কথাও সত্য যে, প্রথমদিকে ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত বুদ্ধিজীবীদের, বিশেষ করে শিক্ষকদের মধ্যে একাডেমিক আলোচনার মধ্যে আবদ্ধ। এর পুরোভাগে ছিলেন ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পরিসংখ্যানবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন আর সক্রিয়ভাবে এর সাথে যুক্ত ছিলেন ড. পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, মুনির চৌধুরী, আবুল কাশেম, নুরুল হক ভূঁইয়া, অজিত গুহ প্রমুখ শিক্ষক। এ কারণে মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, মুনির চৌধুরী, ড. পৃথ্বীশ চক্রবর্তী এবং জগন্নাথ কলেজের অজিত গুহকে সরকার কারাগারে অন্তরীণ করে। পরে দেশদ্রোহের অভিযোগ তুলে ড. চক্রবর্তীকে পাকিস্তান ত্যাগে বাধ্য করা হয়। ভাষা আন্দোলন থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সকল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন যে সেক্যুলার চরিত্র ধারণ করে, তা থেকে এতদঞ্চলের সাধারণ মানুষ বিচ্যুত হয়নি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এই সেক্যুলার অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগ্রাম আন্দোলনের অনিবার্য ও সফল পরিণতি। বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রক্ষণশীল গোষ্ঠীর পুনরুত্থানের আন্দোলনের পরাজয়ের ইতিহাস। ইতিহাসের নানা পর্বে তা বারংবার প্রদর্শিত হয়েছে-ভাষা আন্দোলনে, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে, আইয়ুববিরোধী জনতার ৬ দফা ও স্বাধিকার আন্দোলনে, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে এবং সর্বশেষে মুক্তিযুদ্ধে সর্বত্র মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির পরাজয় ঘটেছে, জয় হয়েছে অপরিসীম ত্যাগের মধ্য দিয়ে হলেও সেক্যুলার গণতান্ত্রিক শক্তির, আর সাধারণ মানুষের। এখানেই বাঙালী জাতির অনন্যতা-তাদের মাঝে বহুবৈচিত্র্যের মানবিক বাণী অন্তরের গভীরে প্রোথিত।
'৬৯-এর গণআন্দোলনে ও পুরো '৭০ সালব্যাপী স্বাধিকার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল দেশবাসীর সাথে পাশে দাঁড়িয়ে। এর সাথে শিক্ষকরা আইয়ুব খানের দেয়া বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডারের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এক দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৫ ফেব্রুয়ারিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ১৮ ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং রসায়ন বিভাগের রিডার ড. শামসুদ্দোহাকে সেনাবাহিনী হত্যা করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং সান্ধ্য আইন ভেঙে জনতার সাথে রাজপথে নেমে আসে। জনতার সেই উত্তাল আন্দোলনে ভেসে গেল আইয়ুব খানের সিংহাসন। শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments