সেকেলে ফ্যাসিবাদ: ভূমিকা
[সেকেলে ফ্যাসিবাদসংকলন গ্রন্থের ভূমিকার জন্য সংক্ষিপ্ত আকারে লিখিত]
সংকলন এক যৌথকর্ম। তবুও বইটি প্রকাশে আমার নিজের কোনো কৃতিত্ব নেই। কারণ এর সব লেখা পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত পরিচয় পত্রিকার ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী সংখ্যা’য় প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৫ সালে (মে-জুলাই)। সেটির কলেবর ছিল আরও বৃহৎ। পুরনো সেই সংখ্যাটি থেকে সময়োপযোগী ১৯টি লেখা নিয়ে বর্তমান সংকলনটি করা হলো। এজন্য পরিচয় পরিবারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার করছি। সংকলনটির নাম নিয়ে ভেবে ভেবে সময়ক্ষেপণ হয়েছে, কিন্তু কোনো জুতসই শিরোনাম মাথায় আসেনি। অগত্যা বর্তমান নামটিই চূড়ান্ত করা হলো।
বর্তমান সংকলনে বিভিন্ন লেখায় একাধিক বানানরীতি রয়েছে। সেক্ষেত্রে লেখকের বানানরীতি অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। যেমন: ফ্যাসিস্ট, ফ্যাসিস্ত; ফ্যাসিজম, ফ্যাশিজম্; সোভিয়েত, সোভিয়েট প্রভৃতি। তবে কয়েকটি লেখায় যে শব্দগুলো সবকালেই ভুল বলে স্বীকৃত, সেগুলোর বানান ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি।
সম্প্রতি ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত ও আলোচিত। অদূর ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। যদিও শব্দটি বেশ শক্ত ও জটিল, কিন্তু বর্তমান সময়ের আধিপত্য (ঐবমবসড়হু) একে সাধারণের কাছে সুপরিচিত করেছে এবং প্রাকৃতজনের কথ্যভাষায় রূপ দিয়েছে। ফলে শব্দটির যথাযথ অর্থ, সংজ্ঞা ও ইতিহাস জানা জরুরি হয়ে পড়েছে। সে তাগিদ থেকেই এই সংকলন। আশা করছি বইটি ফ্যাসিজমের উত্থানপর্বের দিনগুলোর চিত্রকল্প এবং এর আঘাতে জর্জরিত বিশ্বমানবতার আর্তচিৎকার পাঠকের কল্পনায় ফুটিয়ে তুলতে ভূমিকা পালন করবে।
ফ্যাসিবাদ কী?—এই প্রশ্নের এক-কথার-জবাব নেই। তবে ফ্যাসিস্ট বললেই যে নাম অথবা ছবিটি প্রথমেই মানসপটে ভেসে ওঠে, সেটা হলো—হিটলার। যদিও ফ্যাসিজমের প্রবক্তা ছিলেন মুসোলিনি। হিটলারের উত্থান মুসোলিনিকেও ছাড়িয়ে যায়। সেই উল্লম্ফন বা উত্থান সম্পর্কে জর্জ বার্নাড শ ‘ফ্যাসিস্ট নায়কের উত্থান-পতন’ প্রবন্ধে লিখেছেন:
...১৯৩০-এ মিউনিখে ছিল হিটলার নামে এক তরুণ, চার বছরের যুদ্ধে সে সৈনিক ছিল। কোনো বিশেষ সামরিক গুণপনা না থাকায় আয়রন ক্রস ও করপোরালের পদের চেয়ে বড় কিছু তার ভাগ্যে জোটেনি। হিটলার ছিল গরীব। কোনো শ্রেণীতেই তাকে ফেলা যেত না। সে ছিল বোহেমিয়ান; শিল্পে কিছুটা রুচি ছিল, কিন্তু শিল্পী হিসেবে সফল হবার শিক্ষা বা প্রতিভা ছিল না। ফলে সে আটকে ছিল বুর্জোয়াশ্রেণী ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যখানে, বুর্জোয়াশ্রেণীতে যাবার মতো আয় ছিল না, আবার শ্রমিকশ্রেণীতে যাবার মতো কারিগরি দক্ষতা ছিল না। কিন্তু তার ছিল কণ্ঠস্বর, বক্তৃতা করতে পারত। সে হয়ে উঠল বীয়ারের আড্ডার বক্তা, সেখানকার শ্রোতাদের সে জমিয়ে রাখতে পারত।...
অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে বিনা-বাক্য-ব্যয়ে ফ্যাসিস্ট চিনলেও, ফ্যাসিজম সম্পর্কে ধারণা অনেক ক্ষেত্রে গোলমেলে। কী কী উপসর্গ বা অনুসর্গ দেখে ফ্যাসিস্ট চিনব বা ফ্যাসিজম বলব তা সিসিটিভি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বইয়ে অর্ণব সান্যাল চমৎকারভাবে চিত্রিত করেছেন। পড়লেই মনে হতে পারে—‘আমার অফিসের বস তো একটা ফ্যাসিস্ট’, ‘লোকাল বাসে পাশে বসা অচেনা সহযাত্রী, তিনিও তো ফ্যাসিস্ট’, ‘বাসায় ফিরে আমিও তো একজন ফ্যাসিস্ট’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
এক কথায়—ফ্যাসিবাদ হলো পুঁজিবাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ। কোনো অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী একনায়ক বলে-কয়ে ফ্যাসিবাদী বা ফ্যাসিস্ট হয় না। ক্ষমতাকে যেকোনো উপায়ে টিকিয়ে রাখতে, নিরঙ্কুশ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে ক্রমশ ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে। এটা এক বহুতল দালানে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে শিখরে আরোহণ করার মতো ব্যাপার। আর যত উপরে উঠবে পতনের আশঙ্কা ততই বাড়বে। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে ‘ফ্যাসিবাদ ও বিপ্লব’ প্রবন্ধে মোহিত সেন চমৎকারভাবে বলেছেন:
...ফ্যাসিবাদ কী? এর শ্রেণীগত সারমর্ম হল—এক প্রকাশ্য সন্ত্রাসমূলক একনায়কতন্ত্রী ধরনে একচেটিয়া পুঁজির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে উগ্র জাত্যভিমানী ও সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির শাসন। পুঁজিপতিশ্রেণীর সমস্ত শক্তির শাসন তা নয়, এমন কি সমস্ত একচেটিয়া পুঁজিপতির শাসনও নয়, এ হল তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির শাসন।...
...ফ্যাসিবাদের অর্থ হল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments