-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সমস্ত জাতীয়তাবাদী মুসলমান নেতা সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন, তাদের প্রথম সারির মধ্যে মওলানা আবুল কালাম আজাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অবিভক্ত ভারতের সর্বত্র সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এই নামটি সবচেয়ে সুপরিচিত। মওলানা আজাদ তাঁর আত্মজীবনীতে নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে যে কথাগুলি লিখে গেছেন, তা থেকেই আমরা ভারতের এই প্রতিভাশালী, সদা সক্রিয়, স্থিরবুদ্ধি ও দৃঢ়চিত্ত চরিত্রটির পরিচয় পেয়েছি।
মওলানা আজাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে একজন বাবরের ভারত অভিযানের সময় হিরাট থেকে এদেশে এসেছিলেন। মোগল রাজত্বের যুগে এই বংশের বহু কৃতি পুরুষ ধর্মীয় ক্ষেত্রে এবং সরকারী প্রশাসন কার্যে বিশিষ্ট স্থান গ্রহণ করে এসেছেন। মওলানা আজাদের পিতামহের যখন
-
১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটল। ভারতের রাজধানী দিল্লী শহর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্বাধীনে এসে গেল, আসলে এটা একটা আকস্মিক ব্যাপার নয়। বহুদিন আগে থেকেই ভারতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাকে এই অনির্বায পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল। যাদের দেখবার মত চোখ ছিল তারা দেখতেও পাচ্ছিলেন যে তার সর্বদেহে ক্ষয়রোগের লক্ষণগুলি ফুটে উঠেছে। এ এক বিরাট মহীরুহ, যার ভিতরকার সমস্ত সার পদার্থ একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাহলেও সাধারণের দৃষ্টির সামনে এতদিন সে তার প্রভুত্বব্যঞ্জক মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, অবশেষে সেই মহীরুহের পতন ঘটল; চমকিত হয়ে উঠল সবাই। দিল্লীশ্বরেরা জগদীশ্বরেরা শেষকালে এই হলো তার পরিণতি।
মুঘল সাম্রাজ্য সত্য কথা বলতে
-
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ লোকের মুখে মুখে সিপাহী বিদ্রোহ নামে প্রচলিত হয়ে এসেছে, এই নামটা আমরা পেয়েছিলাম ইংরেজদের কাছ থেকে। ব্র্রিটিশ সরকার এর নাম দিয়েছিলো Sepoy Mutiny অর্থাৎ সৈন্য বিদ্রোহ। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে তাই মনে হবে বটে তার কারণ গোরা সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহীদের স্বল্পবেতন উর্ধ্বতন নাগরিক প্রভুদের দুর্ব্যবহার এবং নানা রকম অভাব-অভিযোগ সৈন্যদের মধ্যে দীর্ঘদীন ধরে অসন্তোষ সঞ্চিত করে তুলছিল। এই সমস্ত অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল বলে ১৭৬৪ সালে দেশীয় সৈন্যদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সৈন্যদের মধ্যে এই জুলুম অবাধেই চলে আসছিল। ১৮৫৭ সালে দেশীয় সৈন্যরাই বিদ্রোহে প্রথম এবং প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এই সমস্ত কারণে
-
ময়মনসিংহের উত্তরে গারো পাহাড়ের পাদদেশে ১৯৩৭ সাল থেকে শুরু করে সুদীর্ঘ বারো বৎসর টংক প্রথার বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী ও জঙ্গী সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল টংক প্রথা হচ্ছে কৃষকদের উপর এক প্রকার জঘন্য ও বর্বরতম সামন্তবাদী শোষণ। টংক কৃষকদের জমিতে কোন কর্তৃত্ব ছিল না। জমিতে ধান হোক বা না হোক টংক কৃষকদের জমির মালিক জমিদার ও অন্যান্যদের ধানে খাজনা দিতেই হতো। টাকায় খাজনা না দিয়ে এই প্রথার খাজনায় কৃষকরা মারাত্মক রকম শোষণের শিকার হতো। এই প্রথার বিরুদ্ধে এবং টাকায় খাজনা দেওয়ার দাবিতে টংক কৃষকের মরণপণ সংগ্রাম বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনে এক গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে।
শোষণে জর্জরিত হয়ে টংক কৃষকরা যখন
-
দক্ষিণ এশিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস চর্চার বিষয় হচ্ছে, কিভাবে নতুন শক্তির প্রভাবে স্থানীয় রাজ্যসমূহে ভাঙ্গন ধরে, কিভাবে শাসকশ্রেণীকে পর্যুদস্ত করা হয়; এবং কিভাবে ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানাদি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ার ফল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন। এ রাষ্ট্র গঠন ছিল এমনি একটি রাজনৈতিক আইনগত প্রক্রিয়া যার মধ্যে বিশাল যুদ্ধের ভূমিকা খুব গৌণ। নতুন নতুন এলাকা একের পর এক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, প্রণীত হয়েছে নতুন আইন, স্থাপিত হয়েছে নতুন শোষণ ব্যবস্থা। ঐতিহাসিকগণ জানেন যে, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন ছিল একটি অবিরাম প্রক্রিয়া, যা সব সময় শ্রেষ্ঠ ঘটনাসমূহের সমান্তরালে চলেনি, যদিও তাঁরা ওসব ঘটনাকে সমধিক গুরুত্ব
-
কবি সত্যেন দত্ত বহুদিন আগে মেথরদের উদ্দেশ করে ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন ‘কে বলে তোমারে বন্ধু অস্পৃশ্য অশুচি?’ কিন্তু তা হলেও মেথর সম্প্রদায় আমাদের সমাজে এখনও অশুচি বলেই গণ্য। আর এই বৃত্তি অবলম্বন করার ফলে যেই পরিবেশের মধ্যে তাদের বাস করতে হয়, তা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পক্ষে একেবারেই প্রতিকূল। অথচ তারা তাদের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নিলে সারা শহর-জীবন অচল হয়ে পড়বে। জননীর মতো, চিকিৎসকের মতো শহর-জীবনকে যারা সর্বভাবে পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত করে চলেছে তাদের কাজ কেমন করে নীচ ও মর্যাদাহানিকর হতে পারে? যাদের নিরলস সেবা সমাজের শুচিতাকে রক্ষা করে চলেছে, তারাই হলো অশুচি! মোটামুটি সবাই এই দৃষ্টি নিয়েই তাদের দেখে
-
ঢাকা শহরের সুরসিক লোকেরা এককালে তাদের শহরের আর একটা নামকরণ করেছিল-‘বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি।’ সেই নাম আজ বিস্মৃতির পথে হারিয়ে গেছে। এই বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির উপরে বাইশ পঞ্চায়েত তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিয়ে সমাজ রক্ষার কাজ চালাত। তাদের কথার উপর কারুর কথা বলা চলত না। বাইশ পঞ্চায়েত আজও বেঁচে আছে। কিন্তু একে বেঁচে থাকা বলা চলে না। তার মূলগুলো একটা একটা করে মরে যাচ্ছে, ডালগুলো অবসন্ন হয়ে শুয়ে পড়েছে। পাতাগুলো খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। তার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে এলো বলে। কালের অমোঘ বিধান কে লংঘন করতে পারে। এমন প্রবল প্রতাপশালী সরদার আর তাদের পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা! কালের বিধানে তাদেরও আজ সসম্মানে
-
পূজার নাটমণ্ডপগুলি নাচঘরে রূপান্তরিত হবার আগে পূজা উপলক্ষে যাত্রা, কবিগান, কীর্তন, কথকতা-এই সমস্তই চলত। নাচঘর নিয়ে এলো নতুন জিনিস-ঢপ, কীর্তন, খেমটা আর বাইজীদের নাচ-গান।
জীবন বাবুর বাড়ির নাচঘরের মালিক গোকুল রায়ের পিতা গৌরচন্দ্র রায় ঢপ, কীর্তন প্রবর্তন করেছিলেন। ঢপ পূর্ববঙ্গের কোথাও প্রচলিত ছিল না। ঢপ কীর্তনের দল কলকাতা থেকে আমদানী করা হতো। সাধারণ কীর্তনের মতোই এই বিশেষ ধরনের কীর্তন বঙ্গীয় বৈষ্ণব ধর্মের আদি ভূমি নবদ্বীপ, শান্তিপুর ও কাটোয়ার মাটিতে জন্মলাভ করেছিল। ঢপ কীর্তনের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, মেয়েরা এই কীর্তন গান গাইত।
পশ্চিম বঙ্গে বিশেষ করে কলকাতার নাগরিক আবহাওয়ায় খেমটা নাচ-গানের উৎপত্তি। কেউ কেউ মনে করেন সেখানকার হাফ আখড়াই গান
-
মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। সেদিনকার ঢাকা শহরের ছবিটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। সবচেয়ে বেশী করে মনে পড়ে সেই সময়কার ঘোড়ার গাড়ীর কথা। সেদিন যদি বলত, সামনে এমন দিন আসছে যেদিন শহরের বুক থেকে ঘোড়ার গাড়ীর নাম-নিশানা লোপ পেয়ে যাবে তা হলে কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারতাম না। কথাটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ঘোড়ার গাড়ী নেই, গাড়োয়ানরা নেই, অথচ ঢাকা শহর চলছে এমন একটা কথা ভাবা যায়! অথচ আমার এই চোখের সামনে দিয়ে এই ঘটনাটা ক্রমে ক্রমে ঘটে গেল। আজ সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখুন, বড়জোর দশ-বারোটা ঘোড়ার গাড়ীর খোঁজ পাবেন। পথ দিয়ে চলতে চলতে কখনো-কখনো তাদের
-
বিচিত্র এক জীবন। আমাদের এই বাংলাদেশে যারা শিল্পপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে এমন একটি জীবন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আমি হাজী মহম্মদ ফকীরচাঁদের কথা বলতে যাচ্ছি। নিঃস্ব নিরক্ষর এক এতিম, ভাগ্য যাকে কোনো দিক দিয়েই কোনো ভাবে অনুগ্রহ দেখায়নি। সে ছেলে কেমন করে একান্ত ভাবে নিজের বুদ্ধি ও নিষ্ঠার জোরে ব্যর্থতার বাধা ডিঙ্গিয়ে অবশেষে সাফল্যের মঞ্জিলে এসে পৌঁছাল আমাদের এই ব্যবসা বিমুখ বাঙ্গালি সমাজে তা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তরূপে পথ নির্দেশ করতে পারে।
পিতার নাম আলিজান ব্যাপারী। তাঁর আদি নিবাস রহমতগঞ্জে, পরে উর্দু রোডে চলে আসেন। গরীব মেহনতী মানুষ। মৌলভী বাজারে তাঁর পৈত্রিক ফলের ব্যবসা ছিল। ফকীরচাঁদ যখন
-
আজ থেকে অন্ততঃপক্ষে দেড় শো বছর আগেকার কথা। সেদিনকার ঢাকা শহর আর আজকার ঢাকা শহরের মধ্যে মিলের চেয়ে অ-মিলই বেশী। বাড়িঘর, পথঘাট, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা-সংস্কৃতি-প্রভেদ ছিল সব দিক দিয়েই। বাদশাহী আমলের প্রভাব তখনও সমাজের সর্বদেহে ব্যাপ্ত হয়েছিল। বৃটিশ শাসনের মূল তখন দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে চলেছে বটে, কিন্তু নতুন যুগের নতুন অর্থনীতি তখনও এখানকার প্রচলিত অর্থনীতিকে মরণ আঘাত হেনে ব্যাপক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে তোলে নি, দুটো বিপরীত অর্থনীতি তখন সবেমাত্র পরস্পরের সঙ্গে মোকাবিলা করছে এবং দু-একটা সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে ছোটোখাটো সংঘাত ও শক্তি পরীক্ষার সূচনা দেখা দিয়েছে।
সেদিন এই নগর তথা সারা প্রদেশের অর্থনৈতিক জীবনে বুড়ীগংগার এক বিরাট ভূমিকা ছিল।
-
সেদিন বুড়ীগঙ্গার তীরবর্তী আমাদের এই বাকল্যাণ্ড বাঁধের কথা বলছিলাম আহমদউল্লাহ সাহেবের সাথে। বলছিলাম—কি ছিল আর কি হয়ে গেল! কি দেখেছিলাম সে সময় আর কি দেখছি আজ! দশ বছর আগে যে লোক ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে যদি আজ ফিরে আসে, তাহলে বাকল্যান্ড বাঁধের শ্রী দেখে সে তাজ্জব বনে যাবে। আর যদি আমার মতো নেশাখোর ভ্রমণার্থীদের কেউ হয়, তাহলে মর্মান্তিক আঘাত পাবে। কতোদিনের কতো স্মৃতি এই নদী আর এই নদীতীরের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে! এখন তাই একান্ত বাধ্য হয়ে না পড়লে ও পথে পা বাড়াই না। কেনো এমন হলো? এই বাকল্যান্ড বাঁধের পিছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা অনেকেরই হয়তো
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
উৎস
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.