-
“সেই আমি প্রথম দেখলাম নজরুলকে, অন্য অনেক অসংখ্যের মতোই দেখামাত্র প্রেমে পড়ে গেলাম। চওড়া কাঁধে বলিষ্ঠ তাঁর দেহ, মাঝখান দিয়ে সোজা-সিঁথি-করা কোঁকড়া চুল গ্রীবা ছাপিয়ে প্লাবিত, মুখখানা বড়ো ও গোল ছাঁদের, নেত্র আয়ত ও কোণ রক্তিম। গায়ে গেরুয়া রঙের খদ্দর পাঞ্জাবি, কাঁধে সূর্যমূখী হলুদ চাদর। কণ্ঠে তাঁর হাসি, কণ্ঠে তাঁর গান, প্রাণে তাঁর অফুরান আনন্দ—সব মিলিয়ে মনোলুন্ঠনকারী একটি মানুষ। তাঁর জন্য আমি জগন্নাথ হল-এ যে-সভাটি আহ্বান করেছিলাম তাতে ভিড় জমে ছিল প্রচুর। দূর শহর থেকে ইডেন কলেজের অধ্যাপিকারাও এসেছিলেন, তাঁর গান ও কবিতা আবৃত্তি শুনে সকলেই মুগ্ধ: মৃত অথবা বৃদ্ধ অথবা প্রতিষ্ঠানীভূত না-হওয়া পর্যন্ত কবিদের বিষয়ে, যাঁরা স্বাস্থ্যকরভাবে সন্দিগ্ধ, সেই
-
ঢাকার খেলাধুলা
আজ থেকে পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে ঢাকাবাসীরা যে সকল খেলাধূলা', আমোদ-প্রোমদে লিপ্ত ছিল বর্তমানে তাতে বিরাট পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। কিছু বিলুপ্ত হয়েছে এবং কিছু বিলুপ্তির পথে। এদের সংখ্যা অনেক। সময়ে যতটা কুলাবে বর্ণনা করব।
এখানে 'মোরগ লড়াই' এর শখ খুবই জনপ্রিয় ছিল। শহরের আরমেনীয় এবং মুসলমান ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং এটিকে 'শাহী' শখ বলা হতো। শুধু শুনেছি তাই নয় ছবিতেও দেখেছি, কোম্পানি আমলের ফিরিংগি শাসকরাও জমায়েতের মধ্যে উপস্থিত থেকেছেন এবং মোরগ লড়াই করেছেন। আমাদের বাল্যকালে এই শখ পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং এর যৌবন গত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবুও মোরগ লড়াইএর জমায়েত অব্যাহত ছিল এবং মুন্সী গোলাম মাওলা
-
প্রাচীনকাল থেকেই পান হিন্দুস্থানের শোভা এবং নামসমূহের মধ্যে 'বাংলা পান', বাংলার বিশিষ্টতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলা পান যদিও বড় হয় এবং একটা পানেই গাল ভরে যায় কিন্তু তাতে কোনো সৌন্দর্য নেই এবং এই পানের ঝাঁঝ কোনো কোনো ঋতুতে অসহনীয় হয়ে যায়। পানের একটি প্রকার যাকে সাঁচি পান বলা হয় এটি অবশ্য নরম, ঝাঁঝ কম এবং স্বাদের দিক থেকেও ভাল, কিছুটা হলেও সুগন্ধি আছে। বাংলায় সর্বত্রই কম বেশি সাঁচি পান পাওয়া যায় এবং বিশিষ্ট লোকেরা এটিকে ব্যবহার করেন। এ কারণেই এখানকার একটি বাজারের নাম 'সাঁচি পান দরীবা", যা এখন বাজার নেই বরং মহল্লা হয়ে গেছে। এই পানের প্রকৃতি ঠাণ্ডা, এজন্য
-
রমনার কথা বলতে গিয়ে পুরানা পল্টন এবং সেই সঙ্গে মতিঝিল ও দিলকুশার কাহিনি শোনালাম এতক্ষণ। রমনার কথা আর বলা হয়নি।
এবার সেই রমনার কথা।
কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে খুবই মুষড়ে পড়েছিলাম। বড় শহরের কোনো উপকরণই ছিল না ঢাকায়। যেদিন মনটা কোনো কারণে বিষণ্ণ থাকত, সেদিন যে হারিয়ে যাব কোথাও-আয়তনে তেমন বড় ছিল না ঢাকা। লোকের ভিড়ে, গাড়ি-ঘোড়ার জটিল আবর্তে কিংবা পার্কের সবুজে একটু লুকোবো, না, সে সুযোগও ছিল না। ঢাকুরিয়ার মতো লেক নেই, আলিপুরের মতো চিড়িয়াখানা, মিনার্ভা, শ্রীরঙ্গম, স্টার কি ন্যাট্যভারতীর মতো থিয়েটার হল নেই, নেই কোনো এলাকার অলৌকিক কোনো ভালো লাগা, নেই মেট্রো, লাইটহাউস, গ্লোব, নিউ এম্পায়ার, এলিট প্রেক্ষাগৃহের
-
খোকন, বাবা দেখ তো, ঘরে হুটোপুটি করছে কারা?
আমি তখন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের গা-শেতল-করা মিসমিদের কবচ-এর পাতায় ডুবে। প্রাচীনদের মনে না পড়েই পারে না-সেই যে বইয়ের গোড়ায় জানাল। গলিয়ে আসা চকচকে ছোরা বাঁধা বাঁশের আঁকশি দুহাতে ধরা গল্পের বিস্মিত নায়কের ছবিখানার কথা। প্রতুল ব্যানার্জির অতুল আঁকা ছবিটা আজও হানা দেয অতীত কাছে এসে দাঁড়ালে। আমি তখন সেই ভয়ংকর মুহূর্তে অদৃশ্য ছোরার সঙ্গে জুঝে চলেছি, এমন সময় রান্নাঘর থেকে মায়ের আদেশ। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে দেখি আলমারির ওপরে যে বড় আয়না, তার সামনে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে ছোটো দুটো বানর লম্ফঝম্ফ করছে কিচিরমিচির শব্দে। আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিপক্ষদের দেখে
-
কবি সত্যেন দত্ত বহুদিন আগে মেথরদের উদ্দেশ করে ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন ‘কে বলে তোমারে বন্ধু অস্পৃশ্য অশুচি?’ কিন্তু তা হলেও মেথর সম্প্রদায় আমাদের সমাজে এখনও অশুচি বলেই গণ্য। আর এই বৃত্তি অবলম্বন করার ফলে যেই পরিবেশের মধ্যে তাদের বাস করতে হয়, তা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পক্ষে একেবারেই প্রতিকূল। অথচ তারা তাদের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নিলে সারা শহর-জীবন অচল হয়ে পড়বে। জননীর মতো, চিকিৎসকের মতো শহর-জীবনকে যারা সর্বভাবে পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত করে চলেছে তাদের কাজ কেমন করে নীচ ও মর্যাদাহানিকর হতে পারে? যাদের নিরলস সেবা সমাজের শুচিতাকে রক্ষা করে চলেছে, তারাই হলো অশুচি! মোটামুটি সবাই এই দৃষ্টি নিয়েই তাদের দেখে
-
ঢাকা শহরের সুরসিক লোকেরা এককালে তাদের শহরের আর একটা নামকরণ করেছিল-‘বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি।’ সেই নাম আজ বিস্মৃতির পথে হারিয়ে গেছে। এই বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির উপরে বাইশ পঞ্চায়েত তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিয়ে সমাজ রক্ষার কাজ চালাত। তাদের কথার উপর কারুর কথা বলা চলত না। বাইশ পঞ্চায়েত আজও বেঁচে আছে। কিন্তু একে বেঁচে থাকা বলা চলে না। তার মূলগুলো একটা একটা করে মরে যাচ্ছে, ডালগুলো অবসন্ন হয়ে শুয়ে পড়েছে। পাতাগুলো খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। তার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে এলো বলে। কালের অমোঘ বিধান কে লংঘন করতে পারে। এমন প্রবল প্রতাপশালী সরদার আর তাদের পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা! কালের বিধানে তাদেরও আজ সসম্মানে
-
মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। সেদিনকার ঢাকা শহরের ছবিটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। সবচেয়ে বেশী করে মনে পড়ে সেই সময়কার ঘোড়ার গাড়ীর কথা। সেদিন যদি বলত, সামনে এমন দিন আসছে যেদিন শহরের বুক থেকে ঘোড়ার গাড়ীর নাম-নিশানা লোপ পেয়ে যাবে তা হলে কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারতাম না। কথাটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ঘোড়ার গাড়ী নেই, গাড়োয়ানরা নেই, অথচ ঢাকা শহর চলছে এমন একটা কথা ভাবা যায়! অথচ আমার এই চোখের সামনে দিয়ে এই ঘটনাটা ক্রমে ক্রমে ঘটে গেল। আজ সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখুন, বড়জোর দশ-বারোটা ঘোড়ার গাড়ীর খোঁজ পাবেন। পথ দিয়ে চলতে চলতে কখনো-কখনো তাদের
-
১৯৪৬ সাল। ঢাকা জেলার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় বৎসর। আজ থেকে বাইশ বছর আগে এখানকার ৯,০০০ সুতাকল শ্রমিক দীর্ঘ তিন মাসব্যাপী ধর্মঘট সংগ্রাম পরিচালনার মধ্য দিয়ে সারা বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক রক্তরাঙ্গা অধ্যায় যোজনা করে দিয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিক তথা মেহনতী জনতার এ এক গৌরবময় উত্তরাধিকার। আজ আমাদের এখানকার শ্রমিক ভাইরা আর যারা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাঁদের মধ্যে এমন ক’জন আছেন যাঁরা সেই সময়কার সেই সমস্ত রোমাঞ্চকর ঘটনার সঙ্গে পরিচিত? বিশেষ করে তাঁদের মনে করেই এই কাহিনী লিখতে বসেছি।
নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার ওপারে ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিল, এপারে ২নং ঢাকেশ্বরী কটন মিল, লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল, চিত্তরঞ্জন কটন
-
লেখক: রফিকুল ইসলাম
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি, নগ্ন সামরিক শাসন ব্যবস্থা এবং তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রী ব্যবস্থায় ১৯৬৫ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা আইনানুগ করার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী সামরিক নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্তি আর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের ক্ষমতার বাইরে রাখার নীলনকশা কার্যকর করা। সেই কঠোর সামরিক শাসনের মধ্যে ও পূর্ব বাংলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংস্কারবিরোধী ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখে দাঁড়ানোর আন্দোলন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কনভোকেশন হাঙ্গামাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও সংবাদপত্র নির্যাতনবিরোধী আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্যবিরোধী দুই অর্থনীতির জন্য আন্দোলন ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে সামরিক স্বৈরাচার ও পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, যেসব আন্দোলনের
-
আপনি যদি কখনো শাহবাগের মোড়ে গিয়ে থাকেন, সেখানে দেখা পাবেন ঝরনা, কাজল, রিনা, মনোয়ারাদের। ওরা ফুল বিক্রি করে। মালা গাঁথে বিক্রি করার জন্য। আমরা তাদের বলব 'ফুলকন্যা'। ওরা ফুলের মতো সুন্দর, কিন্তু জীবনটা ফুলের মতো সুন্দর করে সাজাতে পারে না।
নানা রংবেরঙের ফুল দিয়ে সাজানোর মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের চির আনন্দের এবং বিশেষ অনুষ্ঠানের দিনগুলো উদ্যাপন করি। বিয়েবাড়ি, হলুদ, বউভাত সব অনুষ্ঠানই তার পূর্ণতা পায় হরেক রঙেয়ের ফুল দিয়ে সাজানোর মধ্য দিয়ে। আমাদের আনন্দের মুহূর্তগুলোর চিরসঙ্গী এই ফুল। আর এই ফুল বেচেই অনেক নারীর জীবন চলছে। শাহবাগে পাইকারি ফুলবিক্রেতা নারীদের সাথে কথা হচ্ছিল তাদের জীবন নিয়ে। সূর্য ওঠার আগে থেকেই
-
রিপোর্টার: সাইমন ড্রিং
[ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত লন্ডনের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের এই লেখাটি ছিল একাত্তরের গণহত্যা সম্পর্কে বহির্বিশ্বে প্রচারিত প্রথম কোনো প্রতিবেদন]
পূর্ব পাকিস্তনের জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সব বড় নেতাকেই গারদে ঢোকানো হয়েছে।
প্রথম সারির রাজনৈতিক কর্মীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর শেখ মুজিবের আন্দোলনের সমর্থক দুটো পত্রিকার কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার রাস্তার যে ট্যাংক নেমে আসে, সেগুলোর প্রধান লক্ষ্য ছিল ছাত্ররা। অবস্থাদৃষ্টে তা-ই মনে হচ্ছে।
তিন ব্যাটালিয়ন সেনা ঢাকা আক্রমণে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে একটি ছিল আর্মড, একটি আর্টিলারি ও আরেকটি পদাতিক। তারা রাত ১০টার পরপরই গ্যারিসন
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.