ঢাকার মিষ্টান্ন
বাংলা তার মিষ্টির জন্য সব সময়ই প্রসিদ্ধ। কিন্তু ঢাকার এই বিশিষ্টতা রয়েছে যে, এখানে বাঙালি এবং অবাঙালি উভয় প্রকারের মিষ্টি উত্তম তৈরি হয়। আমাদের বাল্যকালে আমরা দেখেছি যে, এখানে স্থানীয় হিন্দু মিষ্টি-তৈরিকারকরাই শুধু মিষ্টি বিক্রি করত এবং এক দুই ঘর মুসলিম মিঠাই প্রস্তুতকারকও ছিল। কিন্তু এদের মিষ্টি প্রস্তুতকারক কমই বলা হতো, বেশিরভাগ এদের মোরব্বাওলা বলা হতো। এরা মোগল যুগের স্মৃতিচিহ্ন এবং দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও এদের শিরায় উত্তর ভারতের রক্তের সুস্পষ্টতা আজও দেখা যায়। এসব মুসলিম মিষ্টান্ন বিক্রেতা, মিষ্টির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লাড্ডু এবং বাদামের বিভিন্ন মিষ্টি তৈরি করে থাকে এবং ফেরি করে বিক্রি করে, খাঞ্চা সাজায় এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মোরব্বা তৈরি করে। চাল কুমড়ার মোরব্বা, যা ঢাকার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত এবং ঢাকা ছাড়া অন্যত্র প্রস্তুত হয় না। এখানকার লোকেরাই এর একমাত্র কারিগর। লেবু এবং পদ্মের মোরব্বা ব্যতীত, আমলকী এবং আদার মোরব্বাও বেশিরভাগ এরাই বিক্রি করে থাকে এবং এরা যে মিষ্টি তৈরি করে তার রং আকৃতি স্থানীয় মিষ্টি থেকে একেবারেই পৃথক এবং স্বাদও ভিন্ন।
'হালুয়া' শব্দটিই ইসলামী শব্দ। এই জন্য যেখানে যেখানে 'হালুয়ায়ী' আছে চাই সে যে কোনো গোত্রেরই হোক বিশুদ্ধ ইসলামী মিষ্টি বিক্রয় করে। যেমন নকুল, শকর পারা, বালুশাহী, হালুয়া-এ সোহন, কমবেশি মিশ্র মিষ্টি এবং স্লিাপিতো এমন আন্তর্জাতিক মিষ্টি যে, প্রত্যেক প্রদেশের মিষ্টি প্রস্তুতকারকগণ অবশ্যই বানিয়ে থাকে এবং প্রত্যেক স্থানে প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়।
স্থানীয় হিন্দু বিক্রেতাদের কাছে মিশ্র মিষ্টি' ছাড়াও বাংলার বিশিষ্ট মিষ্টি পাওয়া যায়।
বাঙালি মিষ্টি এবং হিন্দুস্থানী মিষ্টির মধ্যে বিশেষ পার্থক্য বিদ্যমান কেননা হিন্দুস্থানী মিষ্টির শ্রেষ্ঠতর অংশ মাওয়া থেকে তৈরি হয়ে থাকে এবং বাঙালি মিষ্টি ছানা থেকে প্রস্তুত হয়। এই পার্থক্যের হেতু এই যে, হিন্দুস্থানী হিন্দুরা দুধ ফাটিয়ে ছানা তৈরি করাকে মহাপাপ বলে মনে করেন এবং বাঙালি হিন্দুরা একে সিদ্ধ মনে করেন। এই জন্য অধিকাংশ বাঙালি মিষ্টি ছানা থেকে তৈরি করা হয় এবং মাওয়া থেকে তৈরি মিষ্টির মতো এটি পরিপাকের জন্য বেশি সময়ের প্রয়োজন পড়ে না বরং এটি হালকা ধরনের জিনিস। আমাদের দেখতে দেখতে বাঙালি মিষ্টিসমূহ খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলেছে, এবং বর্তমানে কানপুর, দিল্লি, লাহোরে অসংখ্য দোকান চালু হয়ে গেছে এবং আমি তো ইউরোপবাসীদেরও রসগোল্লা ও ক্ষীর মোহনের অনুরাগী দেখেছি। বর্তমানে টিনে সংরক্ষিত হয়ে এই মিষ্টি দেশ থেকে বাইরে দূর দূরান্তে যাওয়া শুরু হয়েছে।
আমাদের বাল্যকালে বর্তমানের মতো মিষ্টির দোকান রাস্তায় বা গলিতে ছিল না এবং না ফেরি করে মিষ্টি বিক্রয়কারী বিক্রেতা ছিল, না আজকালকার মতো মিষ্টিতে এত রংয়ের ছড়াছড়ি সৃষ্টি হয়েছিল এবং না গঠন ও আকৃতির এই ব্যাপ্তি। পূর্বে উর্দু বাজারের চৌরাস্তার মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্যাড়ার জন্য, লালবাগ [?] এবং চকের মিঠাইওয়ালা খাজার জন্য এবং বাংলা বাজার ও ফরাশগঞ্জের মিঠাইওয়ালারা বিয়ে শাদীর মিষ্টির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। এযুগে বিবাহের মিষ্টির বিশিষ্টতা ছিল। কম পক্ষে কিছু কিছু এমন মিষ্টি ছিল যার প্রচলন বর্তমানে আর নেই এবং না প্রস্তুতকারী বেঁচে আছে, না সেগুলির নাম নেবার মতো কোন ব্যক্তি। যেমন বিয়ের মিষ্টি, যা পূর্বে সিনির (খাঞ্চা) পরিবর্তে রঙিন এবং নশি মটকী এবং হাঁড়িতে করে যেত, যাতে চন্দ্রপুলী এবং বাদামের মিষ্টি অবশ্যই থাকত। বর্তমানে তার চিহ্নটুকু পর্যন্ত নেই। অনুরূপভাবে কিছু প্রাচীন মিষ্টির প্রচলন খুবই কমে গেছে কেননা অর্ডার দেওয়া বা বিশেষ পার্বণ ব্যতীত ওটি তৈরিই হয় না। যেমন খাজা অথবা বুন্দিয়া অথবা মুরাক্ষী অথবা নকুল কমই তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে। অনুরূপভাবে কিছু কিছু মিষ্টান্ন নিজস্ব চেহারাই পরিবর্তন করে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments