বই
পাতাবাহার
সত্যেন সেনের পাতাবাহার বইটি ছোটদের চোখে গল্পের রঙিন জগৎ। এটি শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা ১৯টি রূপকথার মতো গল্পের এক অনন্য সংকলন। সহজ ভাষায়, কল্পনার ছোঁয়ায় এবং মানবিক বার্তায় ভরপুর এই গল্পগুলো ছোটদের ভাবতে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায়। গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি এবং শিশুমনের জগৎ—সব মিলিয়ে এটি বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যে এক উজ্জ্বল সংযোজন।
-
টিয়া পাখির বাচ্চা মার কাছে সারাদিন গল্প শোনে। ওর মা কত-যে গল্প জানে! পুরনো একটা ভাঙ্গা বাড়ির ছোট্ট খুপড়িতে ওদের বাসা। সেই বাড়িতে মানুষজন কেউ নেই, ছাড়াবাড়িটা জংলা গাছে ছেয়ে গেছে। গোটা দুই শেয়াল নীচের ঘরে বাসা বেঁধেছে। এ ছাড়া এ বাড়িতে একদল চামচিকে আছে, সাপ-খোপ আছে, পোকামাকড় আছে, অনেক কিছ্ইু আছে। কিন্তু ওদের সঙ্গে টিয়া পাখির কোনোই সম্পর্ক নেই। টিয়া তার বাচ্চাটাকে নিয়ে দোতলায় ঘুলঘুলিটায় বাসা বেঁধে আছে।
মা মাঝে মাঝে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসে। সেই আধো আলো আধো অন্ধকারে ওই ছোট্ট বাসাটুকুর মধ্যে বাচ্চা কিন্তু বেশ মনের আনন্দেই আছে। মাঝে মাঝে মা যখন ওকে ফেলে বাইরে চলে
-
এক বন। সেই বনের ধারে ঘর বেঁধে কাঠুরে আর তার বউ বাস করে। ওদের ছেলেপুলে নেই। দুই জনকে নিয়েই সংসার।
কাঠুরে রোজ সকালে বনে গিয়ে কাঠ কাটে। তারপর কাঠের আঁটি বেঁধে নিয়ে বাজারে যায় বিক্রি করতে। বিক্রি করে যা পায়, তাই দিয়ে চাল-ডাল-তেল-নুন আর যা যা লাগবে সব কিনে নিয়ে আসে। এইভাবে সুখে-দুঃখে দিন যায়।
অগ্রহায়ণ মাসের শেষভাগে বেশ শীত পড়ে গেছে। কাঠুরের পিঠে খাবার কথা মনে পড়ে গেল। বউকে ডেকে বলল, বউ, বউ অনেকদিন পিঠে খাই না। আজ পিঠে বানাও। বউ বলল, ভালো কথাই বলেছ। পিঠে খাবার এই তো সময়। কিন্তু পিঠে যে বানাব, ঘরে-যে কিছুই নেই। পিঠে বানাবার
-
লাল গরুটা বুড়ো হয়ে গেছে। দুধও দেয় না, কোনো কাজেও লাগে না। বাড়ির কর্তা নিধিরাম বলল, এটাকে রেখে আর কি হবে? দুচার টাকা যা পাই, তাতেই বিক্রি করে একটা দুধালো গাই কিনে নিয়ে আনাই ভালো। আমরা গরীব মানুষ, আমরা কি আর বাজার থেকে দুধ কিনে খেতে পারি?
নিধিরামের বউ বলল, এমন কথা বলো না গো, অধর্ম হবে। আমার শাশুড়ীর বড় আদরের ছিল গরুটা। বড় লক্ষ্মী আর শান্তস্বভাব, একটু ঢুঁ ঢাঁও মারে না। এরকম গরু হয় না। এতকাল মায়ের মতো আমাদের দুধ খাইয়ে এসেছে, আর এখন ক’টা টাকার লোভে আমরা ওকে কসাইয়ের কাছে বেঁচে দেব?
না না, কসাইয়ের কাছে বেচব কেন?
-
কুকুর থাকে ঘরের বাইরে। তাকে কেউ ঘরে ঢুকতে দেয় না। অবশ্য বিলেতী কুকুরদের বেলা অন্য ব্যাপার। তাদের সঙ্গে কথা কি। ভুলো একদম দেশী কুকুর, একেবারেই আসল দেশী, একটু ভেজাল নেই। তার বারো বছরের মনিব নীলু তাকে কোথা থেকে জোগাড় করে নিয়ে এসেছিল, ভুলো এখন আর সে কথা মনে করতে পারে না। সেই থেকে নীলুই তাকে একটু একটু করে বড় করে তুলেছে।
নীলুর মতো এমন মানুষ সারা পৃথিবী খুঁজলে মিলবে না, একথা ভুলোর ভালো করেই জানা আছে। সেই তো রোজ তাকে নিজের হাতে খেতে দেয়। মাঝে মাঝে আবার স্নান করিয়ে দেয়। দেশী কুকুরদের অবশ্য স্নান করতে নেই। কিন্তু নীলুকে সে কথা
-
ধোপা আর নাপিত। দুই বন্ধু চলল বাণিজ্য করতে। বাণিজ্য করে সওদাগরেরা, ধোপা-নাপিত বাণিজ্যের কি জানে? এমন কথা কেউ জন্মেও শোনেনি। যে শোনে হাসে। কিন্তু যেই যত হাসুক, কেউ ওদের ঠেকাতে পারল না। ওরা বাণিজ্য করবেই।
আর বাণিজ্য না করে কি করবেই বা বলো। ধোপার হাতে জোর বেশী, সে যে কাপড় ধরে আছাড় মারে, সেই কাপড় ছিঁড়ে যায়। নাপিতের ক্ষুরে তেজ বেশী, যে গালে টান মারে সেই গালেই রক্তারক্তি কাণ্ড। এইভাবে দিন যায়। কিন্তু কদিন এইভাবে চলে? গ্রামের লোকের প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। কত কাপড় খোয়ানো যায়, আর কত রক্ত ঝরানো যায়! একদিন গ্রামের লোক সবাই একত্র হয়ে তাদের জানিয়ে দিল,
-
মুরগী তার বাচ্চাকে ডেকে বলল, এই ছোঁড়া, অমন করে খোঁড়াচ্ছিস কেন রে?
বাচ্চা বলল, একটা কাঁটা ফুটেছে মা।
কেন, দেখে পথ হাঁটতে পার না। কেবল দস্যিপনা!
হ্যাঁ, দস্যিপনা! কাঁটাগুলো কেমন করে চোরের মতন লুকিয়ে থাকে, আর দেখ না দেখ, কুটস করে ফুটে বসে। ওদের দেখা যায় নাকি? বাচ্চা নাকী সুরে বলল।
না, দেখা যায় না! কই, আমাদের পায়ে তো ফোটে না।
বাচ্চা এবার সুযোগ পেয়ে মাকে চেপে ধরল, তোমাকে ক’দিন বলেছি মা, আমি চোখে ভালো দেখতে পাই না, আমাকে একটা চশমা এনে দাও। তা তুমি কিছুতেই দেবে না।
আহা-হা, কি কথার ছিরি! মুরগীরা আবার চশমা পরে কোনো দিন?
তবে ওরা
-
সবাই এক রকম জিনিস ভালোবাসে না। এক একজনের এক এক রকম পছন্দ। কেউ ভালোবাসে মিষ্টি, কেউ টক, কেউ নোনতা, কেউ ঝাল, এমন কি এমন লোকও আছে যারা তেতো খেতে ভালোবাসে।
টেপী ভালোবাসে কাঁচা চাল খেতে। ভাত দাও, ডাল দাও, তরকারী দাও, মাছ-মাংস দাও, পিঠে পায়েস দাও, কোনটাতেই আপত্তি নেই, সবই সে খাবে। কিন্তু কাঁচা চাল খেতে তার যত আনন্দ এমন আনন্দ আর কিছুতে নেই। টেপী কে? মুকুলদের বাড়ির কুকুরটা। মুকুলের কাকা ওকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিল। তখন ছিল এইটুকুন বাচ্চা। শুধু হাড্ডি আর চামড়া। অমন কুকুর কেউ আদর করে পোষে না। কিন্তু মুকুলের কাকার কেমন যেন মায়া বসে গেল।
ক্যাটাগরি
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.