সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি
পুঁজিতন্ত্রের অর্থনীতি শ্রমিকের শোষণের উপর প্রতিষ্ঠিত। ইহার মূল লক্ষ্য মুনাফা। মুনাফা আত্মসাৎ করে সমাজের মুষ্টিমেয় ব্যক্তি। মুনাফা অর্জনের জন্যই শ্রমিককে শোষণ করা হয়, বেকারের সৃষ্টি করা হয়। মুনাফার জন্যই এক পুঁজিপতির সঙ্গে হয় অন্য পুঁজিপতির সংঘর্ষ। বিভিন্ন শিল্পের পুঁজির পরিমাণ মুনাফার তারতম্য দ্বারা স্থির হয়। চিনি উৎপাদনে মুনাফা বেশী হইতেছে,অতএব অন্য শিল্প হইতে পুঁজি উঠাইয়া উহাতেই খাটাইতে হইবে। পুঁজিতন্ত্রে যন্ত্রের উন্নতি করা হয়। কিন্তু উহার উদ্দেশ্য শ্রমিকের শ্রম লাঘব, অথবা জনসাধারণের স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি নয়। প্রতিযোগিতার সুবিধার জন্যই যন্ত্রের উন্নতি করা হয়।
ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার উপর পুঁজিতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা; ইহার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ দেখা দেয় অপচয়, বেকার, সংকট ও সংঘর্ষ।
সোভিয়েট ইউনিয়নে উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হয় কিরূপে? কোন্ কারখানা কত উৎপাদন করিবে, কতগুলি নূতন কারখানাই বা স্থাপন করা হইবে, কোন শিল্পে কি পরিমাণ মজুর নিয়োগ করা হইবে—তাহা ঠিক হয় কিরূপে? অন্য দেশে কৃষি, শিল্প অথবা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইচ্ছা মতো কাজ করিয়া যাইতে পারে। কিন্তু সোভিয়েট ইউনিয়নে তাহা নয়। একটী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দ্বারা সমগ্র দেশের উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হয়, এই পরিকল্পনা পূর্ব্ব হইতেই স্থিরীকৃত হইয়া থাকে। পরিকল্পনা কার্য্যে পরিণত করার জন্য শিল্প-পরিচালক অথবা ম্যানেজার নিযুক্ত হয়: কাজের ত্রুটি হইলে রাষ্ট্র ইহাদের অপসারিত করে। শ্রমিকের ও মেশিনের পুরা কার্য্যক্ষমতার প্রয়োগ দ্বারা যাহাতে সর্বাধিক উৎপাদন হইতে পারে, সে-দিকে লক্ষ্য রাখাই শিল্প-পরিচালকদের প্রধান কাজ। পরিকল্পনায় কোন্ শিল্প, কোন্ কৃষি প্রতিষ্ঠান কতটুকু উৎপাদন করিবে, কি পরিমাণ কাঁচামাল উহাদের প্রয়োজন হইবে তাহার নির্দ্দেশ থাকে। কারখানাগুলি দ্রব্যোৎপাদন করিয়া নিজেদের ইচ্ছামতো তাহা বাজারে ছাড়িতে পারে না; দ্রব্যের মূল্য বাঁধিয়া দেওয়া হয়।
ইহাই সোভিয়েটের অর্থনীতি। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন অংশগুলি একই সূত্রে সংগ্রথিত; ঐক্য, সমন্নয় ও শৃঙ্খলা ইহার বিশেষত্ব।
সোভিয়েটের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈয়ার করে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা কমিশন অথবা ‘গসপ্ল্যান’। অর্থনীতিবিদ ও ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা এই কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনের শাখা বিভিন্ন রিপাব্লিক, এমন কি, কারখানাতেও রহিয়াছে। কমিশন পরিকল্পনা প্রস্তুত করিয়া ইহা পিপলস্ কমিশারদের সভায় দাখিল করে। সভায় পরিকল্পনাটি গৃহীত হইলে ইহাই সারা দেশে সমস্ত শিল্পের প্রোগ্রামরূপে পরিগণিত হয়। এই পরিকল্পনা পদস্থ কতিপয় ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত, এরূপ মনে করা ভুল। পরিকল্পনাটী চূড়ান্তরূপে গৃহীত হওয়ার পূর্ব্বে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। বিভিন্ন শিল্পগুলিকে উহাদের নিজেদের প্রোগ্রাম তৈয়ার করিতে বলা হয়। ‘গসপ্ল্যানের নিকট দাখিল করার পূর্ব্বে এই খসড়া প্রোগ্রামগুলি শ্রমিকদের সম্মেলনে আলোচনা করা হয়। এইভাবে শ্রমিকেরা মনে করে পরিকল্পনা তৈয়ারীতে তাহাদেরও হাত আছে। গসপ্ল্যান শ্রমিকদের সমর্থিত বিভিন্ন পরিকল্পনাগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।
এই ভাবেই একটীর পর একটী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রস্তুত হইয়াছে। প্রত্যেকটা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মধ্যে আবার বাৎসরিক পরিকল্পনা থাকে। অনেক সময়ই পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সমন্বয় করিতে হয় বলিয়া বাৎসরিক পরিকল্পনাগুলির আবশ্যক হয়। হয়ত একটী ঋতুতে পরিকল্পনানুযায়ী ফসল উৎপাদন হয় নাই, অতএব বৃহত্তর পরিকল্পনাটিতে পরিবর্তন করিতে হয়।
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কি কি বিষয়ের সন্নিবেশ করা হয় তাহার একটি নমুনা দেওয়া যাক। দ্বিতীয় পরিকল্পনায় ৭০০০ মাইলের রেল লাইন, ১৫টি বৃহৎ পাওয়ার ষ্টেশন তৈয়ারীর নির্দেশ দেওয়া হয়। এই ষ্টেশনগুলি তৈয়ারী হইলে দেশে দ্বিগুণ বিদ্যুৎ সরবরাহ হইবে। মোটর যান আটগুণ এবং ট্র্যাক্টর চারগুণ বাড়ানোর কথা হয়। বুট ফ্যাক্টরী ১২টী স্থাপন করিতে হইবে, যেন প্রতি বৎসর ১০ কোটী জোড়া জুতা তৈয়ার করা যায়, ইত্যাদি।
অবশ্য যাহা পরিকল্পিত হয়, সব সময় তাহা কার্য্যে পরিণত করা সম্ভব হয় না। অবস্থার পরিবর্ত্তন হইতে পারে, ভুল ত্রুটী দেখা দিতে পারে। কিন্তু তথাপি প্রত্যেকটি পরিকল্পনা পূর্ব্ববর্ত্তী পরিকল্পনার চেয়ে অধিকতর সফলতার সঙ্গে কার্য্যকরী করা হইয়াছে।
গসপ্ল্যান শুধু মাত্র দ্রব্যোৎপাদনের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments