সংস্কৃতির বিকাশধারা
॥ ১॥
যে-প্রবল প্রাণশক্তি সৃজনশীলতার সকল দুয়ার খুলে দেয়, জীবন-যাপনের ব্যর্থ আবর্জনা সরিয়ে সুন্দরের কল্যাণের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, অশিক্ষা এবং দেউলে রাজনীতিকে অতিক্রমণ করার প্রেরণা যোগায়, আমাদের বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) মানুষদের দুর্ভাগ্য, সে-প্রবল প্রাণশক্তি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল, কখনো মূর্চ্ছাতুর ছিল, কখনো সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে বিকারগ্রস্ত ছিল। সুন্দরভাবে বাঁচার প্রশ্নই ওঠে না, মামুলীভাবে বাঁচাটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষিত ছিল। স্বাধীনতা, মানুষের সকল রকম বন্ধন থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি—আমাদের কাছে সকল রকম বন্ধনের অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত। ইখতিয়ারুদ্দীন বখতিয়ার থেকে নবাব সিরাজউদ্দোলাহ্ যে-ভাষায় আঘাত দিতে চেষ্টা করেন নি, দুশো বছরের ইংরেজ শাসনে যে-ভাষা আক্রান্ত হয় নি—স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পরের বছরই সে-ভাষা প্রবলভাবে আক্রান্ত হ’ল। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আমরা একদা ইরান-তুরানের ফসল গ্রহণেও উদ্যত হয়েছিলাম, কিন্তু স্বাধীন সরকারের সাংস্কৃতিক শোষণের ফলে আমরা গালীবের, মীর তকী মীরের গজলের রসাস্বাদনেও ব্যর্থ হলাম, এমন কি ইকবালের মত কবিও দ্বারে আঘাত করে ফিরে গেলেন; শামুকের মত নিজেদের গুটিয়ে রাখতে হয়েছে আমাদের, চোরের মত ইতিহাস পাঠ করতে হয়েছে, অনেক নক্ষত্রের আলো, আমাদের সন্দেহ ও সংশয়ের জন্যই দেখা হ’ল না। হায়, জীবনানন্দর মত আমি বলতে পারি নি—‘দূর পৃথিবীর গন্ধে ভ’রে ওঠে আমার এ বাঙালীর মন’। অথচ, পৃথিবী জানে, আমরা স্বাধীন ছিলাম।
বাংলাদেশের গানে, কবিতায়, শিল্প চর্চার সকল মাধ্যমে অনিবার্যভাবে যা রূপ পেয়েছে, ইঙ্গিতে অথবা স্পষ্ট করে, তা হ’ল এই দ্বন্দ্ব। বাঙালীর আত্ম-সচেতনতার প্রেরণা এল প্রথমে ড. শহীদুল্লাহর কাছ থেকে।
মৈত্রেয়ী দেবী বলেছেন: It is a remarkable event that a new political consciousness of East Bengal Muslims found its inspiration from art, literature and poetry.[১]
পতাকার পরিবর্তন, মানচিত্রে রঙের পরিবর্তন, সরকার পরিবর্তন প্রথম দিকে সাধারণ নরনারীর মনে নতুন করে বাঁচার উৎসাহ যুগিয়েছিল। সেদিনের শিল্পীদের আবেগকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। কিন্তু সে-আবেগ ও উন্মাদনা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণেই ক্রমশঃ থিতিয়ে এল।
এ-বিষয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই যে, ১৯৪৭ সালের ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-বিভাগের সময়ে পূর্ব বাংলার সাধারণ মুসলমান নির্দ্বিধায় তাকে স্বাগত জানিয়েছেন, নব-সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সানন্দে বরণ করে নিয়েছেন। সে-সময়কার উন্মাদনা প্রকাশ পেয়েছিল, ‘এক ধর্ম-ইসলাম, এক রাষ্ট্র পাকিস্তান, এক নেতা-কায়েদে আজম জিন্নাহ্’—এই রণধ্বনিতে। অন্য কোন যুক্তিই সেদিনের পূর্ব বাংলার সাধারণ মুসলমান শুনতে রাজি ছিলেন না।
এ-ঘটনাও আকস্মিক ছিল না। প্রাক-স্বাধীনতা যুগের ভারতবর্ষের দীর্ঘ ইতিহাসের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এ-অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পূর্ব বাংলার মুসলমানের কাছে পাকিস্তানের উদ্ভবের অর্থ ছিল না—শুধুই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসন থেকে মুক্তি, এর আরও একটি সুস্পষ্ট অর্থ ছিল হিন্দুদের থেকে বিচ্ছিন্নতা। তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় ছিল—জমিদারদের, মহাজনদের, ব্যাপারী-ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই হিন্দু। উপরন্তু যুক্ত বাংলায় ফজলুল হকের মন্ত্রিত্বে প্রণীত বঙ্গীয় কৃষি-ঋণ আইন সত্যই ঋণগ্রস্ত কৃষকদের বেশ কিছু অংশের উপকারে লেগেছে। এমন কি ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরকেও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব হিন্দু ব্যবসায়ীদের কারসাজি হিসেবে বোঝাতে কিছুটা সক্ষম হয়েছিল। পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ তথা কৃষকের চেতনায় ঐস্লামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের মানে ছিল, সে এবারে জমি পাবে, ঋণের জাল থেকে মুক্তি পাবে, ছেলেপিলে লেখাপড়া, শিখবে, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে—এক কথায় গড়ে উঠতে চলেছে স্বাধীন উন্নতিশীল দেশ।
এটা ঠিক যে মুসলমান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত অংশ যুক্ত বাংলায় লীগ মন্ত্রিসভার আমলে সরকারি চাকরিতে প্রচুর পরিমাণে ঢুকতে পেরেছিলেন, কিন্তু তবুও উপরতলার অফিসারদের মধ্যে সংখ্যাধিক্য ছিল হিন্দুদের। উপরন্তু ওকালতি, ডাক্তারি, শিক্ষকতা বা অধ্যাপনার ক্ষেত্রেও মুসলমানরা নিতান্তই সংখ্যালঘু। এমনকি সাহিত্য-সৃষ্টি ও সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও হিন্দুদের প্রাধান্য। সুতরাং শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানের পক্ষে ভাবা সহজ ছিল—আমরা পিছিয়ে আছি হিন্দুরা বৃটিশের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে আমাদের চেপে রেখেছে বলে, আমরা পিছিয়ে আছি, আমরা স্বতন্ত্র
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments