লোকায়ত জীবনবোধ থেকে সমাজদর্শনের অন্বেষণ

ব্রাহ্মণ ব্রহ্মার মুখ হইতে হইয়াছিল, যখন হইয়াছিল, তখন হইয়াছিল, এখন তা অন্যেও যেরূপে হয়, ব্রাহ্মণও সেইরূপেই হয়, তবে আর ব্রাহ্মণত্ব রহিল কি করিয়া? যদি বল, সংস্কারে ব্রাহ্মণ হয়, চণ্ডালকে সংস্কার দাও, সে ব্রাহ্মণ হোক; যদি বল, বেদ পড়িলে ব্রাহ্মণ হয়, তারাও পড়ুক। যদি জন্মের প্রক্রিয়াই মানুষের মধ্যে দূরত্ব/বৈষম্য সৃষ্টি করার মূল ভিত্তি হয়, তবে বর্তমানে প্রক্রিয়া যখন সবার জন্য সমান—তখন সেই দূরত্ব/বৈষম্য ঘুঁচে যাওয়া কেন স্বাভাবিক বাস্তবতা হবে না?

‘প্রাকৃতজনের জীবনদর্শন’ বইটিতে লেখক এরকম অনেক বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেছেন, প্রশ্ন করেছেন এবং পাঠককে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি প্রান্তিকতা ও বৈষম্যের ধারণার মূল জায়গায় আঘাত করতে চেয়েছেন। এই ধারাবাহিক প্রশ্ন, যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমেই বইটির পরবর্তী অংশে আমরা দেখতে পাই—বাংলার সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনবোধ, দর্শন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে গভীর ও জীবন্ত বিশ্লেষণ। যতীন সরকারের লেখায় যে ধারার শক্তিশালী আলোচনা পাওয়া যায়—‘প্রাকৃতজনের জীবনদর্শন’ সেই ধারারই একটি গুরুত্বপূর্ণ বই, দলিল ও গবেষণা।

প্রাকৃতজনের জীবনদর্শন
লেখক: যতীন সরকার
দ্বিতীয় সংস্করণ: অক্টোবর ২০২৫, দ্যু প্রকাশন, ঢাকা

বইটি তিনটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে লেখক একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র নির্মাণ করেছেন। ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে যাদের গভীর পরিচয় রয়েছে, তারা এই গ্রন্থ পাঠে অনুভব করবেন—কী অসাধারণ যত্ন এবং মনঃসংযোগ নিয়ে লেখক বিষয়গুলোকে একটি সুগ্রন্থিত মালার মতো গেঁথেছেন। পণ্ডিত পাঠকেরা বইটি পড়ে নিজেদের দার্শনিক অনুধ্যান আরও শাণিত করতে পারবেন, আর নবীন পাঠকদের জন্য নতুন দিগন্তের দর্শন চর্চার পথপ্রদর্শক হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

বইটির নামের প্রথম অংশ 'প্রাকৃতজন’—নিয়ে চিন্তা করলে আমাদের সামনে একাধিক ধারণা ও চিত্র ভেসে ওঠে, যা এই শব্দটির অন্তর্নিহিত বিস্তারকে আরও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। ‘প্রাকৃতজন’ শব্দটি মূলত সাধারণ মানুষ—যারা সমাজের বৃহৎ সংখ্যক অংশ এবং বাস্তব জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করেন—তাদের নির্দেশ করে। বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী এটি সাধারণ বা নিম্ন শ্রেণির মানুষকে নির্দেশ করে। সাবঅলটার্ন তত্ত্বের আলোকে এই ধারণাটি আরও ব্যাপক হয়ে যায়—যেখানে ক্ষমতার মূল ধারার বাইরে থাকা, প্রতিনিধিত্বহীন, নিপীড়িত ও বাদ পড়া মানুষের অবস্থান, অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম সামনে আসে।

আন্তোনিও গ্রামসি ও গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের মতো চিন্তাবিদদের আলোচনার ধারায়—এই শব্দটি ক্ষমতার কাঠামো থেকে বাদ পড়া মানুষের রাজনৈতিক-সামাজিক অস্তিত্বকে ইতিহাসে দৃশ্যমান করে তোলে। এই বই পড়ার আগে এই ধারণাগুলির সঙ্গে পরিচয় থাকলে ‘প্রাকৃতজন’ অর্থটি বোঝা এবং তাদের দর্শনের ব্যাখ্যা পাঠে আরও স্পষ্টতা তৈরি হয়।

প্রাকৃতজনের জীবন কেবল দারিদ্র্য, বাঁচার সংগ্রাম বা পেশাভিত্তিক শ্রম নয়; বরং তাদের জীবনেই নিহিত এক বাস্তববাদী, মানবিক ও যুক্তিনির্ভর দর্শন। জীবনের অর্থ, সমাজ-সংগঠন, পারস্পরিক সহমর্মিতা, শ্রমে সৃজনের আনন্দ—এসবই প্রাকৃতজনের দর্শনের ভিন্ন রূপ। তারা অবাস্তব ধর্মীয় চমৎকারবাদ বা বিমূর্ত তত্ত্বের পেছনে নয়—বরং বাস্তব জীবন, প্রকৃতি, সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার মধ্যেই অর্থ খুঁজে নেয়। আর তাই প্রাকৃতজনের দর্শন বিদগ্ধজনের দর্শনের মতো নিছক বিশুদ্ধ জ্ঞানানুসন্ধান নয়, যে কঠোর শ্রম দিয়ে প্রাকৃতজন জীবিকা অর্জন করে সেই শ্রম-প্রক্রিয়ার সংঙ্গে একান্তভাবে যুক্ত তার দর্শন। প্রাকৃতজন বা জনগণের দর্শন বোঝাতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন: ”আমাদের দেশে বস্তুবাদী দর্শন বোঝার বা বোঝাবার জন্যে দুটি স্বতন্ত্র পারিভাষিক শব্দের প্রয়োজন হয়নি। দুই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে একই শব্দ। লোকায়ত। লোকায়ত মানে বস্তুবাদী। লোকায়ত মানে জনগণের দর্শনও।’

অন্যদিকে দর্শনের ধারণা সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দর্শন মূলত অস্তিত্ব, যুক্তি, জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং ভাষা সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নগুলোর পদ্ধতিগত অধ্যয়ন। এটি কোনো বিষয়ের প্রকৃত স্বরূপ বোঝার জন্য যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তা, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া। দর্শনের আক্ষরিক অর্থ ‘দেখা’

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice