বুনো গোলাপ
অনুবাদ: রেখা চট্টোপাধ্যায়
রাত্রে নদীর উপর কুয়াশা জমে উঠলো আর সেটা গ্রাস করলো বয়া এবং সাঙ্কেতিক আলোগুলো।
খাড়া তীরের কোল ঘেঁসে ইস্টিমারটা এসে থামলো। তীরের উপরকার এক প্রাচীন নলখাগড়ার ঝোপের সঙ্গে নোঙরের দড়িটা বাঁধবার জন্যে নাবিকরা যখন টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তীরে যাবার কাঠের পথটা তখন শুধু তালে তালে করছিল ক্যাচ-ক্যাচ।
মাঝরাতে মাশা ক্লিমোভার ঘুম ভাঙলো। ইস্টিমারটা এতো নিস্তব্ধ যে যাতায়াতি পথের শেষ প্রান্তের কেবিনের এক যাত্রীর নাক ডাকা সে পেলো শুনতে।
বিছানায় সে উঠে বসলো। খোলা জানালার ভিতর দিয়ে যে টাটকা বাতাস ভিতরে আসছিল তাতে জড়িয়ে ছিল উইলো পাতার মিষ্টি গন্ধ।
ছায়াচ্ছন্ন কুয়াশার ভিতর দিয়ে ঝোপ ঝাড়ের নানা শাখা ডেকের উপর এসে পড়েছে। তার প্রথম মনে হলো যে ইস্টিমারটা বুঝি কোনো রকমে তীরের উপর উঠে এসে এক কুঞ্জবনের মধ্যে থেমে আছে। জলের ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ শুনতে পেলো আর তারপর সে বুঝলো যে ইস্টিমারটা নিশ্চয়ই থেমেছে নদীর পাড়ে।
ঝোপের ভিতর থেকে প্রথমে শোনা গেল একটা পাখীর কাঁপা কাঁপা ডাক, তারপর খানিক থেমে আর একটা। মনে হলো যেন নিস্তব্ধতার গভীরতা এবং প্রত্যুত্তর দেবার ক্ষমতা যাচাই করার জন্যে বুঝি একটা সুর হয়েছে বাজানো। গাইয়ে নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট হয়ে ছিল, কারণ তারপর ক্রমাগত ভেসে আসতে লাগলো কাঁপা কাঁপা ছোট ছোট শিস। সেই গানের সঙ্গে যোগ দিলো আরো অনেক স্বর এবং ঝোপটা অকস্মাৎ ধ্বনিময় হয়ে উঠলো নাইটিঙ্গেলদের রূপালী গানে।
‘শুনছো, ইয়েগোরভ?’ উপর থেকে শোনা গেল একজনের গলা, সম্ভবত সেতুর উপর থেকে।
নীচে থেকে আর একজনের ভাঙা গলা শোনা গেল, ‘এটা শেক্স্না’র নাইটিঙ্গেলদেরও হার মানিয়েছে।’
মৃদু হেসে মাশা সামনের দিকে তার হাত প্রসারিত করলো। মৃদু আলোয় সেগুলোকে মনে হলো কালো কালো, নখগুলো অস্পষ্ট চিকচিক করছে।
নিজের মনেই মাশা ফিস ফিস করে উঠলো, ‘আমার কী হয়েছে, জানি না। কী আমি চাই? নিজেই সে কথাটা জানি না।’
তার ঠাকুমা বলতেন মেয়েদের মনের দুর্বোধ্য বিষণ্ণতা বলে একটা জিনিস আছে, সেকথাটা তার মনে এলো।
‘বাজে কথা। মেয়েদের মনের বিষণ্ণতা না ছাই! নিজের পায়ে দাঁড়াতে শুরু করতে গিয়ে সামান্য ভয় পেয়েছি—তাছাড়া আর কিছু নয়।’
অরণ্য উচ্চ বিদ্যালয় থেকে হালে মাশা পাশ করে বেরিয়েছে। ভলগার নীচের দিকে যৌথ খামারগুলির জন্যে আড়ালকারী গাছের সারি বসাতে লেনিনগ্রাদ থেকে চলেছে সে তার কাজের জায়গায়।
নিজেকে যে সে বললো যে সে সামান্য ভয় পেয়েছে,তা অবশ্য খুব কম করে বলা, বাস্তবিকই সে বেশ আতঙ্কিত হয়েছে। সেখানে পৌঁছুবার কথা সে কল্পনা করলো : যার অধীনে তাকে কাজ করতে হবে সে ব্যক্তি নিশ্চয়ই দারুণ গম্ভীর আর সর্বাঙ্গ তাঁর ধূলিধূসর। পরনে তাঁর বড় বড় পকেটওলা কালো একটা কোট আর বুট জুতোগুলো কাদায় ভারি। মাশার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখে তিনি লক্ষ্য করবেন তার ধূসর চোখগুলো (যেগুলোকে মাশার সর্বদাই মনে হয় টিনের চাকতির মতো) আর তার বিনুনিগুলো, এবং তিনি ভাববেন, ‘ঠিক এরকমটিরই আমাদের দরকার ছিল, এক বিনুনি-বাঁধা মেয়ে যে পড়ার বই থেকে মুখস্থ বলা ছাড়া আর কিছু করবে না। আস্ত্রাখানের শুক্নো ঝড় একবার বইতে শুরু করুক, তখন বুঝবে, বাছা, তোমার কোনো পড়ার বই-ই বিশেষ কাজে লাগছে না…’
মাশার গম্ভীর-প্রকৃতি কালো কোট-পরা উপরওলার কাল্পনিক চেহারা সম্বন্ধে অভ্যস্ত হতে এবং তাঁকে ভয় না করতে এই দীর্ঘ যাত্রা তাকে সাহায্য করেছিল। কিন্তু তবুও একটা দমে-যাওয়া ভাব মনের মধ্যে লেগে আছে।
সে বুঝতে পারলো না যে এটা ঠিক দমে-যাওয়া ভাব নয়; এটা এমন এক অনুভূতি যাকে বিশ্লেষণ করা কঠিন—সামনেকার রহস্যময় অথচ চিত্তাকর্ষক ভবিষ্যতের কথা ভেবে বুক দুরুদুর করা, যে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments