কোথায় আকাশের শুরু
ছেলেটাকে দেখি বৃষ্টির পর, রাস্তায়। হাঁটছিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, ছাল ছড়ে যাওয়া হাঁটুতে রক্ত জমা বেঁধেছে সীলমোহরের মতো। জীর্ণ চ্যাপটা স্যাণ্ডেল জোড়া দেখতে কাছিমের মতো। হাতে ওর একটা দড়ি, ধূসর রঙের একটা ন্যাকড়ার সঙ্গে তা বাঁধা। ভেজা অ্যাসফল্টের ওপর লোটাচ্ছিল ন্যাকড়াটা, বোঝা মুশকিল কোন কাজে ওটা লাগবে।
‘কী করবি এই ন্যাকড়াটা দিয়ে?’ জিজ্ঞেস করলাম ওর কাছে এসে।
‘ন্যাকড়া নয়,’ নিচু গলায় জবাব দিলে ছেলেটা, ‘এটা প্যারাশুট।’
‘প্যারাশুট?’
এবার ঠাহর করে দেখলাম ন্যাকড়াটা সত্যিই গম্বুজের মতো, দড়িটাও আসলে জড়ানো রশিগুচ্ছ। ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা ওটা জলের মধ্যে টানছিস যে?’
‘এমনি...’ অস্পষ্টে বলে চোখ তুললে আমার দিকে।
বড়ো বড়ো কালচে তার মণি। নির্মল ঝলক তাতে, বৃষ্টির পর পাতায়, চালে, রাস্তায় যে ধরণের ছড়া দেখা যায়। শাদা অংশটা প্রায় দেখাই যায় না, চোখ ভরে কেবল মণিটা। আমায় চেয়ে চেয়ে দেখছে।
‘ছাদ থেকে ছেড়েছিল বুঝি?’ ভেজা কাদা-ছিটকানো প্যারাশুটটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
‘উঁহু, জানলা থেকে।’
‘আর ভার কি চাপিয়েছিলি।’
‘ভার?’ ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে না পেরে সে চাইলে আমার দিকে, ‘আমি নিজেই... ঝাঁপ দিয়েছি।’
‘প্যারাশুটটা যে তোর পক্ষে খুবই ছোটো।’
‘বড়ো আর পাব কোথায়?’ এবার ও এমন ঠাট্টার দৃষ্টিতে চাইলে আমার দিকে আমি তো এই বালিশের ওয়াড়ের জন্যেই পিট্টি খেয়েছি...’
‘এবার নজরে পড়ল গম্বুজের ধারগুলোয় ভেজা ভেজা মিহি ফিতে। সত্যিই প্যারাশুটটা ওয়াড় দিয়ে তৈরি, এক সময় সেটা শাদাও ছিল। আমার সমালোচনার দৃষ্টিটা ধরা পড়ল ওর চোখে।
‘ছোটো প্যারাশুটেও ঝাঁপ দেওয়া যায়... শুধু আকাশ থাকা চাই,’ বললে ও নিজের প্যারাশুটটির সমর্থনে।
‘আকাশ?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘আমি যে নিচ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলাম। সেখানে তো আর আকাশ নেই,’ ব্যাখ্যা দিলে সে।
‘আর পাঁচ তলায় আকাশ পাওয়া যাবে?’
‘এখনো... পাঁচ তলা থেকে ঝাঁপাইনি।’
জমাট, লালচে গলার মতো হাঁটুটার দিকে কটাক্ষে চাইতেই আমার গা ছম-ছম করে উঠল, অতল গহ্বরের ধারে কি উঁচু সাঁকোর রেলিঙের কাছে দাঁড়ালে যেমন হয়। মাথায় হাত দিলাম আমি, দেখলাম বড়ো বড়ো গাঢ় মণিদুটো আমার দিকেই চেয়ে আছে।
‘তুমি কখনো প্যারাশুটে ঝাঁপ দাওনি?’ জিজ্ঞেস করলে সে এমনভাবে যেন ও-আমি সমান।
‘উঁহু,’ আমিও উত্তর দিলাম সমানে-সমানে। আমার এই ছোটো সহচরের কাছে কেমন যেন লজ্জাই হল। আর ওর চোখে মান আমার যাতে পুরো খোয়া না যায়, তাই বললাম, ‘তোর মতো বয়সে ঝাঁপ দিয়েছি... ছাতা নিয়ে।’
আমিও ছাতা নিয়ে দেখেছি,’ বোদ্ধার মতো মাথা নাড়লে ছেলেটা, ‘উল্টে গেল।’
মনে পড়ল আমার ঝাঁপটার ভাগ্যে তাই ঘটেছিল এবং আপন মনে খুশি হয়ে উঠলাম।
‘যা বলেছিস! আমার আবার চাঁটিও খেতে হয়েছিল ছাতাটার জন্যে।’
‘চাঁটি তো সবকিছুর জন্যেই খেতে হয়,’ বলে স্যাণ্ডেলের খস-খস শব্দ তুললে ছেলেটা।
খানিকক্ষণ আমরা চললাম চুপচাপ। আমার ছোট্ট প্যারাশুটিস্টটির শ্রেষ্ঠত্ব টের পাচ্ছিলাম, ভাবতে লাগলাম সেটা ও পাচ্ছে কোত্থেকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যত অসংখ্য ভয় মানুষকে পেয়ে বসে তা থেকে ও মুক্ত বলে কি? বোধ হয় পা চালিয়েছিলাম একটু বেশি তাড়াতাড়ি, কেনা পেছন থেকে শোনা গেল সেই পরিচিত নিচু গলা: ‘অত জোরে যেও না।’
‘কেন, পা ব্যথা করছে?’
‘না, স্যাণ্ডেল খুলে যাচ্ছে।’
ফিরে চাইলাম আমি। অ্যাসফল্টে দাঁড়িয়ে সে খুলে ফেলছে তার চ্যাপটা ভেজা স্যাণ্ডেলটা। ছেলেটার হাতে গিয়ে ওটাকে আরো বেশি দেখাল কাছিমে খোলার মতো।
‘পরে নে।’
‘এই বেশ ভালো,’ বলে দ্বিতীয় পাটিটাও সে খুলে নিলে।
ছেঁড়া ছেঁড়া শীর্ণ মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলে সূর্য। রোদ উঠল কড়া, অ্যাসফল্টের ওপর ভেসে উঠল তপ্ত নীলাভ ভাপ। ভাপ-ওঠা তপ্ত অ্যাসফল্টের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments