ছেলেটার জন্য রঙ
ছেলেটা বিমানে বসে একদৃষ্টে চেয়ে দেখছিল জানলা দিয়ে।
সূর্যের রোদে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, ছেলেটা কিন্তু তবু দেখছে।
মা বললেন, ‘শোন বাছা, পর্দাটা টেনে দে, নয়ত পাশের চেয়ারটায় বস। এখানটা রোদ্দুর বড়ো তেতে উঠেছে, তোর পক্ষে খারাপ।’
ক্ষুব্ধ চোখে ছেলেটি চাইল মায়ের দিকে। রোদে বসে থাকা যে ওর পক্ষে খারাপ সেটা ও চায় না যেন কারো কানে যাক। বলল, ‘এখানেই বেশ আছি, রোদে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না।’
‘বেশ,’ বললেন মা, ‘বসে থাক, আমি অন্য জায়গায় বসছি।’
অন্য দিকটায় গিয়ে বসলেন তিনি। ছেলেটা জানলা দিয়ে দেখেই চলল।
কেবিন থেকে বেরিয়ে এল পাইলট। সেই কমান্ডার। বসল ছেলেটার পাশে।
চেয়ে দেখল ছেলেটা। এবার তার পাশে বসেছে আসল একটা লোক। ইচ্ছে হল তার সঙ্গে একটু কথা কয়। পাইলট তা টের পেল। তার ক্লান্ত রুক্ষ মুখটা একটু নরম হয়ে উঠল, অভ্যাসবশেই সে জিজ্ঞেস করল, ‘ভালো লাগছে?’
‘খুব ভালো,’ বলল ছেলেটা।
‘তুই-ও পাইলট হবার স্বপ্ন দেখছিস তো?’
একটু বিব্রত হল ছেলেটা। আদৌ পাইলট হবার কথা সে ভাবে না, কেননা ওর ফুসফুস খারাপ, জানত যে তার জন্য ওর পাইলট হওয়া সম্ভব হবে না। মিথ্যেও সে বলতে পারে না, আবার সত্যি কথা বলতেও মন চাইছে না।
‘আমি আঁকতে ভালোবাসি,’ জবাব দিল ছেলেটা। ‘ওই দেখুন, মেঘগুলো এক পাল শাদা হাতির মতো। সামনেরটার শুঁড়ের পাশে দাঁত। ওটা পালের গোদা। আর ঐটে হল তিমি। চমৎকার লেজটা।’
ছেলেটা চেয়ে দেখল পাইলট হাসছে। দেখে সে চুপ করে গেল। ভারী তার লজ্জা হল যে বয়স্ক এক লোক, তাতে আবার পাইলট, তাকে কিনা সে কী সব মেঘে-গড়া হাতি, তিমির কথা শোনাচ্ছে।
আবার জানলায় চোখ রাখল সে।
পাইলট তার কাঁধে নাড়া দিল।
‘সাবাস তোর কল্পনা। সত্যিই মেঘগুলো একেবারে হাতির মতো! চমৎকার ধরেছিস।’
‘মস্কোয় মা আমায় রঙ কিনে দেবে, সত্যিকারের শিল্পীরা যেসব রঙ দিয়ে আঁকে, আমিও আঁকব,’ বলল ছেলেটা, ‘সত্যি বলছি। দেখুন দেখুন মাটিটা-দাবার ঘরের মতো।’
মাটির দিকে তাকিয়ে দেখল পাইলট। কতবার সে উড়েছে, অথচ এসব কিছুই দেখেনি। একটু যেন ক্ষোভই হল তার: এই ধরনের কত হাতির পাশ দিয়ে সে কতবার উড়ে গেছে, অথচ কিছুই লক্ষ করেনি। রোগা ছেলেটার দিকে সে চাইল প্রশংসার দৃষ্টিতে।
আকাশ তার কাছে বরাবরই কেবল একটা কাজের জায়গা। ওড়া চলবে কি চলবে না, কেবল এই দিক থেকেই সে আকাশকে দেখে: নিচু মেঘলাটে-নামার পক্ষে খারাপ; উঁচুতে মেঘ-ওড়ার পক্ষে তোফা; বজ্রগর্ভ মেঘ-বিপদ। তাছাড়া, শত্রুর বিমান বিধ্বংসীর কামানের গোলা থেকে ওঠা মেঘও সে দেখেছে কম নয়-বজ্রমেঘের চেয়েও সেটা বিপজ্জনক।
আর মাটিটা তার কাছে কেবল অবতরণের জায়গা, পরেরবার ওড়ার আগে পর্যন্ত যেখানে বিশ্রাম নেওয়া যাবে খানিকটা।
এরপর পাইলটের ডাক পড়ল কেবিনে, চলে গেল সে।
আর কয়েক মিনিট পরেই ছেলেটা দেখল যে সামনের দিকে থেকে ছুটে আসছে একটা বিদ্যুৎ ঝলকানো সিসে রঙা মেঘ।
মা ফের এসে বসলেন ছেলের পাশে। যখন তাঁদের কাছ দিয়ে দ্বিতীয় পাইলট যাচ্ছিল, মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভয়ের কিছু নেই? বজ্রভরা মেঘ তো?’
পাইলট বলল, ‘মস্কো থেকে জানিয়েছে যে বজ্রমেঘটাকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি উত্তর দিক দিয়ে।’
এর মধ্যে বিমানের ভেতরটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে এল। যাত্রীরা একদৃষ্টে চেয়ে দেখছিল মেঘের দিকে, এগিয়ে আসছে তা বিমানের দিকে। অস্থির হয়ে সবাই কথা কইতে লাগল নিজেদের মধ্যে।
বিমান বাঁক নিয়ে সরে গেল মেঘটা থেকে। কেবলি ডান দিকে বেঁকোতে হচ্ছিল ওটাকে, কেননা মেঘ ঝেঁপে আসছিল দুদিন থেকে। হঠাৎ অলক্ষে বিমানটা আটকা পড়ে গেল বজ্রের বেষ্টনীতে। অল্প একটু জায়গার মধ্যে পাক খেতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments