মওদুদীবাদ : জামাত বৃক্ষের মূল
মওদুদীর জন্ম ভারতের মহারাষ্ট্রে ১৯০৩ সালের সেপ্টেম্বরে আর মৃত্যু ১৯৭৯ সালে। পারিবারিকভাবে সুফি ইসলামের হেরাত অঞ্চলের চিশতিয়া তরিকার মওদুদ চিশতীর উত্তরাধিকার বহন করতেন, সেই সূত্রেই তার নামের শেষে মওদুদী পদবীর সংযুক্তি। তবে নানা সমাজতাত্বিক চিন্তাচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে ক্রমে বেরিয়ে আসেন। ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট লাহোরে জামাতে ইসলামির গোড়াপত্তন। মওদুদী জামাতে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম আমির। তিনি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেন, জাতীয়তাবাদের কারণে তিনি মনে করতেন এটা ইসলামসম্মত নয়। মওদুদী লাহোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তার লেখায় সম্ভাব্য পাকিস্তানকে ‘নাপাক-স্থান’ হয়ে পড়ার কথা বলেন।
- ইসলামিক রাষ্ট্র ও জনগণ : তার মতে মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবেই দুর্বলতা রয়েছে যে কারণে মানুষ আইন প্রণেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। মানুষের কাজ হলো আল্লাহর আইন মেনে চলা, তবে প্রাসঙ্গিক বিধি প্রণয়নের নিয়ন্ত্রিত অধিকার মানুষের রয়েছে তা-ও সব মানুষের নয়, কেবল মুমিনদের। ( কোরআন ঈমানদারদের দুই ভাগে ভাগ করেছেন আমানু এবং মুমিন। মুমিন মূলত চরম নিরপেক্ষ এক সাধক সত্তা।)
সাধারণ মানুষের সার্বভৌমত্ব নেই, আনুগত্যই মানুষের নিয়তি (নিজেদের দলকে অসাধারণ এবং মুমিনজ্ঞান করেন)। চলতি ধারার রাষ্ট্রকে, খেলাফতি ধর্মরাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রস্তাব দেন তিনি। তার মতে আধুনিক এই রাষ্ট্রটির নাগরিকেরা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করলেই, সেটা মানবীয় রূপ ধারণ করবে! মওদুদীর খেলাফতধর্মী রাষ্ট্রে নাগরিকদের সার্বভৌমত্বহীনতাই সাধারণভাবে মূল বৈশিষ্ট্য।
- রাষ্ট্রব্যবস্থা: তার মতে এটি কোন ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও নয়—উভয় ব্যবস্থার মধ্যবর্তী এক পৃথক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা (theo-democracy)।
ধর্মতন্ত্র-গণতন্ত্রের এক ধরনের fusion বা মিশ্রণ তার ইসলামি রাষ্ট্র। আধুনিক রাষ্ট্র যেখানে শ্রেণী আধিপত্য, জাতিবাদ, দমন ইত্যাদির উপর প্রতিষ্ঠিত সেখানে সূরা ইউনুস এবং আল মুমিনুন অনুযায়ী ইসলাম ‘পালনবাদ’ এর উপর প্রতিষ্ঠিত, শাসনবাদের চেহারায় নয়। আর সেখানে তিনি বৈষম্যের ভীতে গড়ে উঠা আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রটিকেই ইসলামিক রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার চিন্তা করছেন!
আধুনিক রাষ্ট্র জাতিপ্রশ্নে স্পষ্ট শ্রেণী আধিপত্যমূলক। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রকল্প অন্তর্ভূক্তিমূলক হওয়ার নয়। জাতিবাদ এক ধরনের বর্ণবাদ, যার সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদের তুলনা চলে। অথচ, সূরা ইউনুস অনুযায়ী ইসলাম ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক’। সূরা মুমিনুন অনুযায়ী বিভক্তি এক রূপ অজ্ঞানতা বা জাহিলিয়া। যে বিভক্তি জাতীয়তাবাদি রাষ্ট্র প্রকল্পের অনুষঙ্গ। অর্থাৎ, এই ধরণের রাষ্ট্রচিন্তা স্পষ্টতই কোরআন বিরোধী।
- মওদূদী প্রসূত তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোধিতাকারীর অবস্থান : সমাজকে শ্রেণী সংঘাত মুক্ত রাখতে তার সুপারিশ - মানুষের স্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণ এবং মওদূদী কথিত ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা । এই উদ্যোগের বিরোধিতাকারীরা বা তার ভিন্নমতাবলম্বিরা তাগুত বা খোদাদ্রোহী। অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে তিনি এটাও বলেন—তার উপস্থাপিত ইসলামী রাষ্ট্র ধারণার বিরোধিতাকারীর জীবনের অধিকার নেই।
অথচ মওদূদী বিরোধিতা তো দূর কি বাত ইসলাম বিরোধিতার ক্ষেত্রেও ধৈর্য-সংযম কে উৎসাহিত করা হয়েছে। জবরদস্তি করতে নিষেধ করা হয়েছে (৫০:৪৫), মন্দকে ভালো কাজের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত করতে বলা হয়েছে (২৩:২৬)। সমালোচনাকালে এড়িয়ে যেতে বলা হয়েছে (৪:১৪০, ৬:৬৮-৬৯)।
- বল প্রয়োগ নীতি : তার মতে, ইসলামিক সংশোধনের জন্য কেবল ওয়াজ নসিহত নয় রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজন অর্থাৎ বল প্রয়োগের ক্ষমতা। অথচ, কোরআন বল প্রয়োগের বিরুদ্ধে!
মওদূদী চিন্তিত তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্রের সঙ্গে বল প্রয়োগের ধারণাকে একাকার করে চিন্তা করতে গিয়ে কোরআনের অনেক আয়াতকে অনেক সময়ই তার যথাযথ পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যবহার করেছেন। যেমন—সূরা আনফাল এবং আত তাওবার আয়াত বদর, হুনাইন, তাবুক ইত্যাদি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাজিলকৃত।
- মওদুদীর নির্বাচনী ব্যবস্থা ও আইনসভা: ইসলামী রাষ্ট্রের জনগণের আইন প্রণয়নের অধিকার নেই বললেও তিনি এও বলেন আইনসভা থাকবে। এবং তা গঠিত হবে মুসলমানদের আস্থা সম্পন্ন প্রতিনিধিদের দ্বারা। সর্বসম্মত বা সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে আইনসভা পরিচালিত হবে বললেও, গণতন্ত্রের সমালোচনা করলেও কিভাবে এ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments