লিখিয়ে ও পড়িয়ে
লেখক: নারায়ণ চৌধুরী
লেখাপড়ার যাঁরা চর্চা করেন তাঁদের দুটি স্পষ্ট-চিহ্নিত ভাগে ভাগ করা যায়: লিখিয়ে এবং পড়িয়ে। শব্দান্ত্যমিলের খাতিরে ‘পড়িয়ে’ কথাটি ব্যবহার করলুম, কিন্তু বাংলা ভাষায় ‘পড়ুয়া’ কথাটারই সমধিক চল। তবে ‘পড়িয়ে’ বা ‘পড়ুয়া’ যে শব্দেরই ব্যবহার হোক-না কেন, প্রশংসাসূচক হয়েও ওই দুটি শব্দের ধ্বনির মধ্যে কোথায় যেন একটা প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ রয়েছে।
অপরপক্ষে ‘লিখিয়ে’ কথাটার মধ্যেও একটা সূক্ষ্ম তাচ্ছিল্যার্থ নিহিত রয়েছে বলে মনে হয়। ‘লিখিয়ে’ কথাটার ঠিক ঠিক ইংরেজী প্রতিশব্দ যদি প্রয়োগ করতে হয় তো ‘স্ক্রাইব’ বা ‘কুইল-ড্রাইভার’ কথা দুটির শরণাপন্ন হতে হয়। বলা বাহুল্য, ও দুটির কোনটিই যথেষ্ট সম্ভ্রমার্থে ব্যবহৃত শব্দ নয়। ‘লেখক’ বলতে মনে যে ভাব জেগে ওঠে, ‘লিখিয়ে’ বললে মনে ঠিক সেই ভাব জাগে না। ‘লেখক’ একটি সম্ভ্রমপূর্ণ শব্দ, ‘লিখিয়ে’ সেরূপ নয়। লেখা যাঁদের পেশা বা অভ্যাস, লিখে অর্থাৎ কলম চালিয়ে যাঁরা জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের লক্ষ্য করেই যেন ‘লিখিয়ে’ কথাটার সচরাচর ব্যবহার। তবে প্রবন্ধের শিরোনামায় ‘লিখিয়ে’ ও ‘পড়িয়ে’ বা ‘পড়ুয়া’ এই দুটি শব্দের নির্বাচন করলুম কেন? নির্বাচন করেছি এইজন্য যে, ওই দুই শ্রেণীর মানুষেরই মানসিকতা যে একপেশে, দৃষ্টিভঙ্গী খণ্ডিত, অভ্যাস ত্রুটিযুক্ত—সেটির প্রতিপাদন এই প্রবন্ধের মুখ্য বিচার্য। কিন্তু যেহেতু ত্রুটি-বিচ্যুতির আলোচনা গঠনাত্মক নয়, বিনাশাত্মক, সেই কারণে কী হলে একজন লেখাপড়ার চর্চাকারী ব্যক্তি সত্যি সত্যি একজন আদর্শ বিদ্বান বলে সমাজে পরিচিত হতে পারেন সেটি নিরূপণ করাও আমার এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হবে। অর্থাৎ বিদ্বান কে, পণ্ডিত কাকে বলে, এটিও এই রচনার নির্ণেয়।
প্রথমে ‘লিখিয়ে’-র কথা বলি।
লেখাপড়ার চর্চাকারীদের মধ্যে এক শ্রেণীর ব্যক্তি আছেন যাঁরা লিখতে ভালোবাসেন এবং অনবরত লিখেই চলেছেন। গোড়ায় হয়তো তাঁদের ‘লেখক’-রূপে প্রতিষ্ঠা অর্জনের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেজন্যে প্রযত্বেরও অভাব ছিল না; কিন্তু অবস্থার চক্রে এবং ভাগ্যের ফেরে ইদানীং তাঁদের ‘লেখক’ হবার আকাঙ্ক্ষা ঘুচে গেছে; জীবিকা নির্বাহের তাগিদেই হোক আর অঢেল অর্থ রোজগারের ধান্দাতেই হোক, তাঁরা বিরামবিহীন ভাবে দিনরাত লিখেই চলেছেন। তাঁদের জীবনে অবসর বলে কিছু নেই, যেটুকু অবসর আছে সেটুকু লিখিত রচনাদির বিলি-ব্যবস্থা করতেই কেটে যায়। লোকে যখন বিশ্রামসুখ ভোগ করছেন, এঁরা তখন পাণ্ডুলিপি বগলে করে প্রকাশকের দুয়ারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন কিংবা লেখার তাড়া হাতে নিয়ে সম্পাদকের দপ্তরে ছুটছেন। কাগজের পাতায় অক্ষর সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে লেখা তৈরী করা এবং লেখা সম্পূর্ণ হলে সে লেখার গতি করার জন্য প্রকাশক বা সম্পাদকের দ্বারস্থ হওয়া—লিখিয়ের সময় এ দুটি কাজের মধ্যেই মূলতঃ বিভক্ত। ওই প্রায়-নিশ্ছিদ্র, ঠাস-বুনন কাজের ফাঁক-ফোকর দিয়ে কখনও অন্য চিন্তা গলতে পারে কিনা তাতে সন্দেহ আছে।
অথচ আমরা জানি, লেখক হতে হলে যথেষ্ট পরিমাণে পড়াশুনো করতে হয়। অধ্যয়ন-চিন্তন-মনন-অনুভাবনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোন ভাব যখন মনে বিশেষভাবে দানা বেঁধে ওঠে এবং প্রকাশের জন্য আকুলি-বিকুলি করতে থাকে, তখনই শুধু তাকে খাতার পাতায় লিপিবদ্ধ করার প্রশ্ন ওঠে, তার আগে নয়। একটা ভাব বা কল্পনা বা আইডিয়া মনে যথেষ্ট পরিমাণে আলোড়ন তুললে ও আকার লাভ করলে তবেই তার—আলংকারিকেরা যাকে বলেছেন externalization, শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ-এর কথা আসে। কিন্তু বক্তব্য মনের মধ্যে তেমনভাবে দানা বাঁধলো না অথচ লেখবার অভ্যাসের খাতিরে হোক, বক্তব্য আধা-খেঁচড়া বা অপরিপক্ক হোক—তাকেই ভাষা দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলুম, এটা প্রকৃত লেখকের ধর্ম নয়, কলম চালিয়ের কর্ম।
লিখিয়ে বলতে যাঁদের বোঝায় তাঁদের বেশীর ভাগই এই শ্রেণীর—অভ্যাসের বশে লেখক, পেশার তাগিদে লেখক, অর্থোপার্জনের প্ররোচনায় লেখক। এ-জাতীয় লেখক লিখন রূপ পবিত্র কার্যের বলতে গেলে অবমাননাই করেন।
লেখা জিনিসটা বড়ো সহজ ব্যাপার নয়। পূর্বেই বলেছি ভাব অন্তরে সুগ্রথিত না হলে তাকে লেখায় রূপ দিতে যাওয়া কোন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments