মেডেল
কয়েক বছর পূর্বে এ-ঘটনা ঘটেছে, তাই এখন মাঝে মাঝে আমার মনে হয় ব্যাপারটা আগাগোড়া মিথ্যে; আমারই কোনোপ্রকার শারীরিক অসুস্থতার দরুন হয়তো চোখের ভুল দেখে থাকব বা ওইরকম কিছু। কিন্তু আমার মন বলে, তা নয়; ঘটনাটি মিথ্যে ও অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেবার কোনো কারণ ঘটেনি। আমার তখনকারের অভিজ্ঞতাই সত্যি, এখন যা ভাবছি তা-ই মিথ্যে।
ঘটনাটি খুলে বলা দরকার।
প্রসঙ্গক্রমে গোড়াতেই এ-কথা বলে রাখি যে, গত দশ বৎসরের মধ্যে আমার শরীরে কোনো রোগবালাই নেই। আমার মন বা মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ সুস্থ আছে এবং যে-সময়ের কথা বলছি, এখন থেকে বছর চারেক আগে, সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। আমার স্কুলমাস্টারের জীবনে অত্যাশ্চর্য বা অবিশ্বাস্য ধরনের কখনো কিছু দেখিনি। অন্য পাঁচজন স্কুলমাস্টারের মতোই অত্যন্ত সাধারণ ও একঘেয়ে রুটিন-বাঁধা কর্তব্যের মধ্যে দিয়েই দিন কাটিয়ে চলেছি আজ বহু বৎসর।
সে বছর বর্ষাকালে, গরমের ছুটির কিছু পরে একদিন ক্লাসে পড়াচ্ছি, এমন সময় একটি ছেলে আর একটি ছেলের সঙ্গে হাত কাড়াকাড়ি করে কী একটা কেড়ে বা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করছে, আমার চোখে পড়ল। আমি ওদের দু-জনকে অমনোযোগিতার জন্যে ধমক দিতে, অন্য একটি ছেলে বলে উঠল— স্যার, কামিখ্যে সুধীরের মেডেল কেড়ে নিচ্ছে—
—কার মেডেল? কীসের মেডেল?
সুধীর নামে ছেলেটি দাঁড়িয়ে উঠে বললে— আমার মেডেল, স্যার!
অন্য ছেলেটির দিকে চেয়ে বললুম— ওর মেডেল তুমি নিচ্ছিলে, কামিখ্যে?
কামিখ্যে ওরফে কামাখ্যাচরণ মৌলিক নামে ছেলেটি বললে— নিচ্ছিলুম না স্যার, দেখতে চাইছিলুম, তা, ও দেবে না—
—ওর মেডেল ও যদি না-দেয়, তোমার কেড়ে নেবার কী অধিকার আছে? বোসো, ওরকম আর করবে না।
কথা শেষ করে সুধীরের দিকে চেয়ে, ক্লাসের ছেলেদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃভাব ও সখ্য থাকার ঔচিত্য সম্বন্ধে নাতিদীর্ঘ একটি বত্তৃতা দেবার পরে ঈষৎ কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলুম— কই, কী মেডেল দেখি? কোথায় পেলে মেডেল?
ভেবেছিলুম আজকাল কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় যে সব ব্যাডমিন্টন খেলা, সাঁতারের বা দৌড়ের প্রতিযোগিতা প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, তারই কোনো কিছুতে সুধীর হয়তো চতুর্থস্থান বা ওই ধরনের সাফল্য লাভ করে ছোট্ট এতটুকু একটা আধুলির মতো মেডেল পেয়ে থাকবে; এবং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক যে, সে সেটা ক্লাসে এনে পাঁচজনকে গর্বভরে দেখাতে চাইবে; এমনকী এই ছুতো অবলম্বন করে ক্লাসসুদ্ধ হেডমাস্টারের কাছে দলবদ্ধ হয়ে গিয়ে এক বেলার জন্যে ছুটিও চাইতে পারে। সুতরাং মেডেলটা যখন আমার হাতে এসে পৌঁছল, তখন সেটাকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই হাত পেতে নিলুম; কিন্তু মেডেলটার দিকে একবার চেয়ে দেখেই চেয়ারে সোজা হয়ে বসলুম। না, এ-তো পাড়ার ব্যাডমিন্টন ক্লাবের বাজে মেডেল নয়! মেডেলটা পুরোনো, বড়ো ও ভারি চমৎকার গড়ন।— কী জিনিস দেখি?
মেডেলের গায়ে কী লেখা রয়েছে, আধ-অন্ধকার ক্লাসরুমে ভালো পড়তে পারলুম না; ও-পিঠ উলটে দেখি— মহারানি ভিক্টোরিয়ার অল্পবয়সের মূর্তি খোদাই করা। পকেটে চশমা নেই, মনে হল অফিস ঘরের টেবিলে ফেলে এসেছি। ইতিমধ্যে অনেকগুলি ছেলে ভিড় করেছে আমার চেয়ারের চারপাশে; মেডেল দেখবার জন্যে। তাদের ধমক দিয়ে বললুম— যাও, বসোগে সব, ভিড় করো না এখানে।
একটি ছেলেকে বললুম— কী লেখা আছে মেডেলের গায়ে পড়ো তো?
ক্লাস ফোরের ছেলে— অতিকষ্টে ধীরে ধীরে পড়লে, ক্রাইমিয়া, সিবাস্টোপোল, ভিক্টোরিয়া রেজিনা।
—ও-পিঠে?
—সার্জেন্ট এস বি পার্কিনস, সিক্সথ ড্রাগন গার্ডস আঠারো-শো চুয়ান্ন সাল…
দস্তুরমতো অবাক হয়ে গেলুম। ক্রাইমিয়ার যুদ্ধের সময় সিবাস্টোপোলের রণক্ষেত্রে কোনো সাহসের কাজ করবার জন্যে এই মেডেল দেওয়া হয়েছিল ইংল্যান্ডের সামরিক দপ্তর থেকে ড্রাগন গার্ডস সৈন্যদলের সার্জেন্ট পার্কিনসকে। এ তো সাধারণ জিনিস মোটেই নয়!
ক্রাইমিয়া…সিবাস্টোপোল?… চার্জ অব দি লাইট ব্রিগেড! কিন্তু কলকাতার নীলমণি দাস লেনের সুধীর সাহার কাছে সে মেডেল কোথা থেকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments