সংস্কৃতির গোড়ার কথা
সংস্কৃতির যে রূপান্তর হয়, সে রূপান্তর যে বারবার হইয়াছে—এই সহজ সত্যটি অনেকে একেবারেই হয়ত মানেন না; আবার অনেকে মানিয়াও তাহা সম্পূর্ণরূপে বুঝিতে চাহেন না। ইহার অনেক কারণ আছে। প্রথম কথা, সংস্কৃতি বলিতে কি বুঝায় তাহাই আমরা স্পষ্ট করিয়া জানি না। কেহ মনে করি, সংস্কৃতি বলিতে বুঝায়—কাব্য, গান, শিল্প, দর্শন, ধ্যান-ধারণা। কেহবা মনে করি—আচার-অনুষ্ঠান, ভদ্রতা-শিষ্টাচার; সে সম্পর্কীয় ভাবনা-ধারণা, নীতি-নিয়ম, এই সবও উহার অন্তর্গত। কেহবা উহাদের কোনো একটি জিনিসকেই সব বলিয়া ধরিয়া লইবেন। যেমন, কেহ বলিবেন ধর্মই হইল সংস্কৃতি; ধর্ম সর্বব্যাপক। কেহবা অপর কোনো জিনিসকে মনে করেন মুখ্য কথা। যেমন, ভদ্রতা, শিষ্টচার, ইহাকেই বলেন ‘কাল্চার’ তাই সংস্কৃতির অর্থ কি, তাহার বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা কি, প্রথমত এই কথাটাই আমাদের পরিষ্কার করিয়া জানা প্রয়োজন।'[★]
মূল একটি কথা স্পষ্ট—সংস্কৃতি শুধু মনের একটা বিলাস নয়, শুধু মাত্র মনের সৃষ্টি-সম্পদও নয়। উহা বাস্তব প্রয়োজনে জন্মে এবং মানুষের জীবন-সংগ্রামে শক্তি জোগায়,জীবনযাত্রার বাস্তব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে। সেই জীবন-যাত্রারই ঘাত-প্রতিঘাতে সংস্কৃতির রূপ ও রঙও পরিবর্তিত হয়। জীবনযাত্রা যেমন অগ্রসর হয় সংস্কৃতিও তেমনি রাখিয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে নূতন হইয়া উঠে।
আবার, সংস্কৃতির সহায়েও জীবনযাত্রার সঙ্গে তাল জীবনের সঙ্গে সংস্কৃতির এই সম্বন্ধ যখন দেখিতে পাই তখনি বুঝি সংস্কৃতি নিশ্চল নয়,—তাহার রূপান্তর ঘটে।
সংস্কৃতির বিষয়ে দ্বিতীয় কথাটি তাই এই—কোন্ নিয়মে সংস্কৃতির রূপান্তর চলিয়াছে তাহা বুঝিয়া লওয়া, পরিবর্তনের মূল তত্ত্বটির পরিচয় লওয়া। ইহার ফলে সংস্কৃতির মোট অবয়ব ও অবলম্বন কী, কী তাহাদের পরস্পরের সম্পর্ক, তাহাও বুঝিতে পারি। সংস্কৃতির রূপান্তরের ধারা তখন প্রায় স্পষ্ট হইয়া উঠে। শুধু ইতিহাসের সাক্ষ্যের দিকে তখন একবার লক্ষ্য করিতে হয়, দেখিতে হয় ইতিহাসের স্তরে স্তরে সংস্কৃতির কোন্ কোন্ রূপ কি ভাবে বিকাশ লাভ করিয়াছে। তাহাই এই প্রসঙ্গের শেষে প্রয়োজন—ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে সংস্কৃতির পরিচয় সাধন ৷ অর্থাৎ ইতিহাসের প্রবাহের পরিচয় লওয়া; বুঝিয়া লওয়া ইতিহাসের ধারা কোন্ দিক হইতে বহিয়া আসিয়াছে, কোন্ দিকে বহিয়া চলিয়াছে;—আমাদের দেশেই বা তাহা কোন্ খাত হইতে কোন্ খাতে বহিয়া আসিতেছে। ইহা বুঝিলে আর সন্দেহ থাকে না—দেশ-বিদেশের ইতিহাসের কোন্ নূতন রূপ আজ প্রকাশিত হইতেছে—সংস্কৃতির রূপান্তরের ধারাও চলিয়াছে আজ কোন্ দিকে ৷
সংস্কৃতির অর্থ কী?
সংস্কৃতির অর্থ কী, এই প্রশ্ন করিবার সঙ্গেই একটা কথা আমাদের মনে জাগা উচিত—মানুষেরই সংস্কৃতি আছে, অন্য জীবের সংস্কৃতি বলিয়া কিছু নাই। তাহার অর্থ—মানুষ হিসাবে মানুষের আসল পরিচয়ই তাহার সংস্কৃতি; এই ‘ক্বতির' বা কাজের বলেই মানুষ মানুষ হইয়াছে, প্রকৃতির নিয়মও বুঝিয়া উঠিতেছে, বাধা ছাড়াইয়া যাইতেছে ৷
প্রাণী মাত্রেরই জীবনের মূল প্রেরণা—বাঁচিয়া থাকা। মানুষ এই তাড়নায় চাহে আপনার পরিবেশের সঙ্গে বুঝা-পড়া করিয়া টিকিয়া থাকিতে ৷ অর্থাৎ মানুষ চায়, বাঁচিবার উপায় যতটা পারে প্রকৃতির নিকট হইতে আদায় করিয়া লইতে। ইহারই নাম জীবিকা-চেষ্টা। মানুষের সভ্যতা বা সংস্কৃতির মূল প্রেরণ। তাই প্রকৃতির অন্ধ দাসত্ব হইতে মুক্ত হওয়া, অর্থাৎ জীবিকা আয়ত্ত করা, তাহা সহজসাধ্য করা। দৈহিক মানসিক প্রয়াস প্রযত্নে এই জীবিকা সে ক্রমেই আয়ত্ত করিয়াছে—এই প্রয়াস-প্রযত্নেরই নাম পরিশ্রম। এবং এই পরিশ্রমেরই ফলে তাই মানুষ অন্য জীব অপেক্ষা উন্নত হইয়াছে, স্বাতন্ত্র্য লাভ করিয়াছে, শেষে সভ্যতার এক-একটি উপাদান সৃষ্টি করিয়াছে। সংস্কৃতির মুলের কথা তাই জীবিকা-প্ৰয়াস, শ্রমশক্তি; আর সংস্কৃতির মোট অর্থ বিশ্বপ্রকৃতির সহযোগে মানব-প্রকৃতির এই স্বরাজ-সাধনা ৷
জীব-জগৎ প্রকৃতির নিয়মে বাঁধা। সে নিয়মকেই আপনার নিয়ম বলিয়া মানিয়া লইয়া তাহারা বাঁচে, তাহারা মরে। কিন্তু মানুষ জীবজগতের মধ্যেও একটু স্বাতন্ত্র্য্য লাভ করিয়াছে। বাঁচিবার উপায়—জীবিকার উপাদান—সে নিজেই পরিশ্রমের দ্বারা সৃষ্টি করিতে পারে, নিষ্ক্রিয় হইয়া প্রকৃতির একান্ত মুখাপেক্ষী থাকে না। তাই, সে চেষ্টা করিয়া চলিয়াছে কি করিয়া জীবন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments