সিলেটের মরমি-মানস সৃজন ও গণশিক্ষায় সিলেটি নাগরীলিপির ভূমিকা
বঙ্গের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ এবং তার সংলগ্ন এলাকায় সিলেটি নাগরীলিপি প্রবর্তন এবং প্রায় পাঁচশ’ বছর টিকে থাকা বিস্ময়কর এক ঘটনা। একটি ভাষার একাধিক লিপি উদ্ভাবনা, তার প্রয়োগ এবং চর্চায় মানুষের যে বিপুল অংশগ্রহণ তার নজীরও দুনিয়ায় বেশি একটা নেই। সিলেটি নাগরীলিপি একটি বর্ণমালা, বাংলাভাষারই বর্ণমালা। বাংলা বর্ণমালার সহযোগী বর্ণমালা। সৈয়দ মুতার্জা আলী, মুহম্মদ আসাদ্দর আলী, গবেষক ড. গোলাম কাদির, ড. মোহাম্মদ সাদিকসহ আরও অনেকেই একে বাংলা ভাষার ‘বিকল্প বর্ণমালা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সিলেটি নাগরীলিপি বাংলা বর্ণমালার বিকল্প বর্ণমালা হলেও স্বকীয়তামণ্ডিত। কেবল বর্ণাকৃতিই আলাদা নয়, তার রয়েছে নিজস্ব রীতি। বাংলা বর্ণমালাকে ব্যাপক পরিমার্জনা করে ‘সিলেটি নাগরীলিপি’ উদ্ভাবন করেছেন প্রবর্তকেরা। বর্ণ সংখ্যা, যুক্তবর্ণ ইত্যাদি কমিয়ে ভাষা চর্চাকে গতিময় করা হয়েছে। সাধারণ এবং নিরক্ষর মানুষের কাছে ভাষা চর্চা সহজতর করাই ছিল এই লিপি আবিস্কারের মুখ্য উদ্দেশ্য। সিলেটি নাগরীলিপির অন্য একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়, এটি বাংলা বর্ণমালাকে অনুসরণ করলেও তার সাহিত্য ধারণ করেছে সিলেটের লোকভাষাকে, কেতাবি ভাষায় যা ‘সিলেটি উপভাষা’ হিসেবে স্বীকৃত।
সিলেটি নাগরীলিপির বর্ণনাম, উচ্চারণ এবং ব্যবহারবিধি বাংলা বর্ণমালাকে অনুসরণ করলেও তার রয়েছে নানা ব্যতিক্রম। নাগরীলিপির সৌজন্যে সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত লোকভাষাটির বিগত চারশ’ বছরের ভাষা-কাঠামো সংরক্ষিত রইল। এ অঞ্চলের ভাষার বিবর্তন-ধারাটিও বুঝতে সিলেটি নাগরীলিপিসাহিত্য অধ্যয়নের বিকল্প নেই।
II ২ II
মানবমনীষার শ্রেষ্ট কীর্তি লিপি বা লিখন পদ্ধতি উদ্ভাবন। বস্তুত, এই উদ্ভাবনার মধ্য দিয়ে পৃথিবী সভ্যতার পথে দীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে। লিখন পদ্ধতি উদ্ভাবনের ফলে মানবসভ্যতায় যুগান্তকারী এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। লিপি চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ তথ্য, তত্ত্ব, জ্ঞান, চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং সৃষ্ঠিশীলতাকে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ, প্রচার এবং বিস্তারের সুবর্ণ সুযোগে পেয়ে অভিনব জাগরণ তৈরিতে সক্ষম হয়েছে।
লিপি আবিস্কারের ইতিহাস ১০ হাজার বছরের প্রাচীন হলেও বাংলা বর্ণমালা চালু হয় সহস্রাধিক বছর আগে। বাংলা বর্ণমালার প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় চর্যাপদে, প্রায় হাজার বছর আগে। তারপর এগিয়েছে বাংলালিপির সাহিত্য। বাংলা ভাষাচর্চার মূলধারা বাংলা বর্ণমালার অরুদ্ধ যাত্রাপথে চতুর্দশ শতকে যুক্ত হয় আরেক বর্ণমালা, নাম তার ‘সিলেটি নাগরীলিপি’। ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এই বর্ণমালা ৫০০ বছর বাংলা বর্ণমালার সমান্তরালে অবস্থান করে বঙ্গের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের বড় আপন হয়ে ওঠেছিল। তাদের অপত্যস্নেহে এই লিপির দাপটে বাংলালিপি চর্চা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে ওই অঞ্চলে। সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় আদৃত হয়ে নবউদ্ভাবিত সিলেটি নাগরীলিপি জীবন এবং সাহিত্যচর্চায় অতুলনীয় প্রভাব বিস্তার করে।
II ৩ II
লিপির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে চতুর্দশ শতকে। ঘটনাটি পৃথিবীতে এখনও ব্যতিক্রমী এক ঘটনা। গোটা দুনিয়ার মানুষ প্রায় সাত হাজার ভাষায় কথা বলেন। সাতহাজার ভাষার অধিকাংশের নিজের লিপি নেই। যাদের ভাষা আছে, অথচ লিপি নেই সেসব ভাষার মানুষেরা তাদের ভাষার জন্য লিপি উদ্ভাবনের পরিবর্তে আশ্রয় নেন অন্য ভাষার লিপিতে। অর্থাৎ অন্য ভাষার লিপিকে ব্যবহার করে তাদের ভাষাকে তারা লিপিবদ্ধ করেন। অন্য কোনও লিপিকে তারা আত্তীকরণ করেন নিজের ভাষার জন্য। এক্ষেত্রে রোমান লিপিকেই বেশি গ্রহণ করতে দেখা যায়। বাংলাদেশেও এর নজীর রয়েছে। কয়েকটি আদিবাসী নৃগোষ্টী তাদের ভাষা লেখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন অন্যের লিপি—অধিকাংশে ক্ষেত্রে রোমানলিপি, অথবা বাংলালিপি। অনেক জনগোষ্টী আছেন, যাদের ভাষার চর্চা চলে শুধু মুখে মুখে, তাদের লিখিত সাহিত্য নেই। ওই ভাষাগুলো ক্রমেই বিলোপের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এর কোনও কোনওটি হারিয়েও যাচ্ছে চিরতরে। ভাষা গবেষকদের তথ্যমতে, প্রতি পনের দিনে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে একটি ভাষা। বাংলাদেশে কয়েকটি ভাষা এরকম বিপন্ন অবস্থায় আছে। এদের একটি ‘রেমচিংটা’। ওই ভাষায় কথা বলার জন্য এখন বেঁচে আছেন মাত্র ১০-১২ জন মানুষ। এদের জীবনাবসান
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments