ধনতন্ত্রে অসাম্য : থমাস পিকেটির মার্কসীয় পাঠ
একজন পুঁজিপতি তাঁর বন্ধুকে নিয়ে নিজের কারখানার মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলেন। বন্ধুটি পুঁজিপতি ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন—‘তুমি ওই লেবারটিকে এক্ষুণি কী বললে?’
পুঁজিপতি ভদ্রলোকটির জবাব, ‘আমি ওকে বললাম আরও দ্রুত কাজ করতে।’
বন্ধুটির পরের প্রশ্ন—‘কত টাকা দাও ওকে?’
‘দিনে ১৫০ টাকা।’—জবাব দেন পুঁজিপতি।
বন্ধুটি এবার জানতে চাইলেন—‘তুমি ওকে পয়সা দেওয়ার অর্থ কোথা থেকে পাও?’
—‘আমি জিনিসপত্র বিক্রি করি।’
—‘কে তৈরি করে সেই জিনিসগুলো?’
—‘কে আবার, ও আর ওর মতন লেবারগুলো।’
—‘ওই লোকটা দিনে কটা প্রডাক্ট তৈরি করে?’
—‘এই... দিনে ১০০০ টাকার মতন।’
—‘তার মানে হলো তুমি ওকে দাওনা উলটে ও তোমাকে প্রতিদিন ৮৫০ টাকা করে দিচ্ছে, যাতে তুমি ওকে বলতে পারো কাজের গতি বাড়ানোর কথা।’
—‘উফ, আরে বাবা মেসিনগুলো তো আমিই কিনেছি নাকি।’
—‘কীভাবে তুমি মেসিনগুলো কিনলে?’
—‘জিনিসপত্র বিক্রির টাকায়।’
—‘আর কে বানাল সেই জিনিসগুলো?’
—‘শাট আপ। এবার চুপ করো। ও তোমার কথা শুনতে পেয়ে যাবে।’
মোটের ওপর এই হল আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থা। যার নাম পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা। কার্ল মার্কস তাঁরডাস ক্যাপিটাল(১৮৬৭) মহাগ্রন্থে এই ব্যবস্থার একটি অনুপুঙ্খ বর্ণনা সহ গভীর ব্যাখ্যা প্রস্তুত করেছিলেন। বলা যায় তাঁর পর থেকে পৃথিবীকে দুটি ভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন—মার্কসবাদী ও অ-মার্কসবাদী। ‘ডাস ক্যাপিটাল’ মহাগ্রন্থের বয়স প্রায় ১৫০ বছর হতে যায়। সময়টা ঠিক কেমন একটু বুঝে নিই। ২০০৭-০৮-এর অর্থনৈতিক সঙ্কটের ফলে ধনতন্ত্রের এখনও বেশ পর্যুদস্ত অবস্থা। অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট আন্দোলন ঘটে গেছে—যেখানে ‘আমরা ৯৯% আর ওরা ১%’, এই দাবি ধনতন্ত্রে অসাম্যের চিত্রটি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।নিউ ইয়র্ক টাইমসপত্রিকার আর্কাইভস-এ খোঁজ করে দেখা গেছে যে ২০০৭ থেকে ২০১৪, এই সাত বছরের মধ্যে শুধু ‘ইনকাম ইনইক্যুয়ালিটি’ অর্থাৎ আয়-অসাম্য বিষয়েই ৪২৬০টি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। অন্যদিকে ১৯৭৭ থেকে ২০০৭, এই সুদীর্ঘ সময়ে একই বিষয়ে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র ২৬৬০টি। এমত সময়ে ২০১৪ সালে ফ্রান্সের এক স্বঘোষিত অ-মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদথমাস পিকেটিলিখলেন আর একটি গ্রন্থ—ক্যাপিটাল ইন টুয়েন্টি ফাস্ট সেঞ্চুরি—যে বইটি প্রকাশের পরের কয়েক মাসের মধ্যেই তোলপাড় করে দিল প্রথাগত অর্থনীতিবিদদের ছায়া-সুনিবিড় শান্তির নীড়। নিজেকে প্রকাশ্যে অ-মার্কসবাদী ঘোষণা সত্ত্বেও পিকেটি-র এই গ্রন্থের নামকরণেই মার্কসেরক্যাপিটাল-এর ছায়া স্পষ্ট। এই লেখাটিতে আমরা প্রথমে পিকেটির বইটির মূল বক্তব্যগুলো দেখে নেবো। তারপরে আমরা মার্কসীয় তত্ত্বানুসারে এই বক্তব্যগুলির যাথার্থ্য বিশ্লেষণ করবো।
পিকেটির মূল বক্তব্য
পিকেটি দীর্ঘকালীন তথ্যের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন কী ভাবে অত্যন্ত মারাত্মক হারে অর্থনৈতিক অসাম্য বেড়ে চলেছে। উনি বিভিন্ন দেশের তথ্য নিয়ে কাজ করেছেন।
পিকেটি-র চারটি মূল সিদ্ধান্ত নিয়ে এবার আলোচনা করব।
প্রথমত, আমেরিকার মতই বিশ্বের প্রায় সমস্ত প্রান্তে অসাম্যের একই রকম ভয়াবহ অবস্থা দেখা গেছে। দ্বিতীয়ত, আমেরিকাতে একটি ‘সুপার-ম্যানেজার’ শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, যারা প্রচুর মাইনে পায় এবং যারা নাকি এতটাই ক্ষমতাশালী যে তারা নিজেদের মাইনে নিজেরাই ঠিক করতে পারেন। তৃতীয়ত, সর্বাধিক ধনীদের সর্ব্বোচ্চ ১%-এর অবস্থান সাধারণের থেকে বরাবর অনেক অনেক উঁচুতে। একমাত্র যে সময়টায় পুঁজি-মুনাফা অনুপাত তুলনামূলকভাবে কিছুটা কমেছিল এবং সমাজে সমতা কিছুটা হলেও দেখা গিয়েছিল, সেটা হলো ১৯১৪ থেকে ১৯৭০ সাল মধ্যবর্তী পর্যায়। এই সময়কালটিতে বিভিন্ন সংকট, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব, মহামন্দা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, চীন বিপ্লব ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে বিশ্ব-ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক উল্টোগতি দেখা যায়। একদিকে ধনীদের উপর চাপানো হয়েছিল ট্যাক্সের ভারী বোঝা এবং অন্যদিকে বিশ্বযুদ্ধ ও মহামন্দায় অনেকের সম্পদ নষ্ট হয়েছিল বিস্তর। এছাড়া এই সময়কালে বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনেরও বিস্তার ঘটেছিল। মালিকপক্ষ এবং সরকার আরও বড় কোনো বিপর্যয় এড়াতে এইসমস্ত ব্যবস্থা মানতে বাধ্য হয়েছিল। তাই এই ষাট বছরে অসাম্য
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments