অলৌকিক

ভোরবেলার একটি ক্ষণস্থায়ী, অপরূপ মুহূর্ত আছে, আমি তার নাম দিয়েছি পূর্বাভাসের সময়। তা বেশিক্ষণ থাকে না, সংসারের তাড়াহুড়োয় আর সাধারণ পরিবেশে প্রায়ই আমাদের অলক্ষ্যে মিলিয়ে যায়।

স্নেগোভেৎসের কাঠের কলের বাঁশির আওয়াজটা বাচ্চা মোরগের তীক্ষ্ণ ডাকের মতো সারা উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ার পরই আসে এই মুহূর্তটি।

বাঁশির আওয়াজ মিলিয়ে গেলে পর নেমে আসে পাতলা সুতোর মতো পলকা নিস্তব্ধতা।

যেদিন ভাল থাকে সেদিন ভোরবেলা বিছানা ছেড়ে আমি চলে আসি সারা দোতলা জোড়া ঝুল বারান্দাটায়। ঘুম ক্লান্তি আলস্য কিছুই আমায় ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। বারান্দা থেকে দেখতে পাই পাহাড়ের পাড় ঘেরা স্নেগোভেৎসের সমস্তটা।

সূর্য ওঠেনি। কিন্তু তার ম্লান সোনালী আভা সারা জগতে ছড়িয়ে পড়েছে। পাহাড়ের ঢাল জুড়ে বনের কালো প্রাচীর, রাত্রির শেষ ছায়াটুকু সেখানে অন্ধের মতো পথ হাতড়ে মরছে। সরু রাস্তাগুলোয় জনমানুষ নেই। বাড়িগুলো যেন ঘুমন্ত। পাহাড়ী ঠান্ডায় তাদের যেন শীত শীত করছে, ঘুমের মধ্যে পায়ের লেপ সরে গেলে লোকের যেমন হয়—ঠান্ডা লাগছে, কিন্তু কেন লাগছে তা বোঝা যায় না।

কিন্তু না, কেউই ঘুমিয়ে নেই। সবাই জেগে উঠে মন্ত্রমুগ্ধের মতো অপেক্ষা করছে অপূর্ব অলৌকিক কিছুর। দিন আসছে! এ যেন যৌবনের কাল, তার সামনে পড়ে রয়েছে ভবিষ্যৎ জীবন।

প্রত্যেক সজীব প্রাণে অলৌকিকের বীজ অঙ্কুর মেলেছে, ফুটে ওঠার জন্য তা প্রস্তুত। শক্তি সঞ্চয়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন সবকিছুকেই সে আনন্দে ভরে দিতে পারে।

কিন্তু মুশকিল হয়েছে: দিন শেষ হয়ে যায়—মনে হয়, যা কিছু করা উচিত ছিল সবই তো করেছি। কিন্তু অত্যাশ্চর্য অলৌকিকের দেখা মেলে না, নিজের মধ্যে কখন যে সে শুকিয়ে ঝরে যায় জানতেও পারি না। কেবল এইটুকুই বুঝতে পারি যে সে ফুটে ওঠেনি, আনন্দ আনেনি...

এই ব্যর্থতার বোধ অবশ্য একদিনের ব্যাপারই নয়। কখনও কখনও একটি দিন, কখনও বা কয়েক বছরের। তফাৎ এই যে অর্থহীন অপচয়ে নষ্ট জীবনের তিক্ততার চেয়ে একটি ব্যর্থ দিন নিয়ে অনুশোচনা মানুষের পক্ষে সহজ।

এই অলৌকিক কোথায় বাধা পেল, কী ত্রুটি ঘটল, একথা প্রায়ই ভেবেছি, কিন্তু উত্তর মেলেনি।

একদিন সকালবেলা হোটেলের আরও দুজন অতিথি আমার সঙ্গে স্নেগোভেৎসের ভোর হওয়া দেখতে এলেন। তার আগের দিনই কমিউনিস্ট পার্টির জেলা কমিটির অধিবেশন শেষ হয়েছে, আমার সঙ্গী দুজন তাতে যোগ দিয়েছিলেন। এঁদের একজন হলেন ডাক্তার নিকলাই গেরাসিমভিচ আভদেয়েভ। মোটাসোটা লোকটি, মাথার পাকা চুলগুলো ছোট ছোট করে ছাঁটা। বছর বার আগে আভদেয়েভ এই পাহাড়ের বুকে যুদ্ধরত গেরিলা দলের সঙ্গে ঘুরেছেন; তিনি ছিলেন সে দলের চিকিৎসা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত, চিকিৎসা বাহিনীর লেফটেনান্ট কর্ণেল। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আভদেয়েভ জানালেন, তিনি কার্পেথিয়ান অঞ্চলেই কাজ করতে চান। উজ্গরদে তাঁকে যে কোন একটা হাসপাতাল বেছে নিতে বলা হল। দেয়ালের ম্যাপের কাছে এগিয়ে গিয়ে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন ভেরখভিনার[☆‌] পাণ্ডববর্জিত একটা অজপাড়াগাঁ।

‘ওখানে তো কোন হাসপাতাল নেই,’ বেশ ভদ্রভাবেই তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হল।

‘তৈরী করব!’ আভদেয়েভ বললেন।

‘কিন্তু পরিকল্পনায় তো সে রকম কোন ব্যবস্থা নেই,’ জানান হল।

‘লোকের মাপে জামা, জামার মাপে লোক নয়,’ আভদেয়েভ বিড়বিড় করে বললেন।

কিয়েভ আর মস্কোয় ঘোরাঘুরি করে, দুমাস ধরে কর্তৃপক্ষকে জ্বালিয়ে আভদেয়েভ তো শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের ব্যবস্থা করলেন। তারপর নিজের তৈরী সেই গ্রামের হাসপাতালে ডাক্তার নিযুক্ত হলেন।

যুদ্ধে ডাক্তার তাঁর পরিবারের সবাইকে হারিয়েছেন। একার সংসার, কিন্তু সর্বদা চেষ্টা করেন যতটা পারেন সকলের মধ্যে থাকতে।

সংসারে তাঁর আপনার বলতে ছিল কেবল একটা বেঁটে, মোটা, বুড়ো, বাদামী রঙের যুদ্ধের ঘোড়া। নাম তার মিশকা। যুদ্ধের পর মিশকাকে সবাই খরচের খাতায় লিখে রেখেছিল। কিন্তু ডাক্তার ঘোড়াটিকে উদ্ধার করে বহু সেবা যত্নের পর

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice