আমার শহর ময়মনসিংহ : শ্রুতিতে স্মৃতিতে সত্তায়
মুখ দিয়ে সবে কথা ফুটছে। তখন থেকেই আমাকে সব ব্যাপারে জ্ঞানী করে তোলার জন্য আমার ঠাকুর্দার মানে পিতামহের কী সাংঘাতিক গরজ! মুখে মুখে নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই তার উত্তর দিয়ে, আবার আমার মুখ দিয়ে তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে, পাখি পড়ানোর মতো শেখাতেন—
'তোমার বাড়ি কোন গ্রামে?’—চন্দ্রপাড়া। ‘কোন্ ইউনিয়ন?' -আশুজিয়া। 'থানা?’—কেন্দুয়া। ‘মহকুমা?’—নেত্রকোনা। 'জিলা?’—ময়মনসিংহ।
‘নেত্রকোনা' আর 'ময়মনসিংহ' কথা দুটো নিজেই বারবার আবৃত্তি করতাম। সেই এতটুকু বয়সেই এ-দুটো নামের প্রতি আমার প্রচণ্ড আকর্ষণের একটা গূঢ় কারণ ছিল। আমাদের গাঁয়ের আশপাশের বাজার গুলোতে হাটের দিনে তেল নুন কেরোসিন মাছ তরকারি পাওয়া যেতো, ছোট ছোট লিলি বিস্কুট কিংবা ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া তক্তা বিস্কুটও পাওয়া যেতো; কিন্তু শখের জিনিস মিলতো না কিছুই, লজেন্স বা চকোলেট পেতে হলেও যেতে হতো নেত্রকোনায়, প্যান্ট-জুতা বা জামা সব কিছুই নেত্রকোনা থেকেই আনতে হতো। আবার এ-সবগুলোরও উন্নত মানের বা শৌখিন সংস্করণের কিছু পেতে চাইলে যেতে হতো ময়মনসিংহে। ময়মনসিংহ-থেকে-আনা জিনিসের কদরই আলদা।
আমাদের গাঁয়ের বা পাশের গাঁয়ের যে-লোকটি কলকতায় থাকতো, গাঁয়ের মানুষের চোখে তো সে ছিল একান্তই অসাধারণ। আমার সেই প্রাক্-পাকিস্তান যুগীয় শৈশবে ঢাকার কোনো গুরুত্বই ছিল না আমাদের অঞ্চলের লোকদের কাছে। কেবল ‘ঢাকা-কইলকাতা’ এই যুগ্ম শব্দটির প্রয়োগ শোনা যেতো গাঁয়ের মানুষের মুখে স্থানিক দূরত্ব বা বৃহত্ত্ব বোঝাতে। ঢাকা তো নয়ই, কলকাতা-প্রবাসী লোকের সংস্যাও খুব একটা বেশি ছিল না। যা-ও ছিল, দেখা মিলতো খুবই কালেভদ্রে। সে-তুলনায়, ময়মনসিংহ শহরে থাকতো এমন লোক ছিল অনেক বেশি-সংখ্যক কাজে-কর্মে সেখানে হর-হামেশা যাতায়াত করতো, তেমন লোকও ছিল দেদার। তাদের মুখে শুনে শুনে ময়মনসিংহের যে ছবি আমি মনের ভেতর তৈরি করে ফেলেছিলাম, তা-ই দিয়েই, সেই সুদূর শৈশবেই আমার বুকের গভীরে ময়মনসিংহের একটা মনোময় রূপ গড়ে উঠেছিল।
উনিশ শো তেতাল্লিশে, যখন আমার বয়স সাত বছর, তখন আমি প্রথম ময়মনসিংহ শহর দেখতে পাই। মুক্তাগাছার এক গ্রামে আমার মামার বাড়ি। ময়মনসিংহ শহরের উপর দিয়েই যেতে হয় সেখানে। মামার বাড়ি যাওয়ার সূত্রেই আমার প্রথম শহর দেখা। আর সে-দেখার অভিজ্ঞতা রবীন্দ্রনাথের শৈশবের লন্ডন শহর দেখার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। লন্ডন কিংবা পৃথিবীর আর কোনো বড়ো শহর দেখারই সৌভাগ্য আমার বুড়ো বয়সের আগে হয় নি; কারণ ‘ইচ্ছা সম্যক্ জগদরশনে, কিন্তু পাথেয় নাস্তি'। এমন কি এককালের পূর্ব পাকিস্তানের এবং একালের বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা নগরীর সঙ্গে ও আমার সম্পর্ক বিদেশী পর্যটকের মতো, গাঢ় পরিচিতির কোনো সুযোগই আমার হয় ওঠে নি। ঢাকার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি পড়াশোনা করিনি, জীবিকা তথা কর্মসূত্রেও ঢাকায় অবস্থান করিনি কোনোদিন। তাই চিরটাকাল আমি ‘গাঁইয়া’ই রয়ে গেলাম, শৈশবের স্বপ্নের ময়মনসিংহ শহরকেই ‘যৌবনের উপবন বার্ধক্যের বারানসী' বানিয়ে নগর-জীবনের স্বাদ নিলাম 'দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো করে।
উনিশ শো তেতাল্লিশে ময়মনসিংহে প্রচুর ঘোড়ার গাড়ি ছিল। দুই ঘোড়ার 'বগগি' আর এক ঘোড়ার টমটম—দুই-ই। সে-বছর ময়মনসিংহ শহর থেকে আমার মামার বাড়িতে গিয়েছিলাম ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে। সে কী পুলক শিহরণ! ঠাকুর্দার কাছে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শুনে শুনে সেই বয়সেই পৌরাণিক যান রথের একটা মনোময় রূপ গড়ে তুলেছিলাম। ঘোড়ার গাড়িতে চলতে চলতে সেই রথচলারই অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম—আমি যেন দশরথের পুত্র রাম আর গাড়ির চালকটি সুমন্ত্র সারথী।
ঘোড়ার গাড়ির পাশাপাশি সাইকেল রিকসা ও বাসও চালু ছিল তখনই। তিন-চার বছর যেতে-না-যেতেই ঘোড়ার গাড়ির সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এল। সাতচল্লিশে পাকিস্ত ান হলো। তার কয়েক বছরের মধ্যেই ঘোড়ার গাড়িশূন্য হয়ে গেল সারা ময়মনসিংহ। উনিশ শো পঁয়ষট্টি সনের দিকে দেখতাম একটা ঘোড়ার গাড়িতে মাইক লাগিয়ে এক ওষুধওয়ালা 'পাহাড়ি পোস্টাই-এর ক্যানভাস করছে ময়মনসিংহ শহরের পথে পথে আর ছোট ছোট
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments