চেতনার বিজ্ঞান

বিজ্ঞানচেতনা'—এই সমাসবদ্ধ শব্দটির ব্যাসবাক্য নির্ণয় করা যায় নানাভাবে। যেমন বিজ্ঞানের চেতনা, বিজ্ঞানবিষয়ক বা বিজ্ঞানসম্পর্কীয় চেতনা, বিজ্ঞানসম্মত চেতনা, বিজ্ঞানভিত্তিক চেতনা। এইসব ব্যাসবাক্য 'বিজ্ঞানচেতনা'র যেসব অর্থ বা তাৎপর্য আমাদের সামনে তুলে ধরে সেগুলো সবই মূল্যবান ও প্রয়োজনীয়। তাই 'বিজ্ঞানচেতনা পরিষদ' নামক সংগঠনটির কার্যকলাপে একান্তই আশাবাদী হয়ে উঠি।

তবে বিজ্ঞানচেতনা পরিষদের কাছে আমার একটি প্রত্যাশা আছে। সেটি হচ্ছে: এই পরিষদ যেন 'চেতনার বিজ্ঞান' অনুশীলনে মনোযোগী হয়। মানুষের চেতনার কিভাবে উদ্ভব ঘটে, কিভাবে সেই চেতনা বিকশিত হয়, নানান মানুষ নানান চেতনার কেন অধিকারী হয়, কিংবা একই মানুষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী চেতনার সহাবস্থান ঘটার কি হেতু, চেতনার রূপান্তর ঘটে কোনো প্রক্রিয়ায় এসব বিষয়ের অনুসন্ধান ও অনুশীলন, আমার বিবেচনায় খুবই জরুরি। চেতনার বিজ্ঞান সম্বন্ধে সচেতন না হলে 'বিজ্ঞানচেতনা' যে একটা নিতান্ত ছেঁদো কথায় পর্যবসিত হতে পারে, আমি সব সময়ই এ রকম আশঙ্কা করে থাকি।

চেতনার বিজ্ঞানকে আমরা সাধারণভাবে মনোবিজ্ঞান বলে গ্রহণ করতে পারি। তবে মনোবিজ্ঞান বিষয়টিই ভারি গোলমেলে। সব বিজ্ঞানেই মতের বা দৃষ্টিকোণের বিভিন্নতা নিয়ে বিভিন্ন 'স্কল' বা ঘরানা গড়ে ওঠে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন 'স্কুল' গুলোর যে রকম সাপে-নেউলে সম্পর্ক, এ রকমটি বোধহয় অন্য কোনো বিজ্ঞানেই নেই। মনোবিজ্ঞান যা নিয়ে কাজ করে সেই 'মন'-এর সংজ্ঞার্থ বা স্বরূপ নিয়েও এ-বিজ্ঞানের এক ঘরানার সঙ্গে আরেক ঘরানার কোনো মিল নেই। এমন কি 'মন'-এর অস্তিত্বই স্বীকার করে না, মনোবিজ্ঞান নামক শাস্ত্রটিরই এমন ঘরানাও আছে। বিহেভিয়ারিজম বা আচরণবাদ তো প্রাণীকুলের আচরণকেই সর্বেসর্বা করে তুলেছে, সনাতন 'মন' সেখানে নিতান্তই ফালতু। অন্যদিকে, আচরণবাদীদের বিপরীতে প্রবৃত্তিবাদীদের কাছে 'মন' প্রায় স্বয়ম্ভ ও স্বত:প্রমাণিত। ফ্রয়েড থেকে শুরু করে এড়লার, ইয়ং হয়ে এরিক ফ্রম বা কারেন হর্নি পর্যন্ত বিচিত্রবিধ প্রবৃত্তিবাদী মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে নানান বাদ-বিসংবাদ থাকলেও মূলে তাঁরা এক। মনের নানা স্তরবিন্যাসের তাঁরা খোঁজ-খবর করেন, তাঁদের মতে অবচেতন মনের শক্তিই অসীম এবং চেতন মনের ক্ষমতা একান্তই সীমিত, মানুষ যা কিছু করে তাতে তার সচেতন ইচ্ছার তেমন কোনো ভূমিকাই নেই, অবচেতন মনের বাধ্যকরী প্রবর্তনায় মানুষ পরিচালিত হয়, তার চেতনার নিয়ন্তা অবচেতন মনই। অর্থাৎ প্রবৃত্তিবাদী মনোবিজ্ঞান এক ধরনের নিয়তিবাদেরই প্রচার করে। বিজ্ঞানের নামে প্রচারিত হলেও এর প্রকৃতি নিয়তিবাদের মতোই। ধর্মশাস্ত্র আর বিজ্ঞান এক নয়। ধর্মশাস্ত্রের মতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর মতোই চেতনাও ঈশ্বরের অভিপ্রায় অনুসারেই সৃষ্ট, ঈশ্বরের অভিপ্রায়েই চালিত। তবু ঈশ্বরকেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বলার পরও ধর্মশাস্ত্র মানুষের কর্মের স্বাধীনতাকেও অনেক পরিমাণে স্বীকার করে, 'যে নিজেকে সাহায্য করে ঈশ্বর তাকেই সাহায্য করেন' এমন কথা বলে মানুষের সচেতন ও স্বাধীন ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়। মানুষের ইচ্ছার যদি স্বাধীনতাই না থাকতো, সচেতন মন দিয়ে কিছুই যদি সে করতে না পারতো, তাহলে তো পাপ-পুণ্যের দায়-দায়িত্বও তার থাকতো না। প্রবৃত্তিবাদী মনোবিজ্ঞান কিন্তু এ ক্ষেত্রে ধর্মশাস্ত্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রবৃত্তিবাদী মনোবিজ্ঞানের প্রধান প্রবক্তা সিগমুন্ড ফ্রয়েড ধর্মশাস্ত্রের কঠোর সমালোচক, বস্তুবাদী বিজ্ঞানীর মতোই সার্বভৌম ঈশ্বরের অস্তিত্বে তিনি অবিশ্বাসী। অথচ তাঁর 'লিবিডো' তো ইহুদির ঈশ্বর জেহোভার চেয়েও নির্মম। এই লিবিডো পুরোপুরি সার্বভৌম, মানুষ এই লিবিডোর হাতের ক্রীড়নক মাত্র। লিবিডো, মৃত্যুরতি, অবচেতন মন, ইডিপাস কমপ্লেক্স এ ধরনের কিছু অতিকথা ও কল্পকথা নিয়ে ফ্রয়েডের প্রবৃত্তিবাদী মনোবিজ্ঞানের কারবার। এই প্রবৃত্তিবাদের কাছে চেতনার উদ্ভব ও বিবর্তনের কার্যকারণ সম্পর্কীয় কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্রই পাওয়া যায় না, তাই চেতনার বিজ্ঞান বলেও একে গ্রহণ করা যেতে পারে না। প্রবৃত্তিবাদী মনোবিজ্ঞানের অন্য ঘরানার ব্যাপারেও একই কথা খাটে। মানুষের চেতনার চালিকাশক্তিরূপে ফ্রয়েড যেখানে দেখেছেন লিবিডোর ক্রিয়া, এল্লার সেখানে দেখেছেন ক্ষমতা-স্পৃহাকে। ফ্রয়েড জোর দিয়েছেন ব্যক্তি-নিজ্ঞানের উপর, ইয়ুং নিয়ে এসেছেন সমষ্টি নিজ্ঞান (Collective unconscious) নামক

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice