ঝগড়া
সন্ধ্যার সময় কেশব গাঙ্গুলীর ভীষণ ঝগড়া হয়ে গেল দুই কন্যা ও স্ত্রীর সঙ্গে। কন্যা দুটিও মায়ের দিকে চিরকাল। এদের কাছ থেকে কখনো শ্রদ্ধা ভালোবাসা পাননি কেশব।
শুধু এনে দাও বাজার থেকে, এই আক্রা চাল মাথায় করে আনো দেড়কোশ দূরের বাজার থেকে। তেল আনো, নুন আনো, কাঠ আনো—এই শুধু ওদের মুখের বুলি। কখনো একটা ভালো কথা শুনেছেন ওদের মুখ থেকে?
ব্যাপারটা সেদিন দাঁড়াল এইরকম।
সন্ধ্যার আগে কেশব গাঙ্গুলী হাট করে আনলেন। তাঁর বয়েস বাহাত্তর বছর, চলতে আজকাল যেন পা কাঁপে—আগের মতো শক্তি নেই আর শরীরে। আড়াই টাকা করে চালের কাঠা। দু-কাঠা চাল কিনে, আর তা ছাড়া তরিতরকারি কিনে ভীষণ কর্দমময় পিছল পথে কোনোরকমে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়ে কেশব গাঙ্গুলী তো হাটের বোঝা বাড়ি নিয়ে এলেন।
স্ত্রী মুক্তকেশী বললে—দেখি কীরকম বাজার করলে? পটলগুলো এত ছোছাটো কেন? কত করে সের?
—দশ আনা।
—ও বাড়ির পন্টু এনেচে ন-আনা সের। তুমি বেশি দর দিয়ে নিয়ে এলে, তাও ছোটো পটল। ও কখনো দশ আনা সের না।
—বাঃ, আমি মিথ্যে বলছি?
—তুমি বড্ড সত্যবাদী যুধিষ্ঠির—তা আমার ভালো জানা আছে। আচ্ছা রও, ও পটল আমি ওজন করে দেখব।
—কেন আমার কথা বিশ্বাস হল না?
—না, তোমার কথা আমার বিশ্বাস তো হয়ই না—সত্যি কথা বলব তার আবার ঢাক-ঢাক গুড়গুড় কী?
এই হল সূত্রপাত। তারপর কেশব গাঙ্গুলী হাত-পা ধুয়ে রোজকার মতো বললেন—ও ময়না, চালভাজা নিয়ে আয়—
ময়না কথা বলে না, চালভাজার বাটিও আনে না। তাতে বুঝি কেশব বলেছিলেন—কৈ, কানে কী তুলো দিয়ে বসে আছ নাকি, ও ময়না?
ছোটো মেয়ে ময়না নীরস সুরে বললে—চাল ভাজিনি।
—কেন?
—রোজ রোজ চালভাজা খাওয়ার চাল জুটছে কোথা থেকে? তা ছাড়া আমার শরীরও ভালো ছিল না।
—কেন, তোর দিদি?
—দিদি সেলাই করছিল।
এটা খুবই স্বাভাবিক যে বাহাত্তর-তিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ কেশব গাঙ্গুলী দশ সের ভারী মোট বয়ে এনে মেয়েদের এ উদাসীনতায় বিরক্ত হবেন, বা প্রতিবাদে দু-কথা শোনাবেন। কিন্তু তার ফল দাঁড়াল খুবই খারাপ।
পাঁচজনের সামনে বলবার কথা নয়, বলতেও সংকোচ হয়। ছোটো মেয়ে ময়না তাঁকে একটা ভাঙা ছাতির বাঁট তুলে মারতে এল। মেজো মেয়ে লীলা বললে— তুমি মরো না কেন? মলে তো সংসারের আপদ চোকে—
স্ত্রী মুক্তকেশী বললে—অমন আপদ থাকলেও যা, না-থাকলেও তা কেশব গাঙ্গুলী রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বললেন, আমি তোদের ভাত আর খাব না—চললাম।
মুক্তকেশী ও ছোটো মেয়ে ময়না একসঙ্গে বলে উঠল—যাও না—যাও।
ময়না বললে—আর বাড়ি ঢুকো না। মনে থাকে যেন।
শুনে বিশ্বাস হবে না জানি, কিন্তু একেবারে নির্জলা সত্যি। আপন মেয়ে বুড়ো বাবাকে ছাতি তুলে মারতে যায়!
কেশব গাঙ্গুলী রাত্রে বাইরের ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপে শুয়ে রইলেন। কেউ এসে খেতে ডাকলে না—মাও না, মেয়েরাও না। সত্যিই কেউ ডাকতে আসবে না, এটা কেশব বুঝতে পারেননি, ধারণা করতে পারেননি। তাই ঘটে গেল অবশেষে। না খেয়ে সমস্ত রাত কাটল কেশব গাঙ্গুলীর—নিজের পৈতৃক ভিটেতে, স্ত্রী ও দুই কন্যা বর্তমানে। উঃ, এ কথা ভাবতে পারা যায়?
কেশব গাঙ্গুলী সত্যি কখনো ভাবেননি যে, এতটা তিনি হেনস্থার পাত্র তাঁর সংসারে। মেয়েরা বা স্ত্রী তাঁকে কেউ ভালোবাসে না, এ তিনি অনেকদিন থেকেই জানেন। কিন্তু তার বহর যে এতটা, তা তিনি ধারণা করবেন কীভাবে?
ক্ষুধায় ও মশার কামড়ের যন্ত্রণায় সারারাত কেটে গেল ছটফট করে। সকালে উঠে আগে কেশব নদী থেকে স্নান করে এসে সন্ধ্যাহ্নিক ও জপ করে নিয়ে প্রতিবেশী যদুনন্দন মজুমদারের বাড়ি চা খেতে গেলেন।
যদুনন্দন বললেন—কী কাকা, আজ এত সকালে কী মনে করে?
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments