বুধোর মায়ের মৃত্যু
বুধো মণ্ডলের মায়ের হাতে টাকা আছে সবাই বলে। বুধো মণ্ডলের অবস্থা ভালো, ধানের গোলা দু-তিনটে। এত বড়ো যে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ গেল গত বছর, কত লোক না-খেয়ে মারা গেল, বুধো মণ্ডলের গায়ে এতটুকু আঁচ লাগেনি। বরং ধানের গোলা থেকে অনেককে ধান কর্জ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
সবাই বলে, বুধোর টাকা বা ধান সবই ওই মায়ের। বুধোর নিজের কিছুই নেই। বুড়ির দাপটে বুধো মণ্ডলকে চুপ করে থাকতে হয়, যদিও তার বয়েস হল এই সাতচল্লিশ। ওর মার বয়স বাহাত্তর ছাড়িয়ে গিয়েছে। আমি কিন্তু অত্যন্ত বাল্যকাল থেকে ওকে যেমন দেখে এসেছি, এখনও (অনেককাল পরে দেশে এসে আবার বাস করছি কিনা) ঠিক তেমনি আছে। তবে মাথায় চুলগুলো যা পেকেছে।
অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ে। হরি রায়ের পাঠশালায় আমি তখন পড়ি। বিকেলবেলা, তেঁতুলগাছের ছায়া দীর্ঘতর হয়ে হরি রায়ের ক্ষুদ্র চালাঘরের সামনেকার সারা উঠোন ছেয়ে ফেলেছে। ছুটি হয়-হয়, নামতা পড়ানো শুরু হবে এখন। এমন সময় কালীপদ রায় আর চণ্ডীদাস মুখুজ্যে এসে হরি রায়ের সঙ্গে গল্প জুড়লেন। কালীপদ রায় গল্পের মধ্যে বুধোর মায়ের সম্বন্ধে এমন একটা উক্তি করে বসলেন যাতে আমি অবাক হয়ে প্রৌঢ় দাদুর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম।
চণ্ডী মুখুজ্যেমশায় জবাব দিলেন, আর বোলো না ও মাগির কথা, অনেক টাকা খুইয়েছি ও মাগির পেছনে।—জবাবটা আজও বেশ মনে আছে।
একটু বেশি পাকা ছিলাম বয়েসের তুলনায়, সুতরাং স্ত্রীলোকের পেছনে টাকা খরচ করার অর্থ আমি বুঝতে পারলাম। আর একটু বয়েস বাড়লে শুনেছিলাম, বুধোর মা গ্রামের অনেকেরই মাথা খারাপ করেছিল। বুধোর মা বালবিধবা; ওই ছেলেটিকে নিয়ে স্বামীর গোলার ধান দাদন দিয়ে কত কষ্টে সংসার নির্বাহ করেছে —এইরকমই শুনতাম। আমি যখনকার কথা বলছি তখন বুধোর মায়ের বয়েস চল্লিশের কম নয়, কিন্তু তখনও তার বেশ চেহারা। আটসাঁট গড়ন, মাথায় একঢাল কালো চুল। আমার বাবার বয়সি গ্রামসুদ্ধ লোকের প্রণয়িনী।
তার পর বহুবার বুধোর মাকে দেখেছি অনেক বছর ধরে। সেই এক চেহারা। এতটুকু টসকায়নি কোনোদিন।
দেশ ছেড়ে চলে গেলাম ম্যাট্রিক পাস করে। পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে চাকরি করে বোমার তাড়ায় সেবার আবার এসে গ্রামে ঘরবাড়ি সারিয়ে বাস করতে শুরু করলাম।
কাকে জিজ্ঞেস করলাম—বলি, সেই বুধোর মা বেঁচে আছে?
–খুব। কাল ঘাটে দেখলে না?
—না।
—আজ দেখো এখন। তার মাথার চুল পেকে গিয়েছে বলে চিনতে পারোনি।
দু-একদিনের মধ্যে বুধোর মাকে দেখলাম। চেহারা ঠিক তেমনিই আছে, যেমন দেখেছিলাম বাল্যে। মুখশ্রী বিশেষ বদলায়নি। শুধু মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছে-মাত্র। অনেকে হয়তো ভাববেন, সত্তর-বাহাত্তর বছর বয়সে মুখের চেহারা বদলায়নি এ কখনো সম্ভব? তাঁরা বুধোর মাকে দেখেননি। নিজের চোখে না দেখলে আমিও বিশ্বাস করতাম না। সেকালের বুধোর মার মাথায় যেন সাদা পরচুলো পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথম দেখবার দিন আমার এমনি মনে হল।
পরে কিন্তু বুঝলাম তা নয়, ওর বয়েস হয়েছে। একদিন আমার বাড়িতে বুড়ি লেবু দিতে এসেছিল। ওকে দেখে মনে হল, হায় রে কালীপদ দাদু, চণ্ডীদাস জ্যাঠার দল! আজও তোমরা বেঁচে থাকলে তোমাদের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিতে পারত বুধোর মা! কত পয়সাই একসময়ে তোমরা খরচ করে গিয়েছ ওর পেছনে। বললাম—এসো বুধোর মা, কী মনে করে? অনেকদিন পরে দেখলাম।
—আর বাবা! গাঁয়ে ঘরে থাক না, তা কি করে দেখবা? বাত হয়েছে বাবা। এখন একটু সামলেছি। তাই উঠে হেঁটে বেড়াচ্ছি।
—হাতে কী?
—গোটাকতক কাগজি লেবু। বলি, দিয়ে আসি যাই। তুমি আর আমার পঞ্চা দু-মাসের ছোটোবড়ো। তুমি হলে ভাদ্র মাসে, পঞ্চা হয়েছে আষাঢ় মাসে। তা আমায় ফেলে চলে গেল।
—পঞ্চা মারা গিয়েছে?
—হ্যাঁ বাবা, অনেক
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
পড়ার জন্য প্রতিদিন নতুন কিছু
বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর আর্কাইভ
পুরনোর সঙ্গে থাকছে নতুন লেখাও
যোগাযোগ করতে
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক। তিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। পথের পাঁচালী ও অপরাজিত তাঁর সবচেয়ে বেশি পরিচিত উপন্যাস। অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আরণ্যক, চাঁদের পাহাড়,আদর্শ হিন্দু হোটেল, ইছামতী ও অশনি সংকেত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপন্যাসের পাশাপাশি বিভূতিভূষণ প্রায় ২০টি গল্পগ্রন্থ, কয়েকটি কিশোরপাঠ্য উপন্যাস ও
আরও দেখুন...-
বাংলাদেশ ছিল নদীমাতৃক। নদী ছিল বাংলার জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আজ যে-টুকু বাংলা আমাদের, সে বাংলা তেমন নদীবহুল নয়। যে-অংশ নদীবহুল এবং নদীর খেয়ালখুশীর সঙ্গে যে অংশের মানুষের জীবনযাত্রা একসূত্রে বাঁধা সে অংশ আজ আমাদের কাছে বিদেশ। অদৃষ্টের এ পরিহাস রবীন্দ্রনাথের কাছে ভয়ানক দুঃখের কারণ হত।
প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্ট করেছিল। সেদিক থেকে তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থের সগোত্র ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির বিভিন্ন প্রকাশের মধ্যে নদী কবিকে বোধহয় সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ ক’রেছিল। তাই কবি নদীর কাছে সময়ে অসময়ে ছুটে গেছেন। তাই তিনি নদীর বুকে নৌকাতে ভাসতে এত ভালবাসতেন। নদীর তরুণীসুলভ চাপল্য এবং গতি কবির চিরতরুণমনে গভীর দাগ কেটেছিল। তাছাড়া সংসারের কোলাহল থেকে মুক্তি
-
তপুকে আবার ফিরে পাব, এ কথা ভুলেও ভাবিনি কোনোদিন। তবু সে আবার ফিরে এসেছে আমাদের মাঝে। ভাবতে অবাক লাগে, চারবছর আগে যাকে হাইকোর্টের মোড়ে শেষবারের মতো দেখেছিলাম, যাকে জীবনে আর দেখব বলে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি- সেই তপু ফিরে এসেছে। ও ফিরে আসার পর থেকে আমরা সবাই যেন কেমন একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। রাতে ভালো ঘুম হয় না। যদিও একটু-আধটু তন্দ্রা আসে, তবু অন্ধকারে হঠাৎ ওর দিকে চোখ পড়লে গা হাত পা শিউরে ওঠে। ভয়ে জড়সড় হয়ে যাই। লেপের নিচে দেহটা ঠক্ ঠক্ করে কাঁপে।
দিনের বেলা অনেকেই আমরা ছোটখাটো জটলা পাকাই।
দিনের বেলা ওকে ঘিরে দেখতে আসে ওকে। অবাক হয়ে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.
Featured News
Advertisement
[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]
-
মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে 'যাত্রা' উপন্যাসটি লিখেছেন—
-
ক. শওকত ওসমানখ. শহিদুল জহিরগ. শওকত আলীঘ. সেলিনা হোসেনLogin
Please login first to Answer.
-
welcome
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
-
Thank you
- by bappi
- ১৫ Jan ২০২৬
-
good
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
Comments