সুহাসিনী মাসিমা
সুহাসিনী মাসিমাকে আমি দেখিনি। কিন্তু খুব ছোটো বয়সে যখনই মামারবাড়ি যেতুম, তখন সকলের মুখে মুখে থাকত সুহাসিনী মাসিমার নাম।
—সুহাস কী চমৎকার বোনে! এই বয়েসে কী সুন্দর বুনুনির হাত!
—সুহাসিনী বললে, এসো দিদি বসো। বেশ মেয়ে সুহাসিনী।
—সেবার সুহাসিনীকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ালুম পূর্ণিমার দিন।
—সুহাসিনী ওসব অন্যায্য দেখতে পারে না, তাই জন্যে তো মায়ের সঙ্গে বনে না।
সুহাসিনী গ্রামের সকলের যেন চোখের মণি। সুহাসিনী মাসিমা সম্বন্ধে কথা বলবার সময় সবারই অর্থাৎ আমার বুড়ি দিদিমার, গনু দিদিমার, মাসিমাদের, মায়ের, মামাদের গলার সুর বদলে যেত, চোখে কীরকম একটা আলাদা ভাব দেখা যেত। আর একটা কথা, রূপের কথা উঠলে সকলেই বলত আগে সুহাসিনী মাসিমার কথা, অমন রূপ কারও হয় না, কেউ কখনও দেখেনি।
শুনে শুনে আমার মনে অত্যন্ত কৌতূহল হল যে, সুহাসিনী মাসিমাকে একবার দেখব। দেখতেই হবে।
দিদিমাকে একদিন বললুম, সুহাসিনী মাসিমা এখানে কোথায় থাকেন?
—কেন রে?
—আমি একদিন দেখতে যাব।
—সে তোর ওই কানাই মামার বোন ওপাড়ার। মুখুজ্যেদের দোতলা বাড়ি পুকুরধারে দেখিসনি? তা সুহাস তো এখন এখানে নেই। শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে।
—বিয়ে হয়ে গিয়েছে বুঝি?
—তা হবে না? উনিশ-কুড়ি বছর বয়েস হল, বিয়ে কোন কালে হয়েছে! সুহাসিনী মাসিমার বিয়ে হওয়ার কথাটা যেন খুব ভালো লাগল না। কেন ভালো লাগল না তা কী করে বলব? আমার বয়স ন-বছর আর সুহাসিনী মাসিমার বয়স উনিশ-কুড়ি; বিয়ে হলেই বা আমার কি, না-হলেই বা আমার কী।
মামারবাড়িতে প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ছুটিতে যাই, কিন্তু কোনও বার সুহাসিনী মাসিমার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। হয় তিনি বৈশাখের মাঝামাঝি চলে গিয়েছেন, নয়তো তিনি আসবেন শ্রাবণ মাসে শ্বশুরবাড়ি থেকে।
—ফাল্গুন মাসে এসেছিল সুহাস, বোশেখ মাসে চলে গেল। আজকাল থাকে ভালো জায়গায়। যেমন রং তেমনিই রূপ, যেন একেবারে ফেটে পড়ছে।
অন্য লোকের প্রশ্নের উত্তরে দিদিমা কিংবা আমার মাসিমারা এ ধরনের কথা বলতেন, শুনতে পেতাম। আমি কোনও প্রশ্ন এ সম্বন্ধে বড়ো একটা করতুম না, অথচ ইচ্ছে হত সুহাস মাসিমার সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু জানবার, আরও অনেক কথা শোনবার। কিন্তু কেমন যেন লজ্জায় গলায় কথা আটকে যেত, জিগ্যেস করতে পারতুম না।
—না, তা কী করে থাকবে, সুহাসিনী না-হলে শ্বশুরবাড়ির একদিন চলে না— কাজেই চলে যেতেই হল, নইলে জষ্টি মাসে আম-কাঁটাল খেয়ে যাবার তো ইচ্ছে ছিল। শাশুড়ি বলে-বউমা এখানে না-থাকলে যেন হাত-পা আসে না—বউমার মুখ সকালে উঠে না-দেখলে কাজে মন বসাতে পারিনে।—তাই ছেলে পাঠিয়ে নিয়ে গেল।
—একদিন কী হল জানো, দুপুরবেলা সুহাসের ফিট হয়েছে শুনে তো ছুটে গিয়ে দেখি রান্নাঘরের সামনে সানের রোয়াকে সুহাস অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে— আর তার মাথায় জল ঢালা হচ্ছে। মাথায় একরাশ কালো কুচকুচে ভিজে চুল, দেহ এলিয়ে পড়ে আছে। অমন রূপ কখনও দেখিনি মানুষের, কী রূপ ফুটেছে সুহাসের—সত্যি—
সুহাস মাসিমার রূপের ও গুণের প্রশংসায় এই গ্রামের সবাই পঞ্চমুখ। তারা জীবনে যেন এমন মেয়ে আর দেখেনি। ওদের মুখে মুখে সুহাসিনী মাসিমাও আমার মনে অত্যন্ত বেড়েই চললেন—কল্পনায়, চোখের দেখায় নয়।
অল্পবয়সে যখন মনের আকাশ একেবারে শূন্য, তখন লোকের মুখে শুনে শুনে ধীরে ধীরে একটি আদর্শ নারীমূর্তি আমার মনে গড়ে উঠেছিল—বহুকাল পর্যন্ত এই মানসী নারীপ্রতিমার কষ্টিপাথরে বাস্তবজীবনে দৃষ্ট সমস্ত নারীর রূপ ও গুণ যাচাই করে নিতাম, অনেকটা নিজের অজ্ঞাতসারেই বোধ হয়। সে মানসী প্রতিমা ও আদর্শ নারী ছিলেন সুহাসিনী মাসিমা—যাঁকে কখনও চোখে দেখলুম না।
তখন কলেজে পড়ি। কী একটা ছুটিতে মামারবাড়ি গিয়েছি। তখন অনেকটা গম্ভীর হয়ে পড়েছি আগেকার চেয়ে এবং রান্নাঘরের কোণে বসে দিদিমা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments