ডক্টর জনসন
ডক্টর জনসন-এর নাম জানেন না এমন শিক্ষিত ব্যক্তি বোধহয় আমাদের দেশেও বিরল। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংল্যাণ্ডের তিনি ছিলেন একজন দিকপাল পণ্ডিত, একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশিষ্ট চিন্তানায়ক। যেমন অসাধারণ ছিল তাঁর মেধা ও বুদ্ধি, তেমনি অসাধারণ ছিল তাঁর অধ্যবসায়। অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে থেকেও দীর্ঘ আট বৎসর অক্লান্ত পরিশ্রম করে শুধুমাত্র একক চেষ্টাতেই তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ—‘ডিকশনারি অব দি ইংলিশ ল্যাংগোয়েজ’ রচনা সমাপ্ত করেন। এটা কম বিস্ময়ের কথা নয়।
১৭০৯ খ্রীস্টাব্দের ১৮ই সেপ্টেম্বর স্যামুয়েল জনসন-এর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন একজন দরিদ্র পুস্তক-বিক্রেতা। তার ফলে ছেলেবেলা থেকেই জনসন-এর পড়াশোনার নেশা। তাঁর মেধাও ছিল বিস্ময়কর। তিনি একবার যা পড়তেন তা আর ভুলতেন না। শৈশব হতেই তাঁর অদ্ভুত মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। বাল্যকালে তাঁকে যে শিক্ষয়িত্রী পড়াতেন তিনি বলতেন এরকম মেধাবী ছেলে তিনি তাঁর জীবনে আর কখনও দেখেন নি। পরবর্তীকালে স্কুলে একদা একটি ল্যাটিন কবিতা একবার মাত্র পড়েই মুখস্থ আবৃত্তি করে তিনি তাঁর শিক্ষকদের একেবারে অবাক করে দেন। জনৈক শিক্ষক সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি যা পড়ো তা কি কখনো ভোলো না?’—তিনিও বিস্মিত ভাবে উত্তর দেন, ‘তা কি কেউ ভুলতে পারে।’—অর্থাৎ তাঁর তখন ধারণা সকলেই তাঁর মত। কেউ-ই একবার পড়ে তা আর ভোলে না।
কিন্তু এমনি বিস্ময়কর মেধার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও জনসন ছাত্র-জীবনে অক্সফোর্ড হতে ডিগ্রিলাভ করতে পারেন নি। অর্থের অভাবে তিনি তাঁর শিক্ষাই সমাপ্ত করতে পারলেন না। দারুণ অর্থাভাবের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন তিনি। মাত্র আড়াই পেনি নিয়ে তিনি নাকি প্রথম লণ্ডনে আসেন। অবশ্য এই প্রথম আগমন সম্পূর্ণ-ই নিষ্ফল হয়। তবে পরে তিনি তাঁর বুদ্ধি, পাণ্ডিত্য ও বিশেষ বাবৈদগ্ধের বলে ধীরে ধীরে লণ্ডনকে সম্পূর্ণ জয় করে ফেলেন এবং এক সময় লণ্ডনের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একেবারে মধ্যমণি হয়ে ওঠেন।
১৭৫৫ খ্রীস্টাব্দে তাঁর অভিধান প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সারা ইংল্যাণ্ডের বিদ্বজ্জন মহলে সাড়া পড়ে যায়। অভিধান প্রকাশের কিছু পূর্বেই অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি তাঁকে এমএ ডিগ্রি প্রদান করেন। পরে ডাবলিন ইউনিভার্সিটি তাঁকে এলএলডি উপাধি দেন। অবশেষে ১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি তাঁকে আবার ডিসিএল অর্থাৎ ডক্টর অব সিভিল ল উপাধি প্রদান করে বিশেষভাবে সম্মানিত করেন। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টও তাঁকে বার্ষিক তিনশ পাউণ্ড বৃত্তিদানের ব্যবস্থা করে যথেষ্ট সুবিবেচনার পরিচয় দেন। অবশ্য তীব্র আত্মসম্মান-বোধসম্পন্ন ডক্টর জনসন প্রথমে এই সরকারী বৃত্তি গ্রহণে ইচ্ছুক ছিলেন না; পরে তাঁর বিখ্যাত শিল্পীবন্ধু রেনল্ডস্-এর বিশেষ অনুরোধেই তিনি এই বৃত্তি গ্রহণে সম্মত হন।
শুধুমাত্র অভিধান প্রণয়ন নয়, ডক্টর জনসন কাব্য ও সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন। সেই কালের পরিপ্রেক্ষিতে তার সাহিত্যমূল্যও অনস্বীকার্য। পরবর্তীকালে কার্লাইল প্রমুখ চিন্তানায়কেরা যেমন তাঁর অভিধানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন, তেমনি বায়রন-এর মত প্রতিভাবান কবিও তাঁর ‘দি ভ্যানিটি অব হিউম্যান উইশেস্’ কাব্যের বিশেষ প্রশংসা করেন। তাঁর শেষ বয়সের লেখা ‘লাইভস্ অব দি পোয়েটস্’-ও সে-সময় যথেষ্ট সমাদর লাভ করে। বলা বাহুল্য ডক্টর জনসন সম্পর্কে অনেক কথাই বলবার ও জানবার আছে। সে-সব কথা এই স্বল্পায়তন প্রবন্ধে লেখা সম্ভবও নয় এবং তা লেখা আমার উদ্দেশ্যও নয়। আমি শুধু এখানে তাঁর প্রেম বা প্রেম-জীবন সম্বন্ধে সামান্য কিছু লিখবো!
ডক্টর জনসন কোনো দিক থেকেই সাধারণ ছিলেন না। তাঁর অসাধারণ মেধা ও পাণ্ডিত্যের মত তাঁর প্রেমও বোধহয় ছিল অসাধারণ। সাধারণ মানুষ রূপ ও যৌবনের প্রতি স্বভাবতই আকৃষ্ট,—রূপ ও যৌবনের জন্য প্রতিনিয়তই পাগল। কিন্তু ডক্টর জনসন কোনো দিনই রূপ-যৌবনের জন্য উন্মাদ হন নি। ভালোবেসে তিনি যাঁকে বিয়ে করেন সেই ভদ্রমহিলা ছিলেন বয়সে তাঁর চেয়ে কুড়ি বছরের বড়। দেখতেও তিনি মোটেই সুশ্রী ছিলেন না।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments