রুশী আদম পুশকিন
পুশকিন ছিলেন রাশিয়ার বসন্ত, পুশকিন ছিলেন রাশিয়ার সকাল, পুশকিন ছিলেন রূশী আদম। দান্তে এবং পেত্রার্ক ইতালীর জন্যে যা করেছিলেন, সতেরো শতকে সাহিত্যের অতিকায় বরপুত্রগণ ফ্রান্সের জন্যে যা করেছিলেন, এবং জার্মানদের জন্যে যা করেছিলেন লেসিং, শিলার আর গ্যাটে, পুশকিন তা-ই করেছিলেন আমাদের জন্যে।' এই উত্তি আবেগতাড়িত কোনো তরুণ কবির নয়, বৃদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিনিষ্ঠ, বিদগ্ধ রুশ সাহিত্যসমালোচক আনাতিল ল,নাচারিস্কির। অসম্ভব কোনো রুশীর পক্ষে পুশকিন বিষয়ে বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত না হওয়া। আমরা যারা বাঙালি তাদের পক্ষেও কি সম্ভব রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আবেগরহিত কোনো উত্তি করা? যে-কোনো শিক্ষিত রূশীর সত্তার অন্তর্গত আলেক-জান্দর পুশকিন। রাশিয়ার জাতীয় কবি তিনি; রুশ ভাষার অন্য কোনো কবি তাঁর সমকক্ষ নন; তাঁর সাহিত্য ধারণ করেছে রুশ ভাষার সকল সম্পদ, শক্তি ও ব্যাপ্তি। পুশকিনের স্বভাষীদের মধ্যে অন্য কেউ পারেননি তাঁর মতো ভাষার সীমানাকে এতটা সম্প্রসারিত করতে, এর বহ ভঙ্গিম রূপটিকে ফাটিয়ে তুলতে, তুলে ধরতে এর সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে। রাশিয়ার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিসর্গ', সেই বিশাল দেশের আত্মা মহিমামণ্ডিত হয়ে উঠেছে তাঁর সাহিত্যে।
নিজের কাব্যের পক্ষে উপযোগী এক নতুন কাব্যভাষাকে জন্ম দিলেন প্রচুর শ্রম ও নিষ্ঠায় রুশ ভাষাকে গড়ে পিটে নিয়ে। তিনি সাধারণ মানুষের মুখের বলিকে অসামান্য দক্ষতায় কাজে লাগালেন। যে-ভাষা নিঃসতে হয়েছে তাঁর দাই-মা আরিনার মুখ থেকে, যে-ভাষা চাষী মজুরদের ভাষ্য, তাকে অবজ্ঞা না করে তিনি বরং দান করলেন অবিনাশী কাব্যমহিমা। তাই দেখি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত অভিজাত শব্দাবলীর পাশে পুশকিন নির্দ্বিধায় অন্ত্যজ শব্দাবলীকে উদার হস্তে একই পংক্তিভোজনে বসিয়ে দিয়েছেন। ফলে যে নতুন কাব্যভাষা তৈরী হলো তাতে শুধু পুশকিনের কাব্যপ্রতিভার স্বাতন্ত্র্যই প্রকাশ পেলো না, মাত্র আটত্রিশ বছরে ডয়েলে নিহত অভিজাত পুরুষ পেলেন রাশিয়ার মহত্তম কবির বরমাল্য। একাধিক বিদেশী ভাষায় কৃতবিদ্য ছিলেন পুশকিনা। ফরাসী, জার্মান, ইংরেজী ও ইতালীয় ভাষায় প্রচুর দখল থাকা সত্ত্বেও তিনি যে রাশিয়ায় সাধারণ মান যের মুখের বলিকে তাঁর কাব্যের পক্ষে অপরিহার্য মনে করলেন এতেই কবি হিশেবে তাঁর দূরদৃষ্টির পরিচয় মেলে। তাঁর কাব্যের গড়ন ছিলো চিরায়ত কাব্যানুসারী; তিনি সহজেই পারতেন শুধু জমকালো, প্রতিষ্ঠিত শব্দ নিয়ে কবিতা রচনা করতে, খ্যাতিও লাভ করতে পারতেন। কিন্তু তাহলে তিনি রাশিয়ার মহত্তম কবি বলে বন্দনীয় হতেন কিনা তাতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তাঁর কাব্যভাষায় থাকতো না ঈর্ষণীয় তাজগী, সজীবতা ও ব্যাপ্তি।
কেমন মানুষ ছিলেন আলেকজান্দর পুশকিন? অভিজাত পরিবারে জন্ম হয়েছিলো তাঁর, কিন্তু তাঁর রক্তে ছিলো কৃষ্ণ মহাদেশ আফ্রিকার ঢক্কা-নিনাদপ্রিয়, নৃত্যপর মানুষের দুলুনি। তাঁর পিতা সের্গেই লভোভিচ পুশকিনের মধ্যে বসবাস করতো দুজন মানুষ—একজন বনেদী, বিদ্যোৎসাহী, কুশলী পদ্যকার, আচরণে রুচিবান ও মার্জিত এবং অন্যজন বেপরোয়া, বেহদ, খরগিলা, সংসারছট। পুশকিনের পিতামাতা দু’জনেরই জীবন ছিলো বেলাগাম। ফলে তাঁদের এই সন্তান, যিনি পরবর্তীকালে বিশ্বনন্দিত কবি হবেন, পিতা-মাতার স্নেহ ও আদর-যত। থেকে বঞ্চিত রইলেন। পুশকিনের শৈশব বড় সুখের সময় ছিলো না। দাই-মা, পরিচালক ও গভর্নেসের তত্ত্বাবধানে পুশকিনকে মানুষ হতে হয়েছে।
পুশকিন পিতামাতার দোষগুণে কমবেশি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকারসূত্রে। আগেই বলেছি, তাঁর রক্তে আফ্রিকার কালো মানুষদের নাচের উদ্দাম ঠমক ছিলো, ছিলো বন্য জীবনের দোলা। তাই তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হতো অস্থিরতা ও চঞ্চলতা। পিতার মতো তিনিও ছিলেন বেপরোয়া ও বেহিসেবী। সারাজীবন মশালের মতো জ্বলেছেন তিনি এবং এক ফজল দ্বৈরথে অকালে আত্মাহুতি দিলেন। এ ধরনের মানুষ কখনো সংসার গোছাতে পারে না, পারে না বিবাহযোগ্য হয়ে উঠতে। তবু তিনি সংসার পেতেছিলেন, নিজে রূপবান না হওয়া সত্ত্বেও রাজধানীর সুন্দরীতমা নাতালিয়া গাঞ্চারোভার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, যদিও তিনি নিজে ছিলেন বাধাবন্ধনহীন। এমন মানুষের কি বিয়ে করা সাজে? পরিণামে যা হবার তাই হলো। নাতালিয়া বুদ্ধিমতী ছিলেন না;
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments