আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধুরা
লেখক: অধ্যাপক অজয় রায়
আমাদের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই তিনি চলে গেলেন। ১৯৩৩ সালে ১ অক্টোবরে ঢাকা শহরের বকশীবাজার এলাকায় নবকুমার ইনস্টিটিউটের পাশে মাতামহ পূর্ণানন্দ গুপ্তের বাড়িতে প্রিয়দর্শনের জন্ম হয়। তার শিক্ষা প্রধানত ঢাকা শহরে পগোজ হাইস্কুল, জগন্নাথ কলেজ এবং সর্বশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি (১৯৫৪) নিয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তবে অবশ্য মাঝখানে কলকাতায় এসে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে দু'বছরের বিএসসি (Hons) ডিগ্রি নিয়ে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন।
তিনি কলকাতায় ১৯৫৪ সালে বঙ্গবাসী কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন এবং জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে ওই কলেজ থেকে অধ্যাপকরূপে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মান ও ভালোবাসা নিয়ে। ১৯৫৫ সালে জাতীয় সমর শিক্ষার্থী বাহিনীতে (National Cadet Corps-NCR) অফিসার হিসেবে কমিশনপ্রাপ্ত হন। এই বাহিনীতে থাকাকালীন সময়ে তিনি মেজর পদে উন্নীত হয়েছিলেন। ভারতে জরুরি অবস্থা (during National Emergency) অর্থাৎ ১৯৬৩-৬৮ সময় ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে সামরিক অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তিনি কলেজ থেকে লিয়েনে ছিলেন।
অধ্যাপনা ও গবেষণা জীবনের প্রথম থেকেই প্রিয়দর্শনের অসীম আগ্রহ ছিল গাছের অন্তর্গঠন (internal structure of plants) নিয়ে। এ বিষয়ে তার বেশ কয়েকটি উচ্চমানের গবেষণাপত্র দেশ-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদের তিনি এর ওপর 'উদ্ভিদ-অন্তর্গঠন' শীর্ষক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বই রচনা করেন, যা সংশ্লিষ্ট মহলে উচ্চপ্রশংসিত।
শুধু বাংলা ও ইংরেজি নয়, সংস্কৃত ভাষাতেও তার রয়েছে বেশ দক্ষতা। আর এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভারতীয় পুরাণ ও প্রাচীনশাস্ত্রে উল্লিখিত গাছ-গাছড়ার তথ্য সংগ্রহ, সংকলিত ও বিশ্লেষণ করে অসংখ্য গবেষণামূলক নিবন্ধ ও বেশ কয়েকটি পুস্তক প্রকাশ করেছেন। এই ক্ষেত্রে চমৎকার অবদান রাখার জন্য অধ্যাপক সেন শর্মাকে দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীরা ও অ্যাসোসিয়েশন ফর প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনমি (Association for Plant Taxonomy) স্বাগত ও ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ২০০০ সালে এই সমিতি এবং ইন্ডিয়ান একাডেমি ফর সোস্যাল সায়েন্স (Indian Academy for Social Sciences) যথাক্রমে সেন শর্মাকে 'জ্ঞানচন্দ্র স্মারক পদ'কে এবং 'রৌপ্য জয়ন্তী স্মারক পুরস্কারে' ভূষিত ও সম্মান জানায়।
অধ্যাপক সেন শর্মার গবেষণার আর একটি ক্ষেত্র হলো ভারতের সামরিক ইতিহাস যা প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় দু'দশক ধরে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এই ক্ষেত্রে বিচরণ করছেন দৃপ্তপদভারে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক বিদ্যার জগতে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছেন। তিনি সামরিক বিদ্যার ও কৌশলের ওপর সাতটি বিশ্লেষণমূলক এবং প্রতিরক্ষা বিদ্যার ছাত্রদের উপযোগী ছয়টি পুস্তক প্রণয়ন করেছেন। এর মধ্যে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের রণকৌশল ও ব্যুহ রচনার ওপর এবং বাংলার বাপরো ভূইয়াদের যুদ্ধকৌশল ও রণনীতির ওপর বিশ্লেষাত্মক পুস্তক দুটি সমরবিদ ও সুধীজনের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তার সামরিক পুস্তকগুলো ভারতের মিলিটারি একাডেমিতে পাঠ্যপুস্তক ও রেফারেন্স বই হিসেবে পঠিত হয়। তার এই অসামান্য কাজের স্বীকৃতি জানিয়ে ১৮৯০ সালে রাজস্থানের উদয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত 'পঞ্চম ভারতীয় সমাজবিজ্ঞান কংগ্রেস' প্রতিরক্ষা বিষয়ক সেমিনারে সভাপতিত্বের সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
জ্ঞান ও শিক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ এই নিরহঙ্কার মানুষটি অবসর জীবনে এখনও লিখে চলেছেন অব্যাহত গতিতে, বয়স তার কলমকে থামাতে পারেনি।
কিন্তু এটিই প্রয়াত অধ্যাপক সেন শর্মার শেষ পরিচয় নয়। তার ছিল এক মানবতাবাদী চমৎকার মন দেশপ্রেমের পাশাপাশি।
সবারই জানা যে, পূর্ববাংলার বাঙালিদের আত্মপ্রত্যয়ের দাবিকে নস্যাৎ করার জন্য সে সময়কার পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া ২৫ মার্চের কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর শুরু করে ৯ মাসব্যাপী গণহত্যা, যাতে নিহত হয় ৩০ লাখ সাধারণ মানুষ। আর ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে। এরই প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments