প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে তিনটি আত্মবিবরণী

পুরানো বাংলা কাব্যে আত্মপরিচয় দেওয়ার একটা রেওয়াজ ছিল। কাব্যের উৎপত্তির কারণ বা দেব-দেবীর আশীর্বাদ উপলক্ষেই এই অংশগুলি রচিত হতো—তাই এগুলিকে আত্মবিবরণী ছাড়া বেশী কিছু বলা যায় না। সব কবিই যে আত্মবিবরণী দিয়েছেন তা নয়। যাওবা দিয়েছেন তাও অনেকটাই অসম্পূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় যেখানে কাব্য লেখা হয়েছে সেখানে রাজা ও দরবার কিছু অংশ জুড়ে বসে। এই আত্মপরিচয়গুলির মধ্যে সমাজের দুঃখ দুর্দশার প্রতিফলন চোখে পড়ে। এগুলোকে বাংলা আত্মজীবনীর প্রথম ক্ষীণ সূত্র বলে মনে করা ভুল হবে না, যদিও এই আত্মবিবরণগুলি কাব্যের বিরাট দেহের অংশ বিশেষ। তবে এও ঠিক যে পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী যারা লিখেছেন তাঁরা কেউ-ই এই কাব্যাংশগুলির দ্বারা উৎসাহিত হননি। ইংরাজী শিক্ষার সংস্পর্শে আমাদের দৃষ্টি সাহিত্যের এই অনাদৃত অংশটির উপরে আকৃষ্ট হয়েছে একথা মনে করলে ভুল হবে না। প্রাচীন কবিরা তাঁদের আত্মবিবরণীর যে পৃথক কোন মূল্য আছে মনে করতেন তাও মনে হয় না।

এখানে বাংলার তিনজন প্রাচীন কবির আত্মপরিচয় অংশ অতি সংক্ষেপে আলোচনা কর্চ্ছি। কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয়ের পাঠ বিভিন্ন পুথিতে বিভিন্ন রকম আছে। কবি নিজের সম্বন্ধে কিছু কিছু খবর দিয়েছেন। ভাষা কবিত্বমণ্ডিত সে কথা বলাই বাহুল্য, তিন চার শতাব্দী এই ভাষাই মানুষকে মুগ্ধ করেছে। অবশ্য অনেকাংশ প্রক্ষিপ্ত বলে সমালোচকেরা সন্দেহ করেছেন। এই আত্মবিবরণে পাওয়া যাচ্ছে—প্রপিতামহ নাবসিংহ ওঝা ‘বেদানুজ মহারাজে’র সভাসদ ছিলেন। তিনি গঙ্গাতীরে ফুলিয়ায় বাস করতে সুরু করেন, সেই ফুলিয়া সম্বন্ধে কবি বলছেন—

“গ্রামরত্ন ফুলিয়া যে জগতে বাখানি

দক্ষিণ পশ্চিমে বহে গঙ্গা তরঙ্গিণী।”

নাবসিংহেব পুত্র গর্ভেশ্বর। তাঁর পুত্র মুরারিই কৃত্তিবাসের পিতা।

মা ভাই বোনদের সম্বন্ধে কবি বলছেন—

“মাতা পতিব্রতার যশ জগতে বাখানি

ছয় সহোদর হইল এক যে ভগিনী।”

পূর্ববাংলা থেকে শিক্ষালাভ করে ঘরে ফিরলেন কৃত্তিবাস—

“সবস্বতী অধিষ্ঠান আমার কলেবর

নানা ছন্দে নানা ভাষ বিদ্যার প্রসব।

আকাশবাণী হইল সাক্ষাৎ সবস্বতী

তাঁহার প্রসাদে কণ্ঠে বৈসেন ভাবথি।”

গৌড়েশ্বরের দরবারের যে বর্ণনা আমরা পাই তা কবিত্বপূর্ণ। রাজার সামনে গিয়ে শ্লোক পড়লেন, তার বর্ণনাটি সুন্দর—

“পঞ্চদেব অধিষ্ঠান আমার শরীরে

সরস্বতী প্রসাদে আমার মুখে শ্লোক সরে।

নানা ছন্দে শ্লোক আমি পড়িনু সভায়

শ্লোক শুনি গৌড়েশ্বর আমা পানে চায়।

নানা মতে নানা শ্লোক পড়িলাম রসাল

খুসি হৈয়া মহারাজা দিল পুষ্পমাল।”

রাজা দান করতে চান, কিন্তু কৃত্তিবাস কবিযশঃপ্রার্থী। তিনি বলেন—

“ধন আজ্ঞা কৈলে রাজা ধন নাঞি লই

যথা যথা যাই আমি গৌরব সে চাহী।

যত যত মহাপণ্ডিত আছয়ে সংসারে।

আমার কবিতা কেহ নিন্দিতে না পারে।”

বাংলা সাহিত্যের সেই আদিযুগে উপরোক্ত অংশগুলির সৃষ্টি যে কবির উচ্চস্তরের কবিত্বশক্তির পরিচায়ক সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। অবশ্য উপরোক্ত পাঠ ছাড়া অন্যান্য পুথিতে অন্য পাঠও আছে। শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে’, নগেন বসু ও দীনেশ সেন মহাশয়—উক্ত হারাধন দত্তের পুথি ও নলিনীকান্ত ভট্টশালী ব্যবহৃত পুথির যে মিলিতপাঠ দিয়েছেন তা থেকেই এ অংশগুলি গ্রহণ করা হয়েছে।

কৃত্তিবাসের সময়কাল আজও সঠিক নির্ধারিত হয়নি। তাঁর গৌড়েশ্বর যে কে—সে তর্কও অমীমাংসিত। পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে ষোড়শ শতাব্দী শেষার্ধ পর্যন্ত তাঁর কালের হিসাব আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি। তাঁর আত্মবিবরণী অসম্পূর্ণ হলেও কবির পরিচয় কিছু কিছু বহন করে। তাঁর লেখায় মুকুন্দরামের মতো সমাজ জীবন্ত হয়ে ওঠেনি। রূপরামের মত নিজের জীবনে তাঁর কোন নাটকীয় উপাদান ছিল না। জন্ম, পিতা-মাতার পরিচয় ইত্যাদির পর শিক্ষার প্রসঙ্গ অল্প স্পর্শ করেই দরবারের কথায় এসে পড়েছেন। রাজার প্রসন্নদৃষ্টি-লাভ কবির কাম্য ছিল। কিন্তু রাজবন্দনা রয়েছে অথচ রাজার নাম নেই, এতেই সন্দেহ ঘনীভূত হয় যে রচনা সর্বাংশে অকৃত্রিম কিনা।

মুকুন্দরাম মধ্যযুগের বাঙ্গালী কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম একথা নিয়ে আজ আর বোধ

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice