যুদ্ধের ছায়া-রণক্ষেত্র
লেখক: ড. আশফাক হোসেন, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মুক্তিযুদ্ধকালে স্নায়ুযুদ্ধে বিশ্ব ছিল বিভাজিত। এই বিভাজনের দুই পাশে পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র ও সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল দুই বিপরীত আকাঙ্ক্ষাও শক্তির প্রতিভূ। আর স্বতন্ত্র অভিলাষ নিয়ে কিছুটা পাশে ছিল চীন। মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এই তিন যুযুধান শক্তির টানাপোড়েনে ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ উত্তাল হয়ে পড়ে। তৎকালীন বিশ্বপটে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির ওপর তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত তীব্র।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালিদের একটি জনযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার জন্য এক পরিপূর্ণ সংগ্রাম। দ্রুতগতিতে বিষয়টি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংকট থেকে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে রূপান্তরিত হয়। বস্তুত, ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থার কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রেও ছিল বাংলাদেশ এবং ডিসেম্বরে নিরাপত্তা ও সাধারণ পরিষদে আলোচনা-বিতর্ক, প্রস্তাব পাস, সর্বোপরি স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রদান ইত্যাদি চিত্তাকর্ষক ঘটনাবলিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল জাতিসংঘের রণাঙ্গন। অর্থাৎ, জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রশ্নে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দিকটি বিশ্লেষণ করলে মুক্তিযুদ্ধের গভীরতা ও বহুমাত্রিকতার দিকটি অনুধাবন করা যায়। সাধারণভাবে দেখা যাবে যে বৃহৎ-ক্ষুদ্রনির্বিশেষে প্রতিটি রাষ্ট্র জাতিসংঘে 'ভূরাজনীতি' ও তাদের 'জাতীয় স্বার্থ' অনুযায়ী ভূমিকা পালন করেছে, তবে এর ভেতরেও ছিল নানামুখী দ্বন্দ্ব ও ভিন্নমত। আবার মানব জাতির সর্ববৃহৎ ফোরাম হিসেবে জাতিসংঘ নিজেও বাংলাদেশ সংকটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুটো পর্যায়ে এই ভূমিকা প্রতিফলিত হয়। প্রথমত, ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাঙালি শরণার্থীদের ভরণপোষণ ও দুর্ভিক্ষ রোধে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা; দ্বিতীয়ত, ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ বন্ধ ও রাজনৈতিক প্রশ্নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ।
জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট ১৯৭১-এর মার্চের দিকে ঢাকা থেকে জাতিসংঘের কর্মীদের প্রত্যাহার করে নিলেও গণহত্যা বন্ধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। তবে ১ এপ্রিল সাংবাদিকদের চাপের মুখে মহাসচিবের এক মুখপাত্র উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে মানুষের যে মৃত্যু হয়েছে সে বিষয়ে উ থান্ট অবশ্যই অবগত আছেন। ১২ মে উ থান্ট প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে লেখা এক পত্রে লেখেন যে ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর ঢাকা থেকে জাতিসংঘের যেসব কর্মকর্তা ফেরত এসেছেন তাঁদের মাধ্যমে ও অন্যান্য সূত্র থেকে তিনি এক নেতিবাচক পরিস্থিতির আঁচ পেয়েছেন। তিনি ইয়াহিয়াকে জানান যে পাকিস্তানের সম্মতি পেলে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থাগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, ভারত সরকারও জাতিসংঘে পূর্ব বাংলা থেকে আগত শরণার্থীদের সাহায্যের আবেদন জানায়। জুলাই মাসের শুরুতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রধান ইরানি নাগরিক প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান ঢাকা সফর শেষে দিল্লিতে যান। যেখানে তিনি সংবাদ সম্মেলনে জানান যে পূর্ব বাংলায় যতক্ষণ ভয়ের কারণসমূহ বিদ্যমান থাকবে, ততক্ষণ শরণার্থীরা ভারত থেকে ফেরত যাবে না। ৫ মে জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রিন্স আগা খান শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় ভারত ও মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেন। ১৯৭১-এর ২৮ জুলাই জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি জন আর কেলি ঢাকায় আসেন।
২ আগস্ট জাতিসংঘ গঠন করে ইউনিপোরও বা ইউনাইটেড নেশনস ইস্ট পাকিস্তান রিলিফ অপারেশন। বলা হয়, এই মিশন মানবিক বিপর্যয় রোধে কাজ করবে, শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করবে না। ২৩ আগস্ট ফ্রান্সের পররাষ্ট্র বিভাগের কর্মকর্তা পল মার্ক হেনরিকে এর প্রধান করা হয়। ৩ নভেম্বর পল মার্ক হেনরি ঢাকায় পৌঁছে রিলিফ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। তবে জাতিসংঘের প্রেরিত ত্রাণসামগ্রী পূর্ব বাংলার দুর্গত মানুষের কমই কাজে এসেছে, বরং অনেক সময় জাতিসংঘের যানবাহন পাকিস্তানি সেনারা দখলে নিয়ে যেত। এ জন্য ৫ মে ১৯৭১ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক বেতার ভাষণে পূর্ব বাংলায় জাতিসংঘের ত্রাণসামগ্রী লুণ্ঠনের জন্য পাকিস্তান সরকারকে অভিযুক্ত করেন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে জাতিসংঘ ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাঙালি শরণার্থীদের সাহায্যে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং জাতিসংঘ সৃষ্টির পর এটি ছিল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments