মুনীর চৌধুরীর রাজনৈতিক বিপ্লবী সত্তা

সাহিত্য আর প্রগতিশীল রাজনৈতিক কাজ যে পরস্পরের পরম মিত্র হতে পারে সে কথা মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম দিনগুলিতে একটা প্রমাণ নিয়ে সামনে এসেছিল। ১৯৪২ সালে ঢাকায় ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনে যোগ দেয়ার পথে তরুণ গল্প লেখক সোমেন চন্দ যখন আততায়ীর হাতে নিহত হয়, তখন সেই রক্তাক্ত মৃত্যুকে সামনে নিয়ে বাংলা সাহিত্য আর রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সাক্ষাৎকার ঘটেছিল। পরের বছর প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ কর্তৃক আয়োজিত সোমেন স্মৃতি সভায় যোগ দিয়েছিলেন মুনীর চৌধুরী, উদীয়মান গল্প লেখক। তখনও তিনি ছাত্র। তবে আসল যোগটা ঘটলো প্রগতিশীল সাহিত্য আর মার্কসীয় রাজনীতির মধ্যে।

মুনীর চৌধুরী গুছিয়ে বক্তব্য বলতে অল্প বয়সেই পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। যুক্তিবাদী হিসেবে ধর্মীয় গোঁড়ামিকেই আঘাত করতেন প্রধানত। কবিতা তিনি কদাচিৎ লিখতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল গদ্যে। ভলটেয়ারের ধাঁচ ছিল তার মধ্যে।

আমাদের সঙ্গে বাস্তব রাজনীতির ক্ষেত্রে সম্পর্কের সূত্রটি স্থাপিত হয়েছিল তাঁর এই ধর্মীয় গোঁড়ামী-বিরোধী মুখরতার দরুণ ৷

তখন সেই যুগ চলছে যার কবি সুকান্ত। যুদ্ধ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর বিভেদকে অতিক্রম করার নিশানা লাল নিশান। তবে ঢাকায় আমরা যে সবচেয়ে বড় সমস্যাটার সম্মুখীন হয়েছিলাম সেটা ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সুতরাং আমাদের লাল নিশানের রাজনীতি ছিল এই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের রাজনীতি। আর মুনীর চৌধুরী এই সংগ্রামের রাজনীতিতে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে শরীক হয়েছিলেন তাঁর তীব্র আক্রমণাত্মক অসাম্প্রদায়িকতার প্রবণতা নিয়ে। মুনীর চৌধুরীর ‘মানুষ’ নাটকের নায়ক তিনি নিজেই। এই নাটকের জন্ম হয়েছিল আমাদের সাধারণ রাজনৈতিক সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা থেকে। মুনীর চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের হাতে খড়িকে বুঝতে হলে এই ‘মানুষ’ নাটকটি পড়তে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেছিলেন মুনীর চৌধুরী ইংরেজী সাহিত্যের একজন সেরা ছাত্র হিসেবে। অধ্যাপনা তাঁর জন্যে ছিল নির্দিষ্ট হয়ে। কিন্তু প্রগতিশীল সক্রিয় রাজনীতি তাঁকে টানছিল। সারা সময়ের কমিউনিস্ট কর্মী হবার দিকেই ছিল তাঁর ঝোঁক। বস্তুতঃপক্ষে আমরা যদি চাপ দিতাম তাহলে সরদার ফজলুল করিমের মতো মুনীর চৌধুরীও অধ্যাপনা ছেড়ে দিতেন। আমরাই হয়তো কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। তিনি যদি অধ্যাপনা করেন এবং কমিউনিস্ট হিসেবে কাজ করেন তাহলে লাল নিশানের রাজনীতির পক্ষে তা সহায়ক হবে এরকম একটা কথা ছিল আমাদের মনে। আমরা তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধির মধ্যে রাখতে চেয়েছিলাম।

পরবর্তীকালে তিনি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নিজকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন রাজনীতিবর্জিতভাবে শিক্ষক জীবনকে চূড়ান্ত গুরুত্ব এবং পরিপূর্ণ আনুগত্য দিয়ে, তার জন্যে আংশিকভাবে দায়ী আমরা ও তাঁর সাথীরা যারা প্রধানত প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে জড়িত থেকেছি। এ ব্যাপারটা ঘটবার আগে সমস্ত মিলিয়ে মুনীর চৌধুরী সাহিত্য আর রাজনীতির মধ্যে যে সম্মেলন সাধন করেছিলেন, তার মধ্যে থেকে গিয়েছিল অনির্দেশ্যতা। তিনি নিজেও একটা পরিষ্কার ফয়সালা করে নেননি। আমরাও বিশেষ করে যারা তাঁর সাহিত্যিক সতীর্থ ছিলাম তারাও ফয়সালা করে দেইনি। এই অবস্থাতেই মুনীর চৌধুরী ১৯৪৮ সালে তদানীন্তন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট নেতৃত্বের একজন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আবার এই সময়েই শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির অগ্নিপরীক্ষা। মুসলিম লীগ শাসনের সমস্ত রোষ পড়েছিল কমিউনিস্টদের উপর। দু’টি ঘটনার কথা মনে আছে। মুনীর চৌধুরী সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে আমাদের দুরূহ দায়িত্বে শরীক হয়েছিলেন।

সেটা বোধহয় ১৯৪৮ সালের মে মাস। আমাদের কয়েকজন কমরেড তখন আত্মগোপন করেছেন। আমরা কয়েকজন বাইরে খোলাখুলি পার্টি অফিস চালাচ্ছি। ঠিক হলো আমরা এক সঙ্গে বসবো। নারায়ণগঞ্জ থেকে অদূরে লক্ষ্যা নদীর অপর পাড়ে একটি গ্রামে আমরা দু'দিন আলোচনায় বসেছিলাম। সেখানে মুনীর চৌধুরী ছিলেন একজন উচ্ছল প্রাণবন্ত সঙ্গী হিসেবে। মুনীর চৌধুরীর একটা গুণ ছিল এটাই। অত্যন্ত সঙ্গীণ মুহূর্তে এবং বিভিন্ন অসুবিধার মধ্যে তিনি সহজ হতে পারতেন। গ্রামে থাকার সেই দু'টি দিনের কথা কোনদিন ভুলব না। মনে পড়ে সকাল বেলায়

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice