জাসদের আলোচনায় অসুবিধা
II ১ II
জাসদের আলোচনায় একটা অসুবিধা হলো এই যে, এটা কোন ‘পার্টি’ নয়। এই দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে: জাসদ একটি সমাজতান্ত্রিক গণ-সংগঠন; অর্থাৎ ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ এবং শ্রমিক জোটের মতো জাসদও নেহাতই একটা গণসংগঠন।
তাহলে পার্টি কোথায়? পার্টি নেই; আছে একটা ‘পার্টি প্রক্রিয়া’। সেটা হলো জাসদের মধ্য থেকেই ক্রমে একটা বিপ্লবী পার্টি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া। জাসদ সভাপতি জনাব জলিল এটাকে একটা তুলনা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন:
জাসদ মার্কসবাদী পার্টি নয়। জাসদকে আমরা সমাজতান্ত্রিক গণসংগঠন বলছি। এখানে বিভিন্ন শ্রেণীর সমন্বয় ঘটবে। এখানে আন্দোলনের মাধ্যমে কর্মী তৈরী হবে। যেমন ধরুন, আপনি মাখন তৈরী করতে চান। তাহলে আপনাকে একটা কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দিতে হবে। দুধ গরম হলে মাখন উঠবে আপনি তা তুলে রাখবেন। মাখন উঠবে আবার তুলে রাখবেন। এখানে জাসদ হচ্ছে কড়াই এবং জনগণ হচ্ছে দুধ। [সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’; ১৮ই এপ্রিল ’৮০; পৃ. ৩৬]
অর্থাৎ জাসদের মধ্যে যারা আছেন, তাঁরা বিভিন্ন শ্রেণীর। এবং বড় কথা হলো যে, তারা জাসদের প্রতিনিধি হয়েও নিজ নিজ (অর্থাৎ অ-সর্বহারা) শ্রেণীর প্রতি অনেকাংশে অনুগতও থেকে যেতে পারেন! অর্থাৎ তাদের একদিকে সর্বহারা শ্রেণীর যেমন, তেমনি অন্যদিকে নিজ-উৎপত্তিস্থল, অ-সর্বহারা শ্রেণীর, স্বার্থকেও প্রতিফলিত করার অধিকার আছে!
কেবলমাত্র উক্ত গঠিতব্য (!) পার্টির সদস্য হওয়ার পরই তার আর এই দ্বৈততার সুযোগ থাকে না। এর আগ পর্যন্ত ‘বৈজ্ঞানিক’ সমাজতন্ত্রের দলের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তার এই সুযোগ থাকবে!
কিন্তু শুধু এটুকু হলেও বোধকরি বুঝে নেওয়া সম্ভব ছিল।
এ পর্যন্ত যা কিছু খবরাখবর প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় যে জাসদের ভেতরের কথিত এই পার্টি প্রক্রিয়া একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির, স্থিতিশীল এবং পরিচ্ছন্ন প্রক্রিয়ার বদলে আগাগোড়াই সিদ্ধান্ত গ্রহণের উৎসস্থলকে ধোঁয়াটে করে রাখাতেই সাহায্য করেছে বেশী এবং ফলশ্রুতিতে সংগঠনের মধ্যে বিভিন্ন সময় সৃষ্টি করেছে বিভ্রান্তির।
যেমন ১৯৬২ সাল থেকেই নিউক্লিয়াসের কাজ করাটা জাসদের নিজের কাছেই আজও প্রশ্নসাপেক্ষ।[১]
দলের ভেতর দল করলে সাধারণত তা গোপনেই করা হয়ে থাকে ৷ জাসদের এই পার্টি প্রক্রিয়াকেও সম্ভবত সেরকম বিকল্পের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ‘লাল ইশতেহার’ সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠলে তাকে বদলে অন্য ফোরামের সৃষ্টি করা হয়েছে; এইভাবে বিভিন্ন রূপ পাল্টে অবশেষে গঠিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি [COC]; যদিও তা কিসের কেন্দ্রিয় সাংগঠনিক কমিটি, তার কোন উত্তর ছিল না।[২]
আবার পরে এক পর্যায়ে[৩]সমন্বয় কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে পরবর্তীতে জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় গর্বের সাথে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এতদিনে সংগঠনকে স্বাধীনতা দেওয়া গেছে![৪]
ফলে ‘গণসংগঠনে’র সাথে গঠিতব্য ‘পার্টি’র মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক সম্বন্ধীয় মৌলিক থিসিস নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তির। সৃষ্টি হয়েছে অবিশ্বাসেরও।
কোন কোন সময় কেউ কেউ এইসব প্রক্রিয়াজাত (!) প্লাটফর্মগুলোকে সন্দেহের চোখেও দেখেছেন; ভেবেছেন ‘খোঁজ নিলে দেখা যাবে কিছু কিছু ব্যক্তি কোথাও না কোথাও বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন’। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ব্যাপারটা কোন কোন সময় মনে হয়েছে ‘ফাঁকি’র এবং ধরণটা ‘ষড়যন্ত্রমূলক’।
সামগ্রিক ফলশ্রুতিতে জাসদের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উৎসস্থল সম্বন্ধীয় এই ধোঁয়াটে অবস্থাটা এর বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার একটা বাড়তি অসুবিধার সৃষ্টি করে।
এবং একই সাথে সৃষ্টি হয় নানান প্রশ্নের।
II ২ II
কিন্তু জাসদের আলোচনায় দ্বিতীয় অসুবিধাটা আরও মারাত্মক। এবং সেটা হলো এই যে, অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জাসদের সর্বোচ্চ স্থানীয় নেতারাও এমন সব মৌলিক বিষয় নিয়ে এক নিঃশ্বাসে এমন স্ববিরোধী, অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য রেখে বসেন যে, নিছক অবাক হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না কোন ৷
যেমন ধরুন, এপ্রিলে ‘বিচিত্রা’কে দেওয়া জনাব জলিলের সাক্ষাৎকার। ৩৬নং পৃষ্ঠায় তিনি বলেন:
আমাদের এখানে সামন্ত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments