সুকান্তের সাহিত্যচর্চা
সুকান্ত! সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) বাংলা সাহিত্যে একটি অবিস্মরণীয় নাম, বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়েছে শিশুকালে ৯ বছর বয়সে। কিন্তু প্রকৃত সাহিত্যজীবন (১৯৪০-১৯৪৭) ৭ বছর। একুশে পা না দিতেই তিনি চিরতরে হারিয়ে গেছেন। তাঁর জীবনের বৃহৎ অংশ কাব্যচর্চা। সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও তাঁর পদচারণা ছিল। কাব্যক্ষেত্রে তিনি যে তীক্ষ্ণ ধীশক্তির পরিচয় দিয়েছেন, বিষয় ও বক্তব্যে যে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন এবং বিদ্রোহ, বিপ্লব ও শ্রেণি চেতনার সুর ধ্বনিত করেছেন তা পূর্বাপর কোন কবির মধ্যে দেখা যায় না। মানব মুক্তির মহান মন্ত্রকেই তিনি জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। আর এ কাজে তিনি নিজেকে উজাড় করে সঁপে দিয়েছিলেন। ঠিক যেমনটি তিনি কাব্যে প্রকাশ করেছিলেন:
এবারে নতুনরূপে দেখা দিক রবীন্দ্র ঠাকুর
বিপ্লবের স্বপ্ন চোখে কণ্ঠে গণ সংগীতের সুর,
জনতার পাশে পাশে উজ্জ্বল পতাকা হাতে
চলুক নিন্দাকে ঠেলে গ্লানি মুছে আঘাতে আঘাতে।
(পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশ্যে)
সুকান্ত তাঁর অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন। কোন ক্লান্তি, বিচ্যুতি বা বিশ্রান্তি তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর সাহিত্যচর্চা ছিল রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অনুষঙ্গ হিসেবে। এমন অঙ্গীকার সোমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪২) ছাড়া আর কারো মধ্যে তেমনভাবে দেখা যায় না। তিনি ছিলেনও সুকান্তের সমকালের। কিন্তু ফ্যাসিবাদী গুণ্ডারা তাঁকে প্রকাশ্যে ঢাকার রাজপথে খুন করে। শেলী, কীটস ও সুকান্তের সমান বয়সের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু গণমানুষের ভাবনা তাঁদের চিন্তা-চেতনায় সেভাবে স্থান লাভ করেনি। সুকান্ত জন্মেছিলেন ১৩৩০ বঙ্গাব্দের ৩১ শ্রাবণ, ১৯২৬ সালের ১৬ আগস্ট এবং মারা গিয়েছেন ১৩৫৪ বঙ্গাব্দের ২৯ বৈশাখ, ১৯৪৭ সালের ১২ মে। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু কলকাতায়। তবে তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল গোপালগঞ্জ (তৎকালীন ফরিদপুর) জেলার কোটালীপাড়ার ঊনসিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং মা সুস্বীতি দেবী। সুকান্ত ছিলেন তাঁর পিতার দ্বিতীয় পক্ষের দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর অপর দুই সহোদর ছিলেন সুশীলচন্দ্র ভট্টাচার্য ও অশোক ভট্টাচার্য। তাঁর জন্মকালে তাঁদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল ছিল না। সুকান্তের জীবন কেটেছে কলকাতায়। তাঁর জীবন প্রণালী কলকাতা শহর ঘিরে পরিচালিত হলেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত ছিল গ্রামের গরীব মেহনতী মানুষের ভাঙ্গা কুঁড়েঘর পর্যন্ত। তাঁর রাজনীতি ও সাহিত্যচর্চায় তার প্রতিফলন দেখা যায়। সুকান্তের পিতা, পিতৃব্য, পিতামহ ও মাতামহ সকলেই পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের পরিবারে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সর্বদা লেগেই থাকতো। সব সময় বাড়িতে সরগরম অবস্থা বিরাজ করতো। এমনি একটি পরিবেশে সুকান্তের বেড়ে ওঠা। সমবয়সীরা যখন হৈ হুল্লোড় ও খেলাধুলায় ব্যস্ত থেকেছে, সে সময় সুকান্ত একাকী থাকতে পছন্দ করেছেন। কেননা ছোটবেলা থেকে সুকান্ত নিরীহ প্রকৃতির ছিলেন। লেখাপড়ার বয়স হলে তাঁকে স্থানীয় কমলা বিদ্যা মন্দিরে ভর্তি করে দেয়া হয়। পরে তাঁকে দেশবন্ধু হাই স্কুলে ভর্তি করা হয়। পাঠ্য পুস্তকের প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়ায় লেখাপড়ায় ঘাটতি পড়ে। রাজনীতির সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে অন্য এক স্কুল থেকে দু’বার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেননি। প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার ও কাব্যরোগের কারণে সনদপত্র অর্জনের বিষয়ে তেমন ভ্রুক্ষেপ করেননি। রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে সাহিত্যচর্চাকে বেছে নিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সে ভাবনায় বিভোর ছিলেন। তিনি রাজনীতি ও সাহিত্যচর্চা সমান্তরালভাবে চালিয়ে গেছেন।
সুকান্তের জন্মেরও একযুগ আগে সংঘটিত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তাই বিশের দশকে সারা বিশ্বে দেখা দিয়েছিল মহামন্দা। মহান রুশ বিপ্লবের সাফল্যে বিশ্বের সব শোষিত-নিপীড়িত জাতি ও দেশ উজ্জীবিত হয়েছিল। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম তীব্রতর হচ্ছিল। তিনি শিশুকালেই চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগ্রামে বাঙালিদের বীরত্বের কাহিনী শুনেছিলেন। তাছাড়া ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান, নৃশংসতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আগস্ট আন্দোলন, জনযুদ্ধ তত্ত্ব, মন্বন্তর, নৌ-বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, টংক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন সুকান্তের জীবনকালের ঘটনা। ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস, সাম্রাজ্যবাদীযুদ্ধ,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments