-
ছোটবেলায় বহু রহস্যময় অভিযানের গল্প পড়ে আমাদের সবারই ইচ্ছা হয় সেসব অভিযানে অংশ নিতে। বিদেশে কিশোর-কিশোরীদের সে ধরনের অভিযানের জন্য রয়েছে নানা সুযোগ। সামার ক্যাম্প থেকে শুরু করে পর্বতারোহণ, রোমাঞ্চকর আরও অনেক ধরনের অভিযানের ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশে কিশোর-কিশোরীদের সে সুযোগ নেই। স্কুল থেকে বাসা, আর বাসা থেকে স্কুলের মাঝেই তাদের জীবন সীমাবদ্ধ। তবে এর মাঝেও ব্যতিক্রম আছে। এ দেশের পর্বতারোহীরা তাদের সেই অভিযানের শখ পূরণ করছেন পর্বতারোহণের মতো এক রহসম্যয় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। তাদের অভিজ্ঞতা জানার জন্য আমাদের দেশের প্রথম নারী পর্বতারোহী সাদিয়া সুলতানা ও বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টজয়ী নারী নিশাত মজুমদারের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল।
সাদিয়া
-
শিশুরা ফুলের মতো সজীব ও সুন্দর। একজন শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য প্রতিটি মা-বাবার কাছে একটিই প্রত্যাশা, তারা তাদের সন্তানকে যথেষ্ট সময় দেবেন। এ কর্মব্যস্ত শহরে মা-বাবার সঙ্গে একান্ত কিছু সময় প্রতিটি শিশুরই চাওয়া। তেমনই এক শিশু মাইসা (ছদ্মনাম)। মাইসার বয়স ছয় বছর। তার বাবা-মা দুজনই চাকরিজীবী। সে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। রোজ সকালে তার স্কুল শুরু হয় আটটায় এবং ছুটি হয় এগারোটায়। স্কুল শেষে বাসার দারোয়ানের সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসে মাইসা। সারাদিন বাড়ির কাজের মেয়ের সঙ্গেই তার দিন কাটাতে হয়। স্কুল ছুটির পর সে আশায় বসে থাকে কখন বিকাল হবে, কখন বাবা-মা আসবে। সারাদিন যেন শেষই হতে চায় না। সন্ধ্যায় দরজায়
-
খবরটা শুনিয়াই বাহির হইয়া পড়িলাম। হারাণকে বরাবর দেখিয়াছি শান্ত-প্রকৃতি, মৃদু স্বভাব, এমন ভীষণ কাজ সে করিয়া বসিল কেন? গুরুভার প্রশ্ন, প্রশ্নের চাপেই সমস্ত মন যেন অবশ্য হইয়া পড়িয়াছে, উত্তর খুঁজিবার চেষ্টা করার সামর্থ্য নাই, উত্তর পাইবার প্রত্যশাও নাই, পা দুইটাকে পর্যন্ত যেন টানিয়া চলিতে হইতেছে।
আমার চৈতন্য ফিরিল বৃদ্ধ ভচার্যকে দেখিয়া। তিনি হন্ হন্ করিয়া ছুটিয়া চলিয়াছেন আমাকে দেখিয়া বলিলেন- ‘নারকী, মহাপাতক, ঘোর পাপিষ্ঠ।’
বলিয়া প্রসারিত-বাহু নরকের গ্রাস এড়াইতেই যেন তিনি আবার ছুটিয়া চলিলেন। এই বৃদ্ধের সম্বন্ধে মনটা আমার তিক্ত বিরক্ত হইয়া উঠিল। ধর্ম যেন শুধু মানুষকে অমানুষ করিবার জন্যই।
ঘটনাস্থলে পৌঁছিয়া দেখিলাম আশেপাশের পাঁচটা গ্রামের লোক ইতিমধ্যেই আসিয়া জড়
-
সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু সান্ধ্যভ্রমণ শেষ হয়নি; পার্কের যে-দিকটা জনবিরল সেখানে কখনও লাল কাঁকরের পথে, কখনও নরম ঘাসের উপরে স্যার বিজয়শংকর নীরবে পায়চারি করছিলেন। অদূরে মানুষের ভিড় থেকে, যানবাহন-পীড়িত পথের চলায়মান জনতা থেকে, একটানা কোলাহল শোনা যায়। মাঝে-মাঝে উজ্জ্বল আলো এসে পার্কের দেহাবরণ খুলে সমস্ত প্রকাশ করে দিচ্ছে।
স্যার বিজয়শংকর নিজের মনে এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন।
—বাবা, ও বাবা!
কান্নায় বিকৃত একটি ছোট্ট মেয়েলি স্বর যেন কাছে কোথাও শোনা গেল! স্যার বিজয় থমকে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলেন।
—আপনি আমার বাবাকে দেখেছেন?
মেয়েটি তাঁর কাছেই এসে দাঁড়িয়েছে—ফ্রক-পরা, স্যার বিজয়শংকর চমশা-চোখে সেই স্বল্পালোকেই তাকে দেখলেন। ঘাড় পর্যন্ত চুল, দু-হাত আর পা নিরাভরণ, মুখ চোখের
-
ছোটো দোতলা বাড়ি, তবুও আমাদের পক্ষে বেশি হয়ে যায় বলে নীচের ঘরে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় একজন ভাড়াটে আনলাম।
লোকটির নাম শৈলেশ, সঙ্গে স্ত্রী আর চারটি ছেলে-মেয়ে।
যেদিন তারা প্রথম এল তখন রাত্রি, লোকটাকে সেদিন আর দেখিনি। কিন্তু পরদিন কলের পাড়ে মুখ ধুতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম তার চেহারা দেখে। মিশকালো তার গায়ের রং, চোখদুটি বড়ো, লম্বা আর ভয়ানক জোয়ান, সমস্ত গা লোমে ভর্তি, মাথায় চুল উলটানো। তার সবচেয়ে বিস্ময়কর যা তা হচ্ছে তার গোঁফ-জোড়া। স্যার আশুতোষেরও বোধ করি এমন গোঁফ ছিল না। নিজেকে ধন্যবাদ দিলাম, এই ভেবে যে রাতে না দেখে ভালোই করেছি, দেখলে হয়তো মূর্ছা যেতাম। এখানে বলে রাখা
-
ঘরে আর কেউ নেই।
মালতী জিনিসটা এপিঠ-ওপিঠ করে বললে, ‘আহা, এটা কী দিয়ে তৈরি বলুন তো?’
সুব্রত ঢালটি পরীক্ষা করে বললে, ‘নিশ্চয় লোহা’।
মালতী খিল খিল করে হেসে উঠল, হাসতে হাসতে বললে, ‘মোটেই নয়, তার ধার-কাছ দিয়েও নয়। এটা গন্ডারের চামড়া দিয়ে তৈরি। দেখতে ঠিক লোহার মতো মনে হয়, না?’
সুব্রত বিস্ময়ের স্বরে বললে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু এ দিয়ে গুলি ফেরানো যায়?’
—‘হুঁ, খুব যায়। গন্ডারের চামড়া যে খুব শক্ত এটা জানেন না?’
—‘জানি।’
—‘তার চেয়েও শক্ত এটা। জলে ভিজিয়ে রোদে শুকিয়েছে, একেবারে লোহার মতো হয়ে গেছে। এগুলো আগে আরও অনেক ছিল, হাতে হাতে কতগুলো নিখোঁজ হয়ে গেছে, এখন এই কয়টি
-
রমলা বিরক্ত হয়ে উঠল। যেন এত বিরক্তি তার কোনোদিন আসেনি। নইলে ইকনমিক্সের পপুলেশন চ্যাপ্টারটা তো জমে ওঠবার কথা কিন্তু আজকার ক্লাসে কিছুতেই যেন তার লেকচার গভীর হয়ে উঠল।
এমন এক-একটা দিন আসে সত্যি যখন কিছই ভালো লাগে না। আজ যেন তাই। সে যেন আজ প্রথম টের পেল, ইস্কুলের মেয়েদের চেয়ে কলেজের মেয়েরা গোলমাল করে বেশি। অথচ এখানে কিছুই বলা যায় না, ইস্কুলের মতো যায় না বেঞ্চির ওপর দাঁড় করানো, যায় না কান মলে দেওয়া। ইস্কুল থেকে কলেজে উঠে মনে করে, কী-না-কী করে ফেললাম; দুর্ভাগ্য সব। তার মেয়ে যদি হয়, সে কোনোদিন তাকে কলেজে পড়াবে না। পড়িয়ে বা লাভ কী? কিছু
-
ঠাণ্ডাটা আজ একটু বেশিই পড়িয়াছে, বাহিরেও কনকনে বাতাস, বেড়ার ফাঁক দিয়া সে বাতাস আসিয়া সকলের গায়ে লাগে। একপাশে একটি কুপি জ্বলিতেছে—প্রচুর ধোঁয়ায় মেশানো, লাল শিখা। বাতাসে কড়া তামাকের গন্ধ। রাত এখন কয়টা হইয়াছে কেহ বলিতে পারে না। মাঝে মাঝে কেবল কুকুরের ডাক ছাড়া গভীর নিস্তব্ধতা চারিদিকে।
কলকেটি উপুড় করিয়া আর এক ছিলিম তামাকের আয়োজন করিতে গিয়া কানাই দেখিল, কৌটাতে তামাক নাই। হাতের কাছেই ভেজানো দরজার দিকে চাহিয়া বলিল, ‘একটু তামাক দে তো রে, দামি?’
দামিনী কানাইর মেয়ে। কেবলমাত্র বাবার মুখের অদ্ভুত গল্পটার আকর্ষণেই এতরাত অবধি জাগিয়াছিল। বলিল, ‘তামাক তো নেই বাবা।’
—‘সে কী, কালই না অতগুলো পাতা কাটলাম?’ খাওয়ার মালিক
-
ছেলেগুলি যা দুষ্টু! কাল রাতে কানের কাছে কতক্ষণ ক্যান্স্ত্রা পিটিয়েছে, আজও পিটিতেছে। মানা করিলে জোরে বাজায়, কিছু না বলিলে আরও জোরে বাজায়। এমন খেলা আর খেলে নাই বুঝি। প্রত্যেকটি মধ্যযুগের দিগম্বর সম্প্রদায়ের বংশধর, মাথার চুল রোদে-পোড়া, হাতে-পায়ে বড়ো-বড়ো নখ। মুখে প্রৌঢ়া আর বৃদ্ধা মেয়েদের বিবাহের গানের অনুকরণ করিতেছে, হাতে ক্যান্স্ত্রা পিটিতেছে।
মাস্টার ছেলেটি ভালো, বড় বাধ্য। ঐশ্বর্যের লীলাভূমি শহরে অন্নের সন্ধানে আসিল, অন্ন পাইল না, কিন্তু পাইল আমাকে, তদবধি আমাকে ধরিয়াই আছে। আমি বৃক্ষ, সে লতা। মাস্টার ছেলেটি ভালো, অর্থাৎ সোজা কথায় যাকে বলে গুড বয়। মাথার চুল হইতে পায়ের নখ অবধি এমন একটি চেহারা যে, আঠারো হইতে পঁয়ত্রিশ অবধি
-
দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে।
বিকালের রোদের নীচে সরু আলোর পথ দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে প্রশান্ত ভাবিল, দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে আবার এই প্রথম সে গ্রামের দিকে পথ চলিতেছে। সেই পরিচিত পথ। সেই বুনোফুল-ঘাস-লতাপাতার গন্ধ, শুকনো পাতার স্তূপে কোনো অদৃশ্য প্রাণীর খস খস শব্দ, হঠাৎ কখনও সারি সারি আকাশ-ছোঁয়া তালগাছের সামঞ্জস্যহীন অবস্থিতি, সেই খেয়াঘাটের নৌকা ও মাঝি। বছরের পর বছর, মুহূর্তের পর মুহূর্ত কত পরিবর্তন চলিতেছে, কত স্বেচ্ছাচারীর চোখে-মুখে উল্লাস, কত ডাকাত পরের অন্নে মাথা ঠোকাঠুকি করে, অথচ এখানে তার ছোঁয়াটুকু নাই। পঁচিশ বছর আগের পুরুষরা একদিন আকাশের দিকে চাহিয়া নিরুপায়ে কাঁদিয়াছে, তার বংশধরেরা আজও কাঁদিতেছে, তাহাদের চোখ-মুখ ফুলিয়া গেল। আকাশে কী
-
তাহাদের ঘরে ঢুকিয়া হঠাৎ দরজা দিতে দেখিয়া পদ্মা কাতরস্বরে বলিল, ‘আমাকে একটু আসতে দে ভাই, আমি কিছু বলব না, কেবল চুপ করে বসে বসে শুনব, কিছু বলব না—’
দরজা আগলাইয়া সুমতি বলিল, ‘না না, তোমাকে আসতে দেওয়া হবে না।’
পদ্মা তবু তাহার মুখটি আরও কাতর করিয়া বলিল,
—‘তোদের পায়ে পড়ি ভাই, আমায় একটু আসতে দে, বলছি তো একটি কথাও বলব না—’
তাহারা একবার পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিল, শোভা মুখ টিপিয়া হাসিল, তারপর রানু গম্ভীরভাবে বলিল, ‘একটি কথাও বলতে পারবে না, ঠিক তো?’
—‘ঠিক বলছি, এই চোখ ছুঁয়ে বলছি।’ পদ্মা সত্যই তাহার দুই চোখ ছুঁইয়া বলিল।
সুমতি এবার পথ ছাড়িয়া দিল,
-
রাত অনেক।
রাস্তায় লোকজন একটিও নেই। এখন আশ্বিনের শেষ, তাই একটু শীতের আমেজ লাগে। সুকুমার তার জামার কলারটি আরও টেনে ধরল। নিতান্ত অন্যমনস্ক হয়েও সে শুনতে পেল, একটা বিড়াল মিউ মিউ করে কাতরস্বরে ডাকছে, হয়তো হঠাৎ কোনো খোলা ড্রেনে পড়ে স্নান করে উঠেছে। তাছাড়া ড্রেনের গন্ধও নাকে আসে, রাত্রির নিস্তব্ধতায় দিনের বেলার চেয়েও তীব্র। দূরে একটা কেরোসিনের ল্যাম্প টিমটিম করে জ্বলছে। পাশেই একটা দীর্ঘ অস্পষ্ট ছায়া।
সে পুরোনো বাড়িটার একটা ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে সুকুমার থাকে, সামনেই তার মস্ত বড়ো গেট, প্রায় অর্ধেকটা ভাঙা। সর্বাঙ্গ লোনায় ধরেছে। বাড়ি ঢুকতে গিয়ে সুকুমার দেখল, লম্বা একটা লোক হঠাৎ কোথায় সাপের মতো সরে পড়ল।
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.