অফিসে যখন ‘নিজ দেশে পরবাসী’
‘খুব অস্বস্তির সঙ্গে এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কের সামনে যাচ্ছি আর ব্যাংকের ম্যানেজার আমাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। সব সময়ই নিজেকে এ জায়গায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি হিসেবে অনুভব করছি। মনের মধ্যে এক অস্বাভাবিক জড়তা তৈরি হচ্ছে। নতুন শাখায় নতুন লোকদের মাঝে এক ধরনের ভীতিই অনুভব করছি।’ এভাবেই ব্যাংককর্মী নিপা (ছদ্মনাম) বদলি হয়ে নতুন শাখায় যোগ দেওয়ার সময়ের মনের অবস্থার কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের চাকরিজীবনে অনেক জেলার নানা শাখায় বদলি হয়েছি। এক জায়গায় দুই কি তিন বছরের বেশি কখনও থাকিনি। একটি শাখার সবাইকে বুঝে, চিনে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার পরই বদলি হতে হয় অন্য শাখায়, এটাই নিয়ম আমাদের ব্যাংকের। অবাকভাবে লক্ষ করেছি যে, নতুন সব শাখায় যোগ দেওয়ার সময় সবার পক্ষ থেকে আমি খুবই অসহযোগিতা পেয়েছি। একজনকে নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে কেউ সাধারণত এগিয়ে আসেনি। অফিসের পুরোনোরা একজন আরেকজনকে চেনে। তাদের জগৎটা থাকে চেনা। সেখানে এই অচেনা গ্রহে একজনের একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতাকে কেন্দ্র করে যেন এক ধরনের মজা করা হয়, যা আমার জড়তাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিত। সাহায্যের জন্য কেউ অনেক সময় এগিয়ে এলেও ভাবতে হয়েছে সেটিও এক ধরনের মজা বা বিপদে ফেলার চেষ্টা। নানা জায়গায় বদলি হয়ে ঠেকে ঠেকেই এ ধরনের ভাবনার উদয়। এ ধরনের প্রবণতার পেছনের কারণ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি, তবে উত্তর পাইনি।
এটি শুধু নিপার অভিজ্ঞতা নয়। হয়তো প্রত্যেক চাকরিজীবীর জীবনের ঘটনা। আমরা যদি আমাদের জীবনকে বিশ্লেষণ করি, তবে লক্ষ করব যে, ছোটবেলায় প্রথম স্কুলে ঢোকার পরেও আমাদের মধ্যে প্রায় সবাইকে একই রকম ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। নতুন কেউ এলে ক্লাসের কেউই তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। ইচ্ছা করে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে তাকে বিপদে ফেলা হয়; এমনকি ক্লাসের শিক্ষকদের সম্পর্কেও কোনো ধারণা দেওয়া হয় না। শিশুটির মনে সেই থেকেই নতুন জায়গার প্রতি একধরনের ভীতি সৃষ্টি হয়। অনেক সময় ক্লাসের কেউ নতুন শিক্ষার্থীকে সাহায্য করতে গেলে অন্যরা মিলে তাকে নানাভাবে ভয় দেখায়, যেন সে তা না করতে পারে। এভাবে নতুন একজনকে বিব্রত করার মাধ্যমে অনেকে আনন্দ খুঁজে পায়। এ ধরনের আচরণ ছোটবেলাতেই আমাদের মধ্যে নতুন স্থানে, নতুনদের মাঝে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে জড়তা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
ছোটবেলার এ মনোভাব যেন বড় হয়েও দূর হয় না। বুদ্ধি-বিচার বা অনুধাবন ক্ষমতা বহুগুণে বাড়লেও সে সমস্যা থেকেই যায়। তাই এক শাখা থেকে অন্য শাখায় বদলি হলে বা নতুন কোনো চাকরিতে যুক্ত হলে একই ধরনের বিপদে পড়তে হয় একজন চাকরিজীবীকে, যা মনে করিয়ে দেয় আমাদের ছোটবেলার স্মৃতিকে। বিশেষত একজন মেয়ের জন্য নিজ শহরের বাইরে অন্য জেলায় বদলি হলে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কেননা সামাজিকভাবে পরিবারের দেখাশোনা থেকে শুরু করে বহু কাজ একজন নারীকেই করতে হয়। এ পরিস্থিতিতে নতুন কর্মীর প্রতি পুরোনো কর্মীদের আচরণ যদি অসহযোগিতামূলক হয়, তখন তা তাকে মানসিকভাবে অনেক বেশি কাবু করে ফেলে। এখনো সব ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার পুরুষের তুলনায় অনেক কম। এক্ষেত্রেও অফিসের পরিবেশে সবার সঙ্গে মানিয়ে চলা তার জন্য কঠিন। এর ওপর যখন সহকর্মীরা সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতার মনোভাব থেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, নানাভাবে তার অসহায়ত্বকে উপভোগ করে তখন সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া পুরুষের তুলনায় নারীর জন্য বহু গুণে কঠিন হয়ে পড়ে।
একটু আগের সময়কার একজন নারীর অভিজ্ঞতা জানতে কথা হচ্ছিল সাদিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, গত বিশ বছর ধরে আমি সরকারি অফিসার হিসেবে চাকরি করছি। আমার বদলির চাকরি। কখন কোন জেলায় বদলি হয়, তার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments