-
ঘনায়মান কালো রাতে জনশূন্য প্রশস্ত রাস্তাটাকে ময়ূরাক্ষী নদী বলে কল্পনা করতে বেশ লাগে। কিন্তু মনের চরে যখন ঘুমের বন্যা আসে, তখন মনে হয় ওটা সত্যিই ময়ূরাক্ষী: রাতের নিস্তব্ধতায় তার কালো স্রোত কল-কল করে, দূরে আঁধারে ঢাকা তীররেখা নজরে পড়ে একটু-একটু, মধ্যজলে ভাসন্ত জেলেডিঙিগুলোর বিন্দু বিন্দু লালচে আলো ঘন আঁধারেও সর্বংসহা আশার মতো মৃদু-মৃদু জ্বলে।
তবে, ঘুমের স্রোত সরে গেলে মনের চর শুষ্কতায় হাসে ময়ূরাক্ষী! কোথায় ময়ূরাক্ষী! এখানে-তো কেমন ঝাপসা গরম হাওয়া। যে-হাওয়া নদীর বুক বেয়ে ভেসে আসে সে হাওয়া কি কখনো অত গরম হতে পারে?
ফুটপাথে ওরা সব এলিয়ে পড়ে রয়েছে। ছড়ানো খড় যেন। কিন্তু দুপুরের দিকে লঙ্গরখানায় দুটি খেতে
-
আজি এই পূণ্য দিনে
গাঁয়ের কিসান
কি গাহিব গান—
নাই ভাষা
দৈন্য হতাশায়
মন ম্রিয়মান।
হয়ত বা কেহ কেহ
বসি নিজে চৌতালের ‘পরে
গর্ব করে
শিখিয়াছি রবীন্দ্রের গীতি
গাই নিতি
বেহাগ খাম্বাজ ও ভৈরবী
নানাবিধ সুরে।
হয়ত বা দু’একটি পল্লীর গান
কাকডাকা সুরে
আমিও দিয়াছি টান
লোক দেখানোর তরে,
সে-সুর বেসুর বাজে
পৌঁছে নাই সবার অন্তরে।
ভেঙ্গে গেছে মানুষের মন
ভেঙ্গে গেছে কুঁড়ে ঘর
কামার ছেড়েছে গ্ৰাম
গুটায়ে হাপর,
জেলে কাঁদে জাল নাই
তাঁতী ব'সে গুটাইয়া তাঁত
এদের কান্নার সুরে
কেবা করে কর্ণপাত।
অজ্ঞতায় অন্ধকারে আছি
কোটি কোটি পুরুষ রমণী
কেউ দেয় নাই জানি
তব বাণী—
দীপশিখা খানি
এদের সম্মুখে
-
সুহাসিনী মাসিমাকে আমি দেখিনি। কিন্তু খুব ছোটো বয়সে যখনই মামারবাড়ি যেতুম, তখন সকলের মুখে মুখে থাকত সুহাসিনী মাসিমার নাম।
—সুহাস কী চমৎকার বোনে! এই বয়েসে কী সুন্দর বুনুনির হাত!
—সুহাসিনী বললে, এসো দিদি বসো। বেশ মেয়ে সুহাসিনী।
—সেবার সুহাসিনীকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ালুম পূর্ণিমার দিন।
—সুহাসিনী ওসব অন্যায্য দেখতে পারে না, তাই জন্যে তো মায়ের সঙ্গে বনে না।
সুহাসিনী গ্রামের সকলের যেন চোখের মণি। সুহাসিনী মাসিমা সম্বন্ধে কথা বলবার সময় সবারই অর্থাৎ আমার বুড়ি দিদিমার, গনু দিদিমার, মাসিমাদের, মায়ের, মামাদের গলার সুর বদলে যেত, চোখে কীরকম একটা আলাদা ভাব দেখা যেত। আর একটা কথা, রূপের কথা উঠলে সকলেই বলত আগে সুহাসিনী
-
নবীনবাবু ঘুম হইতে উঠিয়া কয়লা চাকরকে ডাকাডাকি করিতেছেন শুনিতে পাইয়াও আবার চাদর মুড়ি দিয়া পাশ ফিরিয়া শুইয়া এবং তার একটু পরে বোধ হয় ঘুমাইয়াও পড়িয়াছি। জানালার ফাঁক দিয়া পাশের আতাগাছের ডাল যখন দেয়ালের গায়ে অনেকখানি রোদের মধ্যে ছায়া সৃষ্টি করিয়াছে, তখন কয়লার ডাকে তন্দ্রা ভাঙিল।
—বাবুজি, চা তৈয়ার!
—চা? এখানে নিয়ে আয়, বিছানায়।
নবীনবাবু বোধ হয় প্রাতভ্রমণ সারিয়া আমার ঘরের পাশের সরু করিডোর দিয়া গটগট করিয়া চলিয়া গেলেন, আমার আলস্যের প্রতি কটাক্ষ করিয়াই বেশ জোরে জোরে পা ফেলিয়া গেলেন। চা-পান বিছানায় বসিয়াই শেষ করিয়া উঠিব-উঠিব ভাবিতেছি, এমন সময় নবীনবাবু তাড়াতাড়ি আসিয়া আমার বিছানার পাশের দিকের জানালায় দাঁড়াইয়া বলিলেন—উঠুন মশাই, যোধপুরী
-
বুধো মণ্ডলের মায়ের হাতে টাকা আছে সবাই বলে। বুধো মণ্ডলের অবস্থা ভালো, ধানের গোলা দু-তিনটে। এত বড়ো যে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ গেল গত বছর, কত লোক না-খেয়ে মারা গেল, বুধো মণ্ডলের গায়ে এতটুকু আঁচ লাগেনি। বরং ধানের গোলা থেকে অনেককে ধান কর্জ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
সবাই বলে, বুধোর টাকা বা ধান সবই ওই মায়ের। বুধোর নিজের কিছুই নেই। বুড়ির দাপটে বুধো মণ্ডলকে চুপ করে থাকতে হয়, যদিও তার বয়েস হল এই সাতচল্লিশ। ওর মার বয়স বাহাত্তর ছাড়িয়ে গিয়েছে। আমি কিন্তু অত্যন্ত বাল্যকাল থেকে ওকে যেমন দেখে এসেছি, এখনও (অনেককাল পরে দেশে এসে আবার বাস করছি কিনা) ঠিক তেমনি আছে। তবে মাথায়
-
এঞ্জিন মৃদু-মৃদু আওয়াজ করতে শুরু করেছে। স্টোকহোল্ডে কয়লাওয়ালাদের মুখ লাল হয়ে উঠেছে: তাদের সামনে যে বিরাট অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠেছে—তারই তাপে ঝলসাচ্ছে ওদের মুখ। ভোর নাগাদ জাহাজ ছাড়বে। কিন্তু মাল তোলা এখনো শেষ হয় নি; কার্গো-উইঞ্চে একঘেয়ে আওয়াজ হচ্ছে: ঘর ঘর ঘর। ওধারে ডকের আবরণ দেয়া-আলোর মধ্যে রহস্য, অস্পষ্ট কোলাহল, আর ধোঁয়া।
রাতের শেষাশেষি। বৃদ্ধ করিম সারেঙ্গ কেবিন হতে বেরিয়ে এল—তার ক্ষুদ্র চোখে ঘুমাবসানের ঔজ্জ্বল্য ও স্বচ্ছতা। জাহাজ কাঁপছে মৃদু-মৃদু। ওপরে ফানেল দুটো দিয়ে ধোয়ার শীর্ণ রেখা নিষ্কম্পভাবে ঋজু হয়ে উঠে হাওয়াশূন্য কালো আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। করিম সারেঙ্গ ঘুরে এল এদিকে, দেখলে গ্যাঙ্গওয়ে এখনো তোলা হয় নি। কোণে আবছা অন্ধকার; সে-অন্ধকারে
-
দেখতে লোকটা বেঁটেখাটো। চওড়া শক্ত হাড়, ছোট ঘাড়, টান পিঠ, আর লোমশ দেহ। রঙটা এমন যে মনে হয় কালোর ওপরে-ও কালোর একটা পোঁচ, অথচ সেটা আবলুশ কালো নয়। রঙটায় একটা বৈশিষ্ট্য আছে; এবং আরেক বৈশিষ্ট্য তার বড়, ভাসন্ত ও টেরা চোখ দুটিতে। তার চোখের পানে চেয়ে কখনো মনে হয় কী সোজা কী বোকা সে, আবার কখনো মনে হয় সমস্ত কুটিলতা ঘোলাটে হয়ে পাক খাচ্ছে সেখানে। দারোগার সামনে স্থির হয়ে বসে নিথর দৃষ্টিতে যখন চেয়ে থাকে, তখন বাইরের কেউ তাকে গদাইলস্কর ছাড়া আর কিছু ভাববে না, আবার বন্ধুদের আড্ডায় কিছু না কইতে-ই চোখে যে-সব কথা ভাসে, তার তুলনা মেলা ভার।
তবু,
-
—’এই সেই প্রতাপনারায়ণ চৌধুরির বাড়ি।’
আমি সবিস্ময়ে সেই ভগ্নস্তূপের পানে চাহিয়া দেখিলাম। এই সেই প্রতাপনারায়ণ চৌধুরির বাড়ি? সহজে বিশ্বাস করিয়া উঠিতে পারিলাম না। দিনান্তের অস্পষ্ট আলোক যাই যাই করিয়াও আকাশের পশ্চিমপ্রান্তে তখনও অপেক্ষা করিতেছিল। পরিশ্রান্ত বিহগকুলের অবিশ্রাম কূজনধ্বনি রহিয়া রহিয়া তখনও আকাশ-বাতাস মথিত করিয়া দিতেছিল। গঙ্গার অপূর্ব তরঙ্গভঙ্গ চিত্তলোকে এক অজ্ঞাতচেতনার সঞ্চার করিতেছিল। সেই প্রদোষের ম্লান দ্যুতিবিকাশের অন্তরালে আমি প্রাতঃস্মরণীয় সুবিখ্যাত প্রতাপনারায়ণ চৌধুরির প্রাসাদের পানে চাহিয়া দেখিলাম। গঙ্গার ঠিক তীরভূমিতে অগণিত লতাপল্লবে মণ্ডিত হতশ্রী প্রতাপনারায়ণ চৌধুরির প্রসাদ নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া আছে। নদীস্রোতের অবিরাম আঘাতে সে প্রাসাদের অনেকখানিই ভাঙিয়া চুরিয়া কোন অনির্দেশের পথে বহিয়া গিয়াছে। অতীতের সাক্ষ্যস্বরূপ যাহা এখনও বর্তমান আছে, তাহা
-
আইনস্টাইন কেন যে দার্জিলিং যাইতে যাইতে রানাঘাটে নামিয়াছিলেন বা সেখানে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল হলে ‘On…ইত্যাদি ইত্যাদি’ সম্বন্ধে বক্তৃতা করিতে উৎসুক হইয়াছিলেন—এ কথা বলিতে পারিব না। আমি ঠিক সেইসময়ে উপস্থিত ছিলাম না। কাজেই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ আমি আপনাদের নিকট সরবরাহ করিতে অপারগ, তবে আমি যেরূপ অপরের নিকট হইতে শুনিয়াছি সেরূপ বলিতে পারি।
আসল কথা, নাৎসি জার্মানি হইতে নির্বাসিত হওয়ার পর হইতে বোধ হয় আইনস্টাইনের কিছু অর্থাভাব ঘটিয়াছিল, বক্তৃতা দিয়া কিছু উপার্জন করার উদ্দেশ্যে তাঁর ভারতবর্ষে আগমন। বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়া বেড়োইতেছিলেনও এ কথা সকলেই জানেন, আমি নূতন করিয়া তাহা বলিব না।
কৃষ্ণনগর কলেজের তদানীন্তন গণিতের অধ্যাপক রায়বাহাদুর নীলাম্বর চট্টোপাধ্যায় একজন উপযুক্ত লোক ছিলেন।
-
নিশ্চিন্তপুর গ্রামের প্রান্তে হরিচরণ রায়ের ছোটো একখানা কোঠাবাড়ি ছিল। সংসারে থাকিবার মধ্যে তাহার স্ত্রী আর এক ছেলে। হরিচরণ রায়ের বয়স বছর ত্রিশেক, স্ত্রীর বয়স একুশ-বাইশ। হরিচরণ রায়ের লেখাপড়া এমন বিশেষ কিছুই জানা ছিল না, তাহার উপর নিতান্তই পাড়াগেঁয়ে মানুষ; কাজেই কোথাও না যাইয়া তিনি বাড়ি বসিয়া পৈতৃক আমলের সামান্য একটু জমিজমার খাজনা সাধিতেন। কচু কুমড়া বেগুন—আবাদ করিতেন ঠিক বলা চলে না—পুঁতিতেন; ইহাতেই তিন প্রাণীর একপ্রকার কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলিয়া যাইত।
পৌঁষ মাস। খুব শীত। সন্ধ্যার সময় এক দূর প্রজাবাড়ি হইতে খাজনা আদায় করিয়া হরিচরণ বাড়ি ফিরিয়া আসিল। স্ত্রী বীণাপাণি উঠানের তুলসীতলায় সন্ধ্যা দিতেছিল, স্বামীকে আসিতে দেখিয়া তাড়াতাড়ি তুলসীতলায় প্রণাম সারিয়া, হাসিমুখে
-
ইচু মণ্ডলের আজ বেজায় সর্দি হয়েছে। ভাদ্রমাসের বর্ষণমুখর শীতল প্রভাত। তালি দেওয়া কাঁথা, ওর বউ, তার নাম নিমি, শেষরাত্রে গায়ে দিয়ে দিয়েছিল। এমন সর্দি হয়েছে যেন মনে হচ্ছে সমস্ত শরীর ভারী। ইচু শুয়েই পা দিয়ে চালের হাঁড়িটা নেড়ে দেখলে, সেটা ওর পায়ের তলার দিকেই থাকে, হাঁড়িটাতে সামান্য কিছু চাল আছে মনে হল তার।
ইচু বললে—আজ আর জনে যাব না। একটু পানি দে দিকি।
ওর বউ বললে—জনে যাবে না তবে চলবে কিসি?
—কেন, চাল তো রয়েছে তোর হাঁড়িতি, সজনে শাক-মাক সেদ্দ কর আর ভাত। নুন আছে।
—এটটু অমনি পড়ে আছে মালাটার তলায়।
—তবে আর কী? পানি দে—নামাজ করি। ইচু জল দিয়ে
-
ছেলেমানুষ তখন আমি। আট বছর বয়স।
দিদিমা বলতেন, তোর বিয়ে দেব ওই অতুলের সঙ্গে।
মামারবাড়িতে মানুষ, বাবা ছিলেন ঘরজামাই—এসব কথা অবিশ্যি আরও বড়ো হয়ে বুঝেছিলাম।
অতুল আমার দিদিমার সইয়ের ছেলে, কোথায় পড়ে, বেশ লম্বামত আধফর্সা গোছের ছেলেটা। আমাদের রান্নাঘরে বসে দিদিমার সঙ্গে আড্ডা দিত। অতুলকে আমার পছন্দ হত না, কেমনধারা যেন কথাবার্তা। আমায় বলত—এই পাঁচী, যা—এখানে কী? ওইদিকে গিয়ে খেলা করগে যা—
কখনো বলত—অমন দুষ্টুমি করবি তো বাঁশবনে লম্বা শেয়ালটা আছে তার। মুখে ফেলে দিয়ে আসব বলে দিচ্চি
অতুলকে সবাই বলত ভালো ছেলে। লেখাপড়ায় বছর বছর ভালো হয়ে ক্লাসে উঠত, আমার ছোটোমামার সঙ্গে কীসব ইংরিজি-মিংরিজি বলত—যদি তার কিছু বুঝি!
এইসবের
ক্যাটাগরি
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.