-
নতুন চাকরি পেয়ে কলকাতা এসেছি। সম্পূর্ণ অস্থায়ী চাকরি। যে-কোনো সময়ে, বিনা-কারণে ও বিনা নোটিশে বরখাস্ত হওয়ার সম্ভাবনা। নিয়োগপত্রে এসব শর্ত দেখেও ঘাবড়াইনি একটুও। বন-বিভাগে চাকরি করতাম ষাট টাকায় এখানে পাব একশো তিরিশ টাকা। দ্বিগুণেরও বেশি। এমন সুবর্ণ সুযোগ কোনো নির্বোধ পায়ে ঠেলে দেয় বলে আমার মনে হয় না। আর যাই হোক, আমি দুপায়ে হাঁটি। জঙ্গলে যারা চার পায়ে হাঁটে, তাদের পরিবেশে থেকে আমার বুদ্ধিটা লোপ পেয়ে যায়নি। সত্তর টাকা বেশি পাব, এ কি যেমন তেমন ব্যাপার। বিয়ে করেছি অল্পদিন। এখন দ্বিগুণ টাকারই দরকার। তাছাড়া জঙ্গল ছেড়ে এসেছি শহরে, হিংস্ৰালয় ছেড়ে লোকালয়ে, আঁধার ছেড়ে আলোকে। এরকম সভ্যসমাজে আসাটাও একটা মস্ত লাভ।
-
হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার আতঙ্কে আকাশ-বাতাস থমথম করছে। দিনের বেলাটা তবু কোনো রকমে কাটে কিন্তু রাতটা আর কাটতে চায় না। ওই বুঝি শাঁখ বাজল, ওই বুঝি ‘বন্দেমাতরম্’! যে-কোনো কোলাহলের সামান্যতম আভাস পেলেই দুড়দুড় করে সবাই ছাদের উপর এসে হাজির হই। প্রায়ই কিছু হয় না, দু-চার মিনিটের মধ্যেই থেমে যায় সব। ঠাণ্ডায় ছাদে বেশিক্ষণ দাঁড়ানোও অসম্ভব, নেবে আসতে হয়। গিন্নি কেবল তদারক করে বেড়ান প্রত্যেক কপাটের প্রত্যেক খিল, প্রত্যেক জানলার প্রত্যেক ছিটকিনি ঠিক আছে কি-না। রাত্রে পালা করে জাগা হয়। এই সুযোগে ‘সুনরি’ দাইও তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তার তাড়িখোর নাকবসা লম্বা স্বামী ফৈজুই এখন আমাদের একমাত্র ভরসা! কারণ
-
‘ভীষণ দাঙ্গা’— বিগত রবিবার রাত্রি অনুমান ৯ ঘটিকার সময় স্থানীয় নবাবপুর পুলের উত্তর পারবর্তী মসজিদের নিকটে হিন্দু ও মুসলমানদিগের মধ্যে ভীষণ দাঙ্গা হইয়া গিয়াছে। সহোদরসম উভয় জাতির মধ্যে কেন পুনরায় এই বৈরিভাব সঞ্চারিত হইয়াছে, তাহার প্রকৃত কারণ আজিও আমরা জানিতে পারি নাই। বঙ্গ বিভাগের আন্দোলনকালে ঢাকার যে হিন্দু মুসলমানকে এক মাতৃগর্ভজাত সন্তানের ন্যায় গলাগলি ধরিয়া কাঁদিতে দেখিয়াছি, আজ সহসা কেন তাহাদের মধ্যে ভাবান্তর উপস্থিত হইল, ইহা বস্তুতই বিশেষ ভাবনার বিষয়। যাহা হউক, ঘটনার বিবরণ যতদূর জানিতে পারা গিয়াছে নিম্নে তাহা সংক্ষেপে বিবৃত হইল। রবিবার সন্ধ্যার পরে শ্রীশ্রী রক্ষাকালীর ভাসান উপলক্ষে শাঁখারি বাজার হইতে সংকীর্তনাদিসহ দেবীমূর্তি বাহির করা হইয়াছিল সংকীর্তনদল নবাবপুর
-
ভারত সরকারে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়ে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম সাহেব অনুভব করেছিলেন যে সরকারের কার্যকলাপের উপর নজর রাখার জন্য ব্রিটেনের মতো ভারতেরও একটি প্রতিনিধি সভা চাই। No taxation without representation—এই নীতি অনুসারে প্রতিনিধিসভা প্রয়োজন। তিনি সরকারি পদ ছেড়ে দিয়ে ভারতের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে তাঁদের নিয়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরজী, বদরুদ্দিন তৈয়বজী প্রমুখ ভারত বিখ্যাত গুণিজন। এঁদের মতে ব্রিটেনের মতো ভারত একটি নেশন। অতএব ব্রিটেনের মতো ভারতেরও একটি পার্লামেন্ট চাই। সেটি হবে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে যাবতীয় ভারতবাসী দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি সমূহের প্রতিষ্ঠান।
স্যর সৈয়দ আহমদ খান ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন অগ্রগণ্য নেতা। তাঁর
-
পেশোয়ার স্টেসন ছাড়বার পর আমি স্বস্তির ধূম্র-নিশ্বাস ফেলে হাঁফ ছাড়লাম। আমার গাড়িতে যারা যাচ্ছে তারা প্রায় সকলেই হিন্দু ও শিখ উদ্বাস্তু ৷ তারা এসেছে পেশোয়ার, হতিমর্দান কোহাট, চারসরা, খাইবার, লাণ্ডি কোটাল, বান্নু, নওসেরা, মানসেরা থেকে, সীমান্ত প্রদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টি রেখে নিপুণভাবে স্টেসন পাহারা দিচ্ছে মিলিটারী অফিসাররা। কিন্তু উদ্বাস্তুরা কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না যে পর্যন্ত না আমি বিচিত্র পঞ্চনদীর দেশের দিকে ধাবমান হওয়ার জন্য পদ-চক্র চালিয়েছি। অন্যান্য পাঠানদের থেকে কিন্তু এই উদ্বাস্তুদের কোনরকমেই আলাদা ক’রে দেখতে পারবে না তুমি। বেশ লম্বা চওড়া সুন্দর শক্ত-সমর্থ লোকগুলো, পড়নে তাদের কুল্লা, লুঙ্গী, সালোয়ার, কথনে রূঢ় পুস্তো ভাষা। প্রত্যেকটি গাড়ির সামনে
-
“রুকমনিআই নি রুকমনিআই।” লাহোরে কাচা চাবুক স্বরণ গলিটায় ঢুকে রুকমনিআইয়ের বন্ধুরা তাকে যেভাবে ডাক দিত, খাঁচার মধ্য থেকে তোতাটাও ঠিক সেভাবেই ডাক দিল। পাখিটার মেজাজ খুশি রাখতে চাইলে রুকমনি অবশ্য তার সে-ডাকে সাড়া দিত, কিন্তু এখন, সে সাড়া দেবার আগেই, পাখিটা আবার তার নাম ধ’রে ডাকাডাকি শুরু করল। অমৃতসরের কাছারিবাড়ির প্রায় পোয়াটাক মাইল দূরে রাস্তাটার পাশে গুড়ি মেরে ব’সে ছিল রুকমনি, পাখিব ডাকে সে কোনো সাড়া দিল না।
“রুকমনিআই নি রুকমনিআই।” তোতাটা আবারও ডাক দিল।
ছোলাভাজা বিক্রি করে যে-লোকটা তার কাছে রুকমনি শুনেছেডিপটি কলাটরএ-রাস্তা ধ’রেই আসেন। রাস্তায় গাড়ির চলাচলের বিরাম নেই, কত টাঙ্গা, কত এক্কা, তার ওপর হাওয়াই
-
যখন পেশোয়ার স্টেশন ছেড়ে আসি তখন আমি তৃপ্তিতে এক দলা ধোঁয়া উগরে তুলেছিলাম। আমার খোপে-খোপে ছিল সব হিন্দু ও শিখ শরাণার্থীরা। তারা এসেছিল পেশোয়ার, হটিমর্দন, কোহাট, চরসরা, খাইবার, লাণ্ডি কোটাল, বানু নওশেরা, মানশেরা ইত্যাদি সীমান্ত প্রদেশের সব জায়গা থেকে। স্টেশনটা খুব সুরক্ষিত ছিল এবং সেনাবাহিনীর অফিসারেরাও খুব সজাগ ও দক্ষ ছিলেন। তবে, যতক্ষণ-না সেই রোমান্টিক পঞ্চনদীর দেশের দিকে আমি রওনা দিচ্ছিলাম, তারা অস্বস্তিতেই ভুগছিল। অন্য আর-পাঁচজন পাঠানের থেকে অবশ্য এই শরণার্থীদের তফাৎ করা যাচ্ছিল না। তাদের চেহারা ছিল বেশ লম্বা ও সুদর্শন, শক্ত গড়নের হাত-পা, পরনে ছিল কুল্লা ও লুঙ্গি, কারো-বা শালোয়ার। তাদের ভাষা ছিল গাঁয়ের পুশতু, প্রত্যেক খোপে দুজন
-
II ১ II
একটা সহজ উপমা দিয়াই আরম্ভ করিব। পিতামাতা ও শিশু পুত্রকন্যা লইয়া একটি সংসার। মনকষাকষি, মান, অভিমান, নালিশ ও ঝগড়া, এমনকি অল্পস্বল্প মারামারিও যে নাই তাহা নয়। তবু পরিবার এক, কারণ উহার কেন্দ্র এক। ঝোঁকের মাথায় যে যাহাই করুক না কেন অবশেষে সকলকেই পথে ফিরিয়া আসিতে হইবে। সৌরজগতে যেমন সকল গ্রহ-উপগ্রহেরই একটা বাঁধা পথ আছে, যাহার বাহিরে যাওয়া কাহারও পক্ষে সম্ভব নয়, তা সে সূর্য হইতে যতই দূরে থাকুক না কেন, আমাদের কল্পিত পরিবারেও তেমনই প্রত্যেকটি ব্যক্তিরই একটি নির্দিষ্ট স্থান ও পথ আছে; এই স্থান ও পথ ছাড়িয়া কেহই থাকিতে বা চলিতে পারে না, কারণ এই পরিবারের জীবিকার
-
৪০ সালে ঢাকা শহরে হিন্দু মুসলমানে যে দাঙ্গা বেধেছিল, তা বছরের পর বছর তুষানলের মতো জ্বলছিল। মাঝে মাঝে সৃষ্টি হচ্ছিল দাবানলের। ধুতি আর লুঙ্গি, সিঁদুরের ফোঁটা আর বোরকাই হয়ে উঠছিল পুরুষ কিংবা স্ত্রীর পরিচয়। দুই তরফের বিত্তশালীদের সঙ্গে সঙ্গে একান্ত গরীবদের মধ্যেও এই সরঞ্জামগুলো মনের মধ্যে পরিচয়ের চিহ্ন হয়ে উঠছিল।
কলেরা আর বসন্তে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর মতোই শেষ পর্যন্ত দেশভাগের চিন্তা দেশের মানুষের মনে বাসা করলো। ভাইয়ে ভাইয়ে এবং ভ্রাতৃবধূতে ভ্রাতৃবধূতে মন কষাকষি ও মুখ দেখা বন্ধের নাটকে পৃথক হবার যে পরামর্শ বিষ ফোড়ার মত সকলের মনকে টনটনিয়ে দেয় সেই পরামর্শে কান পাতলো দেশের বড় বড় বুঝদার নেতারাও। শেষ পর্যন্ত হাড়ি
-
লোকটি খুব তাড়াতাড়ি পল্টনের মাঠ পার হচ্ছিল। বোধহয় ভেবেছিল, লেভেল ক্রসিং-এর কাছ দিয়ে রেলওয়ে ইয়ার্ডে পড়ে নিরাপদে নাজিরাবাজার চলে যাবে। তার হাতের কাছে বা কিছু দূরে একটা লোকও দেখা যায় না—সব শূন্য, মরুভূমির মতো শূন্য। দূরে পিচঢালা পথের ওপর দিয়ে মাঝে মাঝে দুই-একটি সুদৃশ্য মোটরকার হুশ্ করে চলে যায় বটে, কিন্তু এত তীব্র বেগে যায় যে মনে হয় যেন এই মাত্র কেউ তাকেও ছুরি মেরেছে, আর সেই ছোরার ক্ষত হাত দিয়ে চেপে ধরে পাগলের মতো ছুটে চলেছে। নির্জন রাস্তার ওপর মোটর গাড়ির এমনি যাতায়াত আরও ভয়াবহ মনে হয়। দূরে গবর্নর হাউসের গর্বময় গাম্ভীর্য মানুষকে উপহাস করে। পথের পাশে সারি সারি
Page 1 of 1
ক্যাটাগরি
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.