-
একটিবার দৌড় দিতে পারতাম।
এই আফশোসটুকু বারবার নাজেমের মনে আঘাত করতে লাগল।
কিন্তু তা আর এ জন্মে সম্ভব নয়। ডান হাত এবং বাম উরুর দিকে তাকিয়ে নাজেম সিদ্ধান্ত আর একবার মৌরসী করে নিলে। নিজে ঘাড় দুলিয়ে সমর্থন জানাতে অস্ফুট উচচারণের দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্ধকারে গুলি কী ভাবে তার উরুর উপর লাগল সে বুঝতে পারেনি। তবে কি সাবেক অভ্যেস অনুযায়ী সে দাঁড়িয়ে পড়েছিল গুলি চালানোর সময়? “রাইফেল নিয়ে বুকে হামাগুড়ি সহযোগে সব সময় এগোনো বা পেছানো উচিত, যদি শত্রুর এলাকায় এসে পড়ো বা অপারেশান শুরু হয়ে যায়, কখনও দাঁড়াবে না বা হঠাৎ উঠে দৌড়ানোর চেষ্টা করবে না।” ক্যাপ্টেনের কথাগুলো সাঁইসাই নাজেমের
-
স্বাধীনতার দামামার শব্দে উত্তরঙ্গ গোটা বাংলাদেশ।
বাড়ীর উঠানে ঢুকতেই মা হঠাৎ ঘোমটা টেনে বসল। ঝোপ দাড়ীওয়ালা কোন বেগানা মরদ অন্দরে ঢুকে পড়েছে। তৌবা !
লাতু তখনই হো হো শব্দে হেসে উঠল এবং দৌড়ে গিয়ে মাকে বুকে জড়িয়ে ধরল, সাথে সাথে উচ্চারণ “মা আমারে চিনত৷ পারলে না? আমি লাতু—।”
হাউমাউ কান্নাসহ সন্তানকে বুকে চেপে জননী কী যে বলতে লাগল বুঝা গেল না। এই নাটকীয় মঞ্চে তখন আরো দর্শক জুটে গেছে। লাতুর ছোট ছোট দুই বোন, বারো বছরের এক ভাই। তারা হকচকিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ মার কান্না, এক অপরিচিত মিলিটারী যদিও মুক্তিযোদ্ধা, অমন কোলাকুলি। সবই অভাবনীয়। তখনই বাপ জবেদ মিয়া কোথা থেকে যে
-
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে রক্তাক্ত পথ বেয়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৫০ সালের তেভাগা, নানকার, টংকের কৃষক বিদ্রোহ ’৪৮, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫২-এর সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তে রক্তাক্ত মহান একুশের জন্য। ২১ দফার ভিত্তিতে হক, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দীর ’৫৪-তে যুক্তফ্রন্টের ধস নামানো বিজয়, মুসলিম লীগের ভরাডুবি। যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও আমলাতন্ত্রের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। ৫৮’র মার্শাল ল’, জেনারেল আইয়ুবের ক্ষমতা দখল। ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৪-তে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন মাদার এ মিল্লাতের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পূর্ব পাকিস্তানে (আজকের বাংলাদেশ) জনজোয়ার। কিন্তু অপ্রত্যক্ষ নির্বাচনের কারণে অর্থাৎ ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বারদের ভোটে
-
নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত আমি কারাগারে বন্দী ছিলাম। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে কাজ করার পর ১৯৬৭ সালে আমি গ্রেপ্তার হই এবং ১৯৬৯ সালের মহান গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমার এবং অন্যান্য রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি দেশের আনাচে কানাচে ধ্বনিত করে তোলে, সেই পটভূমিতে ফেব্রুয়রি মাসে আমরা মুক্তি পাই। কিন্তু সামরিক শাসন জারি ও ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসার পর ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে আমাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয় । ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পর বন্দীরা রাজশাহী জেল ভেঙ্গে আমাকে বের করে নেয়ার আগে পর্যন্ত আমি আটক ছিলাম। কাজেই উল্লিখিত সময়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে পার্টি ও জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রামে
-
খুলনা শহরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব শেষ হয়ে গেলেও ছাত্রেরা প্রতিরোধ-সংগ্রাম থেকে নিবৃত্ত হয় নি। ২৬-এ মার্চ থেকে শুরু করে ২রা এপ্রিল পর্যন্ত তারা গোপনে নানা জায়গায় পজিশন নিয়ে পাক-সৈন্যদের উপর ইতস্তত চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। এইভাবে তারা বেশ কয়েকজন সৈন্যকে হত্যা ও জখম করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু একথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই গুপ্ত আক্রমণ চালাবার কালে কোনো ছাত্র মারা যায় নি বা শত্রুর হাতে ধরা পড়ে নি।
২৮-এ এপ্রিলের যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী যোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাই বলে তারা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় নি। শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ করবার জন্য তারা বাগেরহাটে গিয়ে মিলিত হলো। বাগেরহাটে প্রাক্তন
-
বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র নয় মাস। নয় মাসের এই যুদ্ধে বাঙালি জাতিকে চরমতম ত্যাগ, দুঃখ, দুর্দশা ও নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। এই নয় মাসে বাংলাদেশে যে গণহত্যাযজ্ঞ ও নারী নির্যাতন হয়েছে স্মরণকালের ইতিহাসে তার নজির নেই। এর পাশাপাশি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকেও স্বীকার করতে হয়েছে চরম পরাজয়। পর্যাপ্ত রসদ ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের আত্মসমর্পণের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে এক অভূতপূর্ব বিজয়, বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের, জাতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেছে বাঙালি।
'৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র নয় মাস স্থায়ী এই মুক্তিযুদ্ধে এত দ্রুত
-
ভিতরগড়ের মোতালেব মিয়ার এক মেয়ে আসিয়া। মোতালেব মিয়া চাষি। আসিয়ার বয়স তখন পনেরো। পাঁচ ভাই-বোন ওরা। সবার বড় মন্টু মিয়া, তারপর আসিয়া। তারপর ফিরোজ, আদিনা ও রেহানা। হালের গোরু নিয়ে প্রতিদিন মাঠে যেত মোতালেব। জমিজমা আছে অল্প। দু' বিঘার মতো হবে। শীতকালে শাক-সবজি হয়। ভিতরগড় থেকে তিন মাইল দূরে সর্দার পাড়ায় ওর বাড়ি। মেয়েদের কড়া শাসন করত বাপ আর দু' ছেলের মাথা খেত আদর দিয়ে। তাদের ছিল প্রচুর স্বাধীনতা আর মেয়েদের ছিল সব রকম পরাধীনতা।
তেরো বছর থেকে আসিয়া বোরকা পরত। আদিনা ও রেহানারা বোরকা পরার বয়স তখনো হয়নি। বোরকা ছাড়া আসিয়া কোথাও বের হতে পারত না। বুড়ি দাদি, খুড়ো
-
একাত্তরের নভেম্বর। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমরা ক’জন মুক্তিযোদ্ধা গ্রামের পথে চলেছি অপারেশনে। হঠাৎ চারপাশ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল গর্জে উঠল, 'হ্যান্ডস আপ, কৌন হ্যায়?' আমাদের দলনেতা এ ধরনের অবস্থার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত। বললেন, 'আপনা আদমি!' 'পাসওয়ার্ড?' 'এসএস ২'। এই গোপন পাসওয়ার্ড আমরা অপারেশনে যাওয়ার আগেই সংগ্রহ করে রেখেছিলাম। ওরা হেসে আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। ঠিক সেই সুযোগে আমাদের স্টেনগানগুলো গর্জে উঠল। ব্রাশফায়ারে এক নিমেষে ১১ পাকিস্তানি সেনা খতম!—তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। মুক্তিযুদ্ধের এই রোমাঞ্চকাহিনি শুনে শিহরিত হয়ে উঠেছিলাম আমি। আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা বলছিলেন। আজ আবার বিজয় দিবস সমাগত। মুক্তিযুদ্ধের সেই কাহিনিটা আজ তাই আবার মনে পড়ছে বলছিল বন্যা।
-
আমার নির্বাচনী এলাকা ছিল রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহকুমার গবিন্দগঞ্জ থানা। আমি ৪ঠা এপ্রিল ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রংপুর কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসে অবস্থান করেছি। এরপর পলাতক অবস্থায় রংপুর ও বগুড়ার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছি। আমি ভারতে যাইনি।আমার এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলগুলোর মাঝে সাইপাল, সাঁতারপাড়া, কাঁটাখালী, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মহিমাগঞ্জ নামক বিখ্যাত বন্দর এলাকাটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এখানকা বিভিন্ন পাটের গুদাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।কাঁটাখালী ব্রীজের কাছে ছিলো পাক বাহিনীর ক্যাম্প। সেখান খেকে তারা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে লোকজন ধরে এনে হত্যা করতো। আমার এলাকায় প্রায় এক থেকে দেড় হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছিল। ছাত্রনেতা লতিফ, আমজাদ নামক জনৈক ব্যক্তি, মাসুম চৌধুরী, প্রবীণ আওয়ামী লীগ
-
ষাট-দশকের শুরুতে যে তরুণ স্কুলের শেষ ক্লাসের ছাত্র, দশকের শেষে সেই তরুণটিই একজন উৎসাহী গল্প-লেখক। এমন ঘটনা আজকের বাঙলাদেশে বিরল নয়। পঞ্চাশের দশকে যাঁরা বাঙলাদেশে সবচেয়ে প্রতিভাবান গল্পকার ছিলেন—পরের দশকে তাঁদের অনেকেই গল্প আর লিখলেন না, কিংবা এমন গল্প লিখলেন যা নতুন পাঠকের কাছে সাড়া তুলতে অক্ষম হলো।
প্রতি দশকেই নতুন একদল গল্পকার সাহিত্য ক্ষেত্রে আবির্ভূত হবেন অথবা গত দশকের গল্পকাররা ম্লান হয়ে যাবেন অবিসংবাদিত নিয়মে—এমন আশা অবাস্তব। ‘কাল তার এ্যালবামে কিছুতে রাখেনা সব ফোটো'—এ নিয়মে সময়ের পরিবর্তনে সাহিত্যের আঙ্গিকেরও হয় রূপান্তর। বিশ শতকের শেষার্ধে জীবন বড় বেশি অস্থির এবং দ্রুত পরিবর্তনের রূপরেখা তার ছাপ রাখছে আমাদের জীবন ও সৃষ্টিতে।
-
পুরনো ছবিগুলো দিনে দিনে আবছা হয়ে আসছিল। অনেক দিনের পুরনো সব ছবি।
পূব বাঙলা এখন বাঙলাদেশ। বাঙলাদেশ আমার জন্মভূমি। সেখানে আমার জীবনের উদ্দাম দুরন্ত দিনগুলো কেটেছিল। সেই স্মৃতি আমার সত্তায় আমি বহন করেছি, সেই স্মৃতির গায়ে এখন শুধু রক্ত।
অনেক সব কথা মনে পড়ে এখন। অনেক মুখ জেগে ওঠে যেন। ঢাকা ছাড়ার কথা মনে পড়ে। দেশভাগ হওয়ার কথা মনে পড়ে। তারপর আর দেশে যাওয়া হয়নি। দেশ তখন বিদেশ।
জন্মভূমি পরভূমি হওয়ার ব্যাপারটা দিনে দিনে সয়ে গিয়েছিল। পুরনো স্মৃতির ওপর নতুন স্মৃতির স্তূপ জমা হচ্ছিল। মাঝে মাঝে ঢাকা ফেরত কোনো বন্ধুর মুখে শুনতাম শহরের গল্প। ঢাকা শহরের দিন বদলের গল্প। মন
ক্যাটাগরি
উৎস
- প্রক্রিয়াধীন
- প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ
- কে আমি?
- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, পঞ্চদশ খণ্ড
- পরিচয়
- মনে রেখো আমাদের, হে বাংলাদেশ
- বাংলাদেশ কথা কয়
- সেকেলে ফ্যাসিবাদ
- বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক পটভূমি
- রক্তাক্ত বাংলা
- আশ্বাস
- বাংলাপুরাণ প্রতিস্বর
- বাংলাদেশের সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন
- সাপ্তাহিক বিচিত্রা
- জীবনের রেলগাড়ি
আর্কাইভ
লেখক
- অজিত চক্রবর্তী (১)
- অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক (২)
- অনু ইসলাম (১)
- অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (৪)
- আবদুল গাফফার চৌধুরী (১)
- আবদুল হাফিজ (১)
- আব্দুল মালেক উকিল (১)
- আমীন আহম্মেদ চৌধুরী (১)
- আশুতোষ ভট্টাচার্য (১)
- আসাদ চৌধুরী (১)
- ইলিয়া এরেনবুর্গ (১)
- কল্লোল বনিক (১)
- কাইফি আজমি (১)
- কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত (১)
- কে জি মুস্তফা (১)
- গজেন্দ্রকুমার মিত্র (১)
- গোপাল হালদার (১)
- গৌরী আইয়ুব দত্ত (১)
- জর্জ হ্যারিসন (১)
- জসীম উদ্দীন মণ্ডল (১)
- জহির রায়হান (২)
- তপন কুমার দে (১)
- তাজউদ্দীন আহমদ (১)
- দাউদ হোসেন (১)
- ধীরাজ কুমার নাথ (২)
- নির্মলেন্দু গুণ (২)
- প্রক্রিয়াধীন (৪৫)
- প্রযোজ্য নয় (১)
- ফকির আলমগীর (২)
- ফেরদৌসী মজুমদার (১)
- বিপ্রদাশ বড়ুয়া (৩)
- বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর (২)
- মণি সিংহ (১)
- মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (২)
- মোহাম্মদ শাহ আলম (১)
- যতীন সরকার (৪)
- রণেশ দাশগুপ্ত (১)
- রিঙ্গো স্টার (১)
- শওকত ওসমান (১১)
- শাহরিয়ার কবির (১)
- সত্যেন সেন (২২)
- সন্তোষ গুপ্ত (১)
- সামিহা সুলতানা অনন্যা (৪)
- সিদ্দিক সালিক (২)
- সিমিন হোসেন রিমি (১)
- সুব্রত বড়ুয়া (২)
- সৈয়দ আনোয়ার হোসেন (১)
- সৈয়দ আলী আহসান (১)
- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (১)
- হায়দার আকবর খান রনো (১)
- হাসান মুরশিদ (৬)
- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১)
- হুমায়ুন আজাদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.