একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ
[এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য চারটি। প্রথমত, একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ব্যাখ্যা। দ্বিতীয়ত, আলোচিত হবে মুক্তিযুদ্ধে সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক। তৃতীয়ত, বিশ্লেষণের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধে বামপন্থী দলগুলোর ভূমিকা। উপসংহারে এই প্রবন্ধের জন্যে তথ্য সংগ্রহে নানাভাবে সাহায্য করেছেন ড. আনোয়ার হোসেন (সহকারী অধ্যাপক, প্রাণ রসায়ণ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), মেজবাহ কামাল (প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ও শাহীন রাজা (এম এ শেষ পর্বের ছাত্র, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অনেক ব্যক্তিত্ব সাক্ষাতকার দিয়ে বাধিত করেছেন। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ।]
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বল্পকালীন স্থায়িত্ব এবং শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সরাসরি অংশগ্রহণ এই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতিকে প্রভাবিত করেছে। ব্যাপক কোন পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই প্রায় নিরস্ত্র বাঙালীকে সেদিন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। পাকিস্তানী সামরিক চক্রের আকস্মিক আক্রমণ ও গণহত্যার মুখে আর কোন বিকল্প ছিল না। এমনি পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের একটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়: প্রথমে সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা; এবং তারপর ব্যাপক সংগঠন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ব্যাপার খুব কমই ঘটেছে যখন ব্যাপক পূর্বপ্রস্তুতি বা সাংগঠনিক তৎপরতা ছাড়াই একটি বিরাট আকারের সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম হয়েছে।[১]প্রাথমিক পর্যায়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত এবং ক্ষুদ্র-খণ্ড প্রতিরোধ হলেও তা ক্রমান্বয়ে একটি জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের আকার ও রূপ গ্রহণ করে। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আর একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। সে সময়ের বাঙালী সমাজে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ‘ইস্যু’-গুলো প্রচণ্ড সামাজিক-রাজনৈতিক টানাপোড়নের সৃষ্টি করেছিল; এবং তার কারণ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মতাদর্শ।
আলোচিত হবে কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ ও ভারতের যোগসাজশে একটি প্রলম্বিত গণযুদ্ধের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি: তাত্ত্বিক কাঠামো
একটি জনগোষ্ঠী কেন বিদ্রোহ করে? কোন পরিস্থিতিতে তাদের জন্যে সশস্ত্র প্রতিরোধ অপরিহার্য হয়? অথবা কোন প্রেক্ষাপটে এমনি প্রতিরোধের প্রচণ্ডতায় তারতম্য দেখা যায়? প্রশ্নগুলোর একটি সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে বের করার জন্যে সমাজবিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন, এবং রচিত হয়েছে অসংখ্য যুক্তি ও তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণাকর্ম।[২]কিন্তু তবুও মনে হয় প্রশ্নগুলোর গভীরে প্রবেশ করা আজও সম্ভব হয়নি বা মেলেনি সঠিক উত্তর। কাজেই গণবিদ্রোহের সঠিক কারণ ও প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত বিতর্ক আজও চলছে। এই গবেষণার সীমাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, যাকে বলা হয় ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারী’ গবেষণার অভাব। বিশেষ করে এক্ষেত্রে প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও আর্থ-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিশ্লেষণমূলক গবেষণার সমন্বয়ে একটি ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারী’ গবেষণা ৷
অবশ্য এ যাবত বিষয়টি নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে, সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে বর্তমান প্রবন্ধের জন্যে একটি তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। মূলত এই কাঠামোর মাধ্যমে আলোচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। নীচের মডেলটি[৩]কাঠামোর বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে:
| গণবিদ্রোহের কারণ | ||
| Intrusion অভিঘাত | Cultural Cores (CC) Relative Deprivation (RD) মৌল সাংস্কৃতিক উপাদান সমূহ। আপেক্ষিক বঞ্চনা। | High Intensity of Collective Violence সমষ্টিগত প্রতিরোধের প্রচণ্ডতম সম্ভাবনা। |
| Intrusion অভিঘাত | Cultural Peripherals (CP) Relative Deprivation (RD) প্রান্তিক সাংস্কৃতিক উপাদান সমূহ। আপেক্ষিক বঞ্চনা। | Low Intensity of Collective Violence সমষ্টিগত প্রতিরোধের অপেক্ষাকৃত কম সম্ভাবনা। |
এখানে কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো, একটি সমাজে প্রতিরোধ বা বিদ্রোহের সূচন৷ হতে পারে দু’ধরনের পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে। প্রথমত, বাইরের কোন শোষণকারী শক্তির নীতি ও কর্মকান্ডের ফলে সেই সমাজের মৌল সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহের (Cultural Cores) ওপর অভিঘাত এলে প্রচণ্ড রকমের সমষ্টিগত প্রতিরোধের সম্ভাবনা থাকে। দ্বিতীয়ত, প্রান্তিক সাংস্কৃতিক উপাদান (Cultural Peripheral) সমূহের ক্ষেত্রে এমনি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে যে প্রতিরোধ জন্ম নেবে তা হয়তে৷ তুলনামূলকভাবে খুব ব্যাপক হবে না, বা দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া হিসেবে গোটা জনগোষ্ঠীকে সমানভাবে আলোড়িত করে একটি মৌল পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে না। মৌল সাংস্কৃতিক উপাদান বলতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments