-
এমন একটি অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, আমাদের সাহিত্য ও শিল্পকলার আলোচনায় যে, স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরেও মুক্তিযুদ্ধের যথাযথ রূপায়ণ অথবা প্রতিফলন হয়নি শিল্প-সাহিত্যে। পৃথিবীর বিখ্যাত বিপ্লবগুলো অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে মহৎ সৃষ্টির পিছনে—ফরাসি বিপ্লব অথবা রুশ বিপ্লবের রয়েছে এক বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার। পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়নি কিন্তু একটি সীমিত ভূগোলে ভয়ানক তোলপাড় তুলেছে তেমন জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনাবলিও জন্ম দিয়েছে ধ্রুপদ সাহিত্যের, প্রাণস্পর্শ শিল্পের। আফ্রিকার দেশগুলোর স্বাধীনতাপ্রাপ্তি, লাতিন আমেরিকার বামপন্থি বিপ্লব অথবা ষাটের দশকে ইউরোপে দ্রুত ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক- আদর্শিক পটপরিবর্তনের উদাহরণ আমাদের জীবনকাল থেকে সংগৃহীত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে যদি সেই নিরিখে বিচার করি আমরা, তাহলে এর বিশালতাকে ওই ঘটনার বহিঃস্থ একজন প্রত্যক্ষদর্শীও
-
দিগন্তে কালো মেঘের ঘনঘটা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আকাশে ঝড়ের পূর্বাভাস স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ফুটে উঠছিল। বিপ্লবী আন্দোলনে গৌরবময় ঐতিহ্য-মণ্ডিত চট্টগ্রাম শহরের মানুষ এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বসঙ্কেত শুনতে পেয়ে ব্যগ্র ও উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষায় দিন গুণে চলছিল।
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্রের দীর্ঘদিনের একটানা শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আহ্বান এসেছে। নেতাদের কাছ থেকে নয়, ছাত্র-জনতার উদ্বেল হৃদয়-সমুদ্র মন্থনের ফলে এই সংগ্রামী আহ্বান পর্যায়ের পর পর্যায় অতিক্রম করে আত্মপ্রকাশ করে চলেছে। মার্চের প্রথম ভাগ থেকেই সারা বাংলাদেশেই মানুষের মনে ঘনঘন উত্তেজনার বিদ্যুৎস্ফুরণ। চট্টগ্রামের মানুষ এ বিষয়ে কারু চেয়ে পেছনে পড়ে নেই। শহর আর শহরবাসীদের চেহারা ও চরিত্র দ্রুতগতিতে বদলে যাচ্ছে। মার্চের প্রথম থেকে এমন
-
আমি আর আমার তিনজন সাথী। আমরা গত ক’দিন ধরে ইয়াহিয়ার শিকারী কুকুরগুলির সন্ধানী দৃষ্টি এড়িয়ে পূর্ববঙ্গের সীমান্ত পেরিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে চলেছি। এসব পথ দিয়ে জীবনে কোনোদিন চলি নি। এসব গ্রামের নামও শুনি নি কোনোদিন। কুমিল্লা জেলার গ্রামাঞ্চল। কুমিল্লা জেলার সীমানা ছাড়িয়ে বর্ডারের ওপারে আগরতলায় যাব। আপাতত এইটুকুই জানি, তারপর কোথায় যাব, কি করব, সে সম্পর্কে কোনোই ধারণা নেই। চলার পথের এপাশে ওপাশে, সামনে পেছনে বন্ধুভাবাপন্ন দরদী মানুষ যথেষ্ট আছে, কিন্তু শত্রুও আছে। শত্রুমিত্র বিচার করতে ভুল হলে মারাত্মক বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে।
আজ সারাটা দিন একটানা হেঁটেছি। খাওয়া জোটে নি পথে, ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। বিকেল বেলা
-
বিক্রমপুরের সুদূর গ্রামাঞ্চলে বসে ভারতীয় বেতারের প্রচারিত সংবাদ শুনছিলাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি সম্পর্কে আকাশবাণী ঘোষণা করছে, ময়মনসিংহ জেলার মধুপুরগড়ে পাক-সৈন্যদলের আর মুক্তিবাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছে।
মধুপুরগড়? চমকে উঠলাম। একসময় এই মধুপুরগড়কে কেন্দ্র করে কতো রোমাঞ্চকর স্মৃতি নিয়ে রোমন্থনই না করেছি। শতাধিক বছর আগে এই মধুপুরগড় আমাদের দেশের রাজনৈতিক আবর্তনের ইতিহাসের পাতায় একটু স্থান করে নিয়েছিল। আজকের দিনে আমাদের কাছে সেই ঐতিহ্য হয়তো তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেদিন এই মধুপুরগড়ে একদল বিদ্রোহীর অভ্যুত্থান সারা বাংলার মানুষের মনে আলোড়ন জাগিয়ে তুলেছিল। সেই বিদ্রোহ আকারে ছোটো হলেও তখনকার দিনের ব্রিটিশ রাজপুরুষরা তাই নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল।
আমি সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের কথা
-
ইয়াহিয়ার জঙ্গী বাহিনী ২৫-এ মার্চ তারিখে পাবনা শহরে এসে ঢুকে পড়ল। শহরের মানুষ আতঙ্কিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল। শীগ্গিরই এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটে যাবে, তারা মনে মনে এই আশঙ্কা করছিল। কিন্তু সেই ঘটনা যে এতো তাড়াতাড়ি ঘটবে, সেটা তারা ভাবতে পারে নি। এই তারিখেই ঢাকা শহরে আক্রমণ শুরু হয়েছিল, কিন্তু সেটা গভীর রাত্রিতে। ওরা ২৫-এ মার্চ শেষ রাত্রিতে পাবনা শহরে এসে হামলা করল।
শহর থেকে মাইল চারেক দূরে হেমায়েতপুরের কাছে ইপসিক (ঊচঝওঈ)-এর অফিস। পাক-সৈন্যরা সেইখানে এসে ঘাঁটি গেড়ে বসল। তারপর সেখান থেকে কিছু সৈন্য শহরে এসে ট্রেজারী দখল করে নিল। তাছাড়া ২৭ জন সৈন্য টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কেন্দ্র দখল করে বসল।
-
পাক-সৈন্যরা বরিশাল জেলার উপর এসে হামলা করল অনেক পরে, এপ্রিল মাসের শেষের দিকে। বরিশাল জেলার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এই জেলার কোথাও রেলপথের যোগাযোগ নেই। প্রধানত জলপথের সাহায্যেই তাকে অন্যান্য জেলার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। একমাত্র ফরিদপুর জেলার সঙ্গে তার স্থলপথে যোগাযোগ রয়েছে। বরিশাল জেলায় আক্রমণ চালাতে হলে পাক-সৈন্যদের হয় নদীপথে, নয়তো স্থলপথে ফরিদপুর জেলার মধ্য দিয়ে আসতে হবে।
বরিশালের গৌরনদী থানা ফরিদপুরের সীমান্তবর্তী থানা। শত্রুরা যদি বরিশাল শহর দখল করবার জন্য স্থলপথে আসে, তবে তাদের এই থানা-অঞ্চলের উপর দিয়ে যেতে হবে; সুতরাং তাদের প্রতিরোধ করবার প্রথম দায়িত্ব গৌরনদী থানার অধিবাসীদের উপরই এসে পড়বে। শত্রুর হাত থেকে
-
২৫-এ মার্চ থেকে শুরু হলো ওদের আক্রমণ। ওদের নিশাচর বাহিনী গভীর রাত্রিতে অতর্কিতে ঢাকা শহরে হিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল, সারা শহর রক্তের প্লাবনে প্লাবিত করে দিল। সেই আক্রমণের ঢল দ্রুতবেগে নেমে এলো, দেখতে দেখতে সারা প্রদেশময় ছড়িয়ে পড়ল। এই ধরনের পৈশাচিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। ওদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়াবার মতো প্রস্তুতিও গড়ে ওঠে নি। ওরা ধ্বংসের আগুনে শহরের পর শহর আর গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করতে করতে এগিয়ে চলল। ওদের কামান, মেসিনগান আর আধুনিক যুগের উন্নত ধরনের মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে যা দিয়ে লড়াই করবে, এমন কি হাতিয়ার আছে জনসাধারণের হাতে?
তাহলেও বিদ্রোহী বাঙালি এই
-
মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের চর এসে সংবাদ দিল, সামরিক ভ্যান-বোঝাই একদল পাক-সৈন্য ফেনী থেকে চন্দ্রগঞ্জের দিকে আসছে। ওদের যখন চন্দ্রগঞ্জের দিকে রোখ পড়েছে, তখন ওরা সেখানে লুটপাট না করে ছাড়বে না। খবর পেয়ে লাফিয়ে উঠলেন সুবেদার লুৎফর রহমান। বেঙ্গল রেজিমেন্টের লুৎফর রহমান, যিনি এই অঞ্চলে একটি মুক্তিবাহিনী গঠন করেছিলেণ। সৈন্যদের সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাট জনের মতো হবে। এদের প্রতিরোধ করতে হলে দলে কিছুটা ভারী হয়ে নেওয়া দরকার। খোঁজ-খবর করে অল্প সময়ের মধ্যে মাত্র ছয় জন মুক্তিযোদ্ধাকে জড় করা গেল।
সাতজন মানুষ, সাতটি রাইফেল। এই সামান্য শক্তি নিয়ে ওদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে যাওয়াটা ঠিক হবে কি? মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন এই প্রশ্নটা তুলেছিলেন। কথাটা মিথ্যা
-
চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধের পর সুবেদার লুৎফর রহমান নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিকারের সন্ধানে ছুটে চলেছিলেন। তাঁর এক মুহূর্তও বিশ্রামের অবকাশ নেই। তিনি পাক-সৈন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে দক্ষ শিকারীর মতো তীক্ষè সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে ফিরছিলেন। মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচরেরা নিত্য নতুন সংবাদ নিয়ে আসছে। আর সেই সূত্র অনুসরণ করে তাদের মুক্তিবাহিনী যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই শত্রুদের উপর ঘা দিয়ে চলেছে।
আঘাতের পর আঘাত হানো-কখনও ডাইনে কখনও বাঁয়ে, কখনও সামনে থেকে, কখনও বা পেছন থেকে। ওদের অস্থির আর পাগল করে তোলো। ওদের কোনো সময় স্বস্তিতে বা শান্তিতে থাকতে দিও না, ওদের প্রতিটি মুহূর্ত দুর্ভাবনায় কাটুক। ওরা যেন ঘুমের মধ্যেও দুঃস্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠে। মুক্তিবাহিনী এই নীতি অনুসরণ
-
যারা যাত্রাপথের খবর নিতে গিয়েছিল রণজিৎ তাদের মধ্যে একজন। বারহাট্টা থেকে দশধার, বাউসি হয়ে আরো দশ মাইল পর্যন্ত ঘুরে এসেছে ওরা—ওরা মানে মাণিক, দীপক, রামেন্দু, সদর আলী, কাদির এবং রণজিৎ। কাল সকালে সবাই যে-পথে রওনা দেবে আগে থেকেই সে পথের হাল অবস্থা সরেজমিনে দেখে আসার জন্যে ওরা গিয়েছিল সেই সন্ধ্যের দিকে—লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে, স্থানীয় লোকদের সাহায্য-সহানুভূতির কথা বলে ফিরতে ফিরতে তখন প্রায় শেষ রাত। বারহাট্টায় ফিরে এসে দেখল আশপাশের গ্রাম থেকে আরো অনেকেই এসে জড় হয়েছে রাতের অন্ধকারে। সাহাদের পাটের গুদাম, দোকানঘর, বাসার বারান্দাগুলো—সব জায়গায় কেবল লোক গিজগিজ করছে। ওরা ফিরতেই চারদিক থেকে ঘিরে ধরল সবে। ‘কি খবর নিয়ে
-
ফুলবানুকে ও দেখে, প্রাণভরে দেখে। কেমন একটা ফুলের মতন মেয়ে। বুকে চেপে ধরলে মনে হয় ফুলবানু বুঝি বুকের ভেতরটায় ঢুকে পড়বে। ফুলবানুও কেমন যেন সুযোগ বুঝে শরীরটাকে একেবারে ছেড়ে দেয়, এলোমেলো হয়ে যায়। কদম আলী দু’চোখ বন্ধ করলে সব দেখতে পায়। ফুলবানু চোখ বন্ধ করে থাকে, ভালবাসা ওকে এতটুকু করে দেয়, আরো নরম আরো পেলব করে দেয়। কোথা দিয়ে যে কী হয়, ফুলবানু বুঝতে পারে না। কদম আলী অনুভব করে। ফুলবানু প্রেমের সুখে কথা কয় না। মুখ তোলে না। বুকের ভেতর মাথাটা ঢুকিয়ে একেবারে নিশ্চুপ থাকে। একদিন ও বলে, ফুলবানু, গরীবের ঘরে তোকে মানায় না, বুঝলি, একেবারে মানায় না।
ফুলবানু
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অজিত চক্রবর্তী (১)
- অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক (২)
- অনু ইসলাম (১)
- অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (৪)
- আবদুল গাফফার চৌধুরী (১)
- আবদুল হাফিজ (১)
- আমীন আহম্মেদ চৌধুরী (১)
- আশুতোষ ভট্টাচার্য (১)
- আসাদ চৌধুরী (১)
- ইলিয়া এরেনবুর্গ (১)
- কল্লোল বনিক (১)
- কাইফি আজমি (১)
- কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত (১)
- কে জি মুস্তফা (১)
- গজেন্দ্রকুমার মিত্র (১)
- গোপাল হালদার (১)
- গৌরী আইয়ুব দত্ত (১)
- জর্জ হ্যারিসন (১)
- জসীম উদ্দীন মণ্ডল (১)
- জহির রায়হান (২)
- তপন কুমার দে (১)
- তাজউদ্দীন আহমদ (১)
- দাউদ হোসেন (১)
- ধীরাজ কুমার নাথ (২)
- নির্মলেন্দু গুণ (২)
- প্রক্রিয়াধীন (৪১)
- প্রযোজ্য নয় (১)
- ফকির আলমগীর (২)
- ফেরদৌসী মজুমদার (১)
- বিপ্রদাশ বড়ুয়া (৩)
- বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর (১)
- মণি সিংহ (১)
- মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (২)
- মোহাম্মদ শাহ আলম (১)
- যতীন সরকার (৪)
- রণেশ দাশগুপ্ত (১)
- রিঙ্গো স্টার (১)
- শওকত ওসমান (১)
- শাহরিয়ার কবির (১)
- সত্যেন সেন (২২)
- সন্তোষ গুপ্ত (১)
- সামিহা সুলতানা অনন্যা (৪)
- সিদ্দিক সালিক (২)
- সিমিন হোসেন রিমি (১)
- সুব্রত বড়ুয়া (২)
- সৈয়দ আনোয়ার হোসেন (১)
- সৈয়দ আলী আহসান (১)
- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (১)
- হায়দার আকবর খান রনো (১)
- হাসান মুরশিদ (৬)
- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১)
- হুমায়ুন আজাদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.