-
দুর্গার এক নাম ‘পার্বতী’, অর্থাৎ, পর্বতের মেয়ে। তাঁর পিতা হিমালয়, মা মেনকা। শিবের সঙ্গে যাতে তাঁর বিয়ে হয় এজন্য পার্বতী অনেক দিন ধরে কঠিন তপস্যা করেছিলেন, তার ফলে শেষে শিবের সঙ্গেই তাঁর বিয়ে হল।
পার্বতীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব তাঁকে বিবাহ করতে চাইলেন। কিন্তু বর যে, সে তো আর নিজে কনের বাপের কাছে গিয়ে বিয়ে ঠিক করতে পারে না, তাহলে লোকে হাসে। কাজেই শিব সপ্তর্ষিদের ডেকে পাঠালেন। সপ্তর্ষিরাও তখনই সোনার বল্কল পরে, মুক্তামালা গলায় দিয়ে, মণি-মানিকের গহনা ঝলমলিয়ে তাঁর কাছে এসে জোড় হাতে বললেন, ‘আমাদের কী সৌভাগ্য! প্রভু আজ আমাদের স্মরণ করেছেন। আজ্ঞা করুন, আমাদের এখন কী করতে হবে।’
শিব
-
একটা ভারি ভয়ঙ্কর অসুর ছিল। সে মহিষ সাজিয়া বেড়াইত, তাই সকলে তাহাকে বলিত মহিষাসুর।
দেবতারা কিছুতেই মহিষাসুরের সহিত আঁটিয়া উঠিতে পারিতেন না। একশত বৎসর ধরিয়া তাঁহারা তাহার সহিত যুদ্ধ করিলেন। তাহাতে সে তাঁহাদিগকে হারাইয়া স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়া নিজে আসিয়া ইন্দ্র হইল।
দেবতারা তখন আর কী করেন? তাঁহারা ব্রহ্মাকে সঙ্গে করিয়া মহাদেব আর বিষ্ণুর নিকটে গিয়া উপস্থিত হইলেন, বলিলেন, ‘হে প্রভু, মহিষাসুর তো আমাদের বড়ই দুর্দশা করিয়াছে, আমাদিগকে যুদ্ধে হারাইয়া স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়াছে; এখন আপনারা যদি আমাদের রক্ষা না করেন, তবে আমাদের উপায় কী হইবে?’
অসুরদের অত্যাচারের কথা শুনিয়া শিব ও বিষ্ণুর বড়ই রাগ হইল। সেই রাগে তাঁহাদের আর
-
শুম্ভ আর তাহার ভাই নিশুম্ভ, এই দুটো অসুর দেবতাদিগকে বড়ই নাকাল করিয়াছিল। তাহারা তাঁহাদিগকে স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়া আর অস্ত্র-শস্ত্র কাড়িয়া লইয়াই সন্তুষ্ট থাকে নাই, তাঁহাদের ব্যবসায় পর্যন্ত নিজেরা করিতে আরম্ভ করিল। চন্দ্র, সূর্য, কুবের, পবন, অগ্নি কাহারও ব্যবসাই তাঁহাদের হাতে রাখিল না।
বিপাকে পড়িয়া দেবতারা বলিলেন, ‘আর কাহার কাছে যাইব! মহিষাসুরের হাত হইতে যে দেবী আমাদিগকে বাঁচাইয়াছিলেন সেই চণ্ডিকা দেবীকেই ডাকি।’ এই বলিয়া তাঁহারা হিমালয় পর্বতে গিয়া চণ্ডিকা দেবীর স্তব করিতে লাগিলেন। সেই সময় পার্বতী সেই পথে যাইতেছিলেন, তিনি দেবতাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আপনারা কাহার স্তব করিতেছেন?’ তাঁহার কথা শেষ হইতে না হইতেই তাঁহার শরীর হইতে চন্ডিকা দেবী বাহির হইয়া
-
শিবের সঙ্গে যখন পার্বতীর বিবাহ হইল তখন পার্বতী কৈলাস পর্বতে আসিয়া ঘরকন্না করিতে লাগিলেন। শিব খেয়ালশূন্য লোক, তাহাতে আবার ভূতের দল নিয়া থাকিতেন—মেয়েরা বাড়িতে থাকিলে কেমন করিয়া চলাফেরা করিতে হয় সেদিকে তাঁহার নজর একটু কম। যখন-তখন তিনি তাঁহার ভূতদের নিয়া বাড়ির ভিতর আসিয়া উপস্থিত হন, পার্বতী আর তাঁর সখীদের তাহাতে বড় অসুবিধা হয়। দারোয়ান নন্দী তাঁহাকে মানা করিলেও তিনি তাহা শোনেন না, তাঁহাকে ধমকাইয়া ঠিক করিয়া দেন।
পার্বতীর সখী জয়া আর বিজয়া ক্রমাগত বলেন, ‘ইহারা সকলেই শিবের লোক, কাজেই তাঁহার ধমকে ভয় পায়। আমাদের নিজের একটি ভাল লোক হইলে বেশ ভাল হইত।’ এ কথায় পার্বতী কাদা দিয়া যারপরনাই সুন্দর একটা
-
ইক্ষবাকু বংশে সগর নামে একজন অতি প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। বীরত্বে তাঁহার সমান আর সেকালে কোন রাজাই ছিলেন না। রূপে, গুণে, বিদ্যায়, সব বিষয়েই তিনি সুখী ছিলেন, কেবল এক বিষয়ে তাঁহার বড়ই দুঃখ ছিল, তাঁহার পুত্র ছিল না। পুত্র-লাভের জন্য তিনি তাঁহার বৈদর্ভী এবং শৈব্যা নাম্নী দুই রানীকে লইয়া কৈলাস পর্বতে গিয়া কঠিন তপস্যা আরম্ভ করিলেন। কিছুদিন পরে শিব রাজার তপস্যায় ভুষ্ট হইয়া তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, ‘মহারাজ, তুমি কী চাও?’
রাজা ভক্তিভরে শিবকে প্রণাম করিয়া জোড়হাতে বলিলেন, ‘ভগবান, আমার পুত্র নাই। আমার মৃত্যুর পর আমার বিশাল সাম্রাজ্য ভোগ করিবার লোক থাকিবে না, আমার বংশ লোপ হইয়া যাইবে। সুতরাং যদি আমার
-
দধীচি মুনির নাম হয়ত তোমরা অনেকেই শুনিয়াছ। তাঁহার মতন তপস্যা অতি অল্প লোকেই করিয়াছে। মহর্ষি দধীচি অতিশয় শান্ত আর পরম দয়ালু ছিলেন। গঙ্গার ধারে নিজের আশ্রমে থাকিয়া পত্নী প্রাতিথেয়ীকে লইয়া ভগবানের নাম করা, গাছপালার প্রতি যত্ন, সকল জীবে দয়া আর অতিথি আসিলে তাহার সেবা করা, এ সকল ছাড়া তাঁহার আর কাজ ছিল না। কিন্তু এই নিরীহ লোকটির তপস্যার এমনি তেজ ছিল যে, তাহার ভয়ে অসুরেরা তাহার আশ্রমের কাছে আসিতেই থর থর করিয়া কাঁপিত। অথচ দেবতাদিগকে সেই অসুরেরা জ্বালাতনের একশেষ করিত। কতকাল ধরিয়া যে ইহাদের যুদ্ধ চলিয়াছিল তাহার ঠিকানাই নাই। সেই যুদ্ধে কখনও দেবতারা জিতিতেন, কখনও বা অসুরদিগের নিকট হারিয়া বিধিমত
-
এক
একবার মহামুনি কশ্যপ পুত্রলাভের জন্য খুব ঘটা করিয়া যজ্ঞ করিতেছিলেন। দেবতা মুনিগণ সকলে মিলিয়া সেই যজ্ঞে কাজ করিতে আসেন।
যজ্ঞের সকল কাজ ইহাদের মধ্যে বাঁটিয়া দেওয়া হইল। যাঁহারা কাঠ আনিবার ভার পাইলেন, ইন্দ্র তাঁহাদের মধ্যে একজন। ইহাদের মধ্যে বালখিল্য নামক একদল মুনিও ছিলেন।
এই বালখিল্যদিগের মতন আশ্চর্য মুনি আর কখনো হইয়াছে কিনা সন্দেহ। দেখিতে ইহারা নিতান্তই ছোট-ছোট ছিলেন। কত ছোট, তাহা আমি ঠিক করিয়া বলিতে পারিব না। কেহ বলিয়াছেন যে তাঁহারা অঙ্গুষ্ঠ-পরিমাণ, অর্থাৎ বুড়ো আঙ্গুলের মতো ছোট্ট ছিলেন। কিন্তু এ কথা যে একবারে ঠিক নয়, তাহার প্রমাণ এই একটা ঘটনাতেই পাওয়া যাইতেছে।
ইহাদের দলে কয়জন ছিলেন জানি না। কিন্তু
-
জন্তুকে না দেখিয়া কেবলমাত্র তাহার শব্দ শুনিয়াই যে তাহাকে তীর দিয়া বিঁধিতে পারে, তাহাকে বলে ‘শব্দবেধী’।
রাজা দশরথ একরূপ ‘শব্দবেধী’ ছিলেন। যুবা বয়সে অনেক সময় তিনি রাত্রিতে বনে গিয়া এইরূপে কত হাতি, মহিষ, হরিণ শিকার করিতেন। বর্ষার রাত্রে তীরধনুক লইয়া চুপিচুপি সরযূর ধারে বসিয়া থাকিতে তাঁহার বড়ই ভাল লাগিত। নদীর ঘাটে নানারূপ জন্তু জল খাইতে আসিত; সেই জলপানের শব্দ একটিবার দশরথের কানে গেলে আর সে জন্তুকে ঘরে ফিরিতে হইত না।
একবার এইরূপ বর্ষার রাত্রিতে দশরথ সরযূর ধারে তীর ধনুক লইয়া বসিয়া আছেন, মনে আর কোন চিন্তা নাই, জানোয়ারের শব্দ শোনা যাইবে। ভোর হইতে আর বেশি বাকি নাই। খালি কান পাতিয়া
-
(১) কোন বেদনায় নিলাম বিদায়
কোন বেদনায় নিলাম বিদায় ‘দিলজানী’ আর দিল জানে
বদ-নসিবের দানাদানি টানছে সে কোন দূর টানে॥
তোমার সিঁথির মতির মতন নজর দেবো অশ্রু বুঁদ।
সেই দূতীরে, সালাম তোমার পৌঁছাবে যে মোর পানে॥
এসো প্রিয়া, আশিস মাগি, আমার সাথে হাত ওঠাও,
তোমার প্রাণে বিশ্বাস আসে, আসেন খোদা মোর ত্রাণে॥
মোদের পরে জুলুম যদি করেই জাগে ঈর্ষাতুর,
ভয় কী সখী, মোদের খোদা শোধ নেবে তার সেইখানে॥
তোমার শিরের কসম শিরিঁ তোমার নেশা টুটবে না,
যদিই ‘তামাম জাহান’ জুটে শির পরে মোর তির হানে॥
জান কি সই, কেনই আমায় ফেরায় গ্রহ দিগ্বিদিক?
তোমার পানে মন টানে মোর, ঈর্ষা জাগে
-
আইনস্টাইন-রবীন্দ্রনাথ সংলাপ একটি বহুল আলোচিত বিষয়। সে সম্পর্কে কৌতুহল থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। দুজনেই বিশ্ব ইতিহাস বিখ্যাত। একজন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আরেকজন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য প্রতিভার অন্যতম। বয়েসের দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বড়। আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্ভবত কয়েকবার দেখা হয়েছিল। দুইবারের সাক্ষাৎ ও কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছিল। টেপ রেকর্ডে নয়। দোভাষী দিমিত্রি মারিয়ানফ যেভাবে লিখে রেখেছিলেন, সেইভাবেই তা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথমবার ১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই বার্লিনের উপকণ্ঠে কাপুথে। পরেরবার একই বৎসর ১৯ আগস্ট বার্লিনে। দুইবারই রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের অতিথি। আইনস্টাইন বলেছেন জার্মান ভাষায়, রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে। প্রথমবারের সংলাপ, যা দোভাষী রেকর্ড করেছিলেন তাই-ই ছাপা হয়েছিল একই বৎসরে আগস্ট মাসে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়।
-
সম্প্রতি আমাদের দেশে সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য যথেষ্ট আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে, এই আগ্রহ রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে এক প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতার পরিচায়ক। সামাজিক ইতিহাসের সমস্যা সম্বন্ধে এবং এই জাতীয় ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে গবেষকের যে-সকল মৌলিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়, তাদের সম্বন্ধে, আমাদের চেতনা কতটা প্রখর, সে কথা বুঝতে পারা যায় না; কেননা আমাদের দেশের পণ্ডিতগণ আজ পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন নি। প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ ও বর্তমান যুগ-কাল-বিভাজনের এই কাঠামো ইয়োরোপের ইতিহাস থেকে ধার করা। এই কালবিভাগ ইয়োরোপের ইতিহাসে বিশেষ অর্থ বহন করে এবং এই ধরনের কালবিভাগ ইয়োরোপীয় অর্থে এদেশের ইতিহাসের প্রতি আদৌ
-
[চার্লস্ ডিকেন্স্ ইংরাজী-সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ঔপন্যাসিক। আমাদের দেশের এক বঙ্কিমচন্দ্রকে এঁর সঙ্গে খানিকটা তুলনা করা যায়, তা ছাড়া আজ অবধি আমাদের দেশে এমন কোনও ঔপন্যাসিক জন্মাননি যাঁকে মনে করে ডিকেন্সের ক্ষমতার কথা বুঝতে পারবে। অন্য কোন দেশেও এতখানি ক্ষমতাশালী ঔপন্যাসিক আর জন্মেছেন কিনা সন্দেহ ৷
ডিকেন্স্-এর উপন্যাসের মধ্যে ডেভিড কপারফীল্ডই শ্রেষ্ঠ, একথা আরও অনেক সমালোচকের সঙ্গে ডিকেন্স্ নিজেও মেনে নিয়েছিলেন। এর সম্বন্ধে আরও একটা কথা বলবার আছে এই যে বইটির প্রথম দিকে ডিকেন্স্-এর নিজের জীবনেরও খানিকটা ছায়া আসে।
ডিকেন্স্-এর বাবা ছিলেন অত্যন্ত উড়নচণ্ডে, তার জন্য সমস্ত বাল্যকাল তাঁর কেটেছিল অতিরিক্ত অর্থকৃচ্ছতার মধ্যে। বাল্যকালেই চাকরীতে ঢুকতে হয়েছিল তাঁকে, যদিও সে চাকুরী
ক্যাটাগরি
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.