জরৎকারুর কথা
জরৎকারু মুনি সর্বদাই কঠিন তপস্যায় ব্যস্ত থাকিতেন। বিবাহ বা সংসারের অন্য কোনো কাজ করার ইচ্ছা তাঁহার একেবারেই ছিল না। তপস্যা করিয়া আর তীর্থে স্নান করিয়া তিনি পৃথিবীময় ঘুরিয়া বেড়াইতেন। ঘর, বাড়ি কিছুই তাঁহার ছিল না, যেখানে রাত্রি হইত, সেখানেই নিদ্রা যাইতেন। এমন লোককে ধরিয়া আনিয়া বিবাহ করাইয়া দেওয়া কি সহজ কাজ। এ কাজ হওয়ার কোনো উপায়ই ছিল না, যদি ইহার মধ্যে একটি আশ্চর্য ঘটনা না হইত। ঘটনাটি এই—জরৎকারু নানাস্থানে ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন দেখিলেন যে, একটা ভয়কর অন্ধকার গর্তের মুখে কয়েকটি নিতান্ত দীন-হীন, রোগা হাড্ডিসার মানুষ একগাছি খস্খসের শিকড় ধরিয়া ঝুলিতেছে। উহাদের পা উপর দিকে, মাথা নীচের দিকে। একটা ইঁদুর ক্রমাগত সেই খস্খসের শিকড়খানিকে কাটিয়া, উহার একটি আঁশ মাত্র বাকি রাখিয়াছে, সেটুকু কাটা গেলেই বেচারারা গর্তের ভিতরে পড়িয়া যাইবে। ইহাদিগকে দেখিয়া জরৎকারুর বড়ই দয়া হওয়াতে, তিনি বলিলেন, ‘আহা। আপনাদের অবস্থা দেখিয়া আমার বড়ই কষ্ট হইতেছে! আপনারা কে? আর, কি করিয়াই বা আপনাদের এমন কষ্টের অবস্থা হইল? আমি কি আপনাদের কোনো উপকার করিতে পারি?’
সেই লোকগুলি বলিলেন, ‘আমাদিগকে দেখিয়া তোমার দুঃখ হইয়াছে বটে, কিন্তু আমাদের দুঃখ দূর করা বড়ই কঠিন দেখিতেছি। আমরা যাযাবর নামক ঋষি। আমরা কেহ কোনো পাপ করি নাই, কেবল আমাদের বংশ লোপ হওয়ার গতিক হওয়াতেই আমাদের এই দুর্দশা। আমাদের বংশে এখনো একটি লোক আছে, উহার নাম জরৎকারু। জরৎকারু বাঁচিয়া আছে বলিয়াই আমরা এখনো কোনোমতে এই খস্খসের শিকড়টুকু ধরিয়া টিকিয়া আছি। উহার মৃত্যু হইলেই শিকড়টি ছিঁড়িয়া যাইবে, আর আমরাও এই গর্তের ভিতরে পড়িয়া যাইব। সে মূর্খ কেবল তপস্যা করিয়াই বেড়ায়, কিন্তু তাহার তপস্যায় আমাদের কি ফল হইবে? তাহার চেয়ে সে যদি বিবাহ করিত আর তাহার পুত্রপৌত্র হইত, তবে আমরা এই বিপদ হইতে রক্ষা পাইতাম। বৎস, আমাদের দশা দেখিয়া তোমার দয়া হইয়াছে, তাই বলি, যদি সেই হতভাগ্যের সহিত তোমার দেখা হয়, তবে দয়া করিয়া আমাদের কথা তাহাকে বলিও।’
হায়, কি কষ্টের কথা। পূর্বপুরুষরা এমন ভয়ানক কষ্টে পড়িয়াছেন, আর সেই কষ্টের কারণ জরৎকারু নিজে। এ কথা ভাবিয়া তিনি যারপরনাই দুঃখের সহিত কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন, ‘হে মহর্ষিগণ, আপনারা আমারই পূর্বপুরুষ। আমিই দুরাত্মা হতভাগ্য জরৎকারু। আমার অপরাধের সীমা নাই। সেজন্য আমাকে উচিত শাস্তি দিন। আর বলুন, আমি কি করিব।’
ইহাতে পূর্বপুরুষেরা কহিলেন, ‘তুমি বিবাহ কর।’
জরৎকারু বলিলেন, ‘আচ্ছা, আমি বিবাহ করিব, কিন্তু ইহার মধ্যে দুটি কথা আছে। মেয়েটির আমার নামে নাম হওয়া চাই। আর, বিবাহের পর স্ত্রীকে খাইতেও দিতে পারিব না। ইহাতে যদি আমার বিবাহ জোটে, তবেই বিবাহ করিব, নচেৎ নহে।’
এই বলিয়া জরৎকারু বিবাহের জন্য মেয়ে খুঁজিতে লাগিলেন। একে বুড়া, তাহাতে গরিব। স্ত্রীকে খাইতে পরিতে দিতে পারিবে না, কুঁড়েঘরখানি পর্যন্ত নাই যে তাহাতে নিয়া তাহাকে রাখিবে। এমন বরকে মেয়ে দিতে বোধ হয় বাঘ-ভালুকেও রাজি হয় না—মানুষ তো দূরের কথা। মুনি দেশ-বিদেশে খুঁজিয়া হয়রান হইলেন, কোথাও মেয়ে পাইলেন না। তখন পূর্বপুরুষদের কথা মনে করিয়া তাঁহার নিতান্ত কষ্ট হওয়াতে, তিনি এক বনের ভিতরে গিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। কাঁদিতে কাঁদিতে তিনি বলিলেন, ‘এখানে যদি কেহ থাক, তবে শোন। আমি যাযাবর-বংশের তপস্বী, নাম জরৎকারু। পূর্বপুরুষদিগের আজ্ঞায় আমি বিবাহ করিতে চাহিতেছি, কিন্তু কিছুতেই কন্যা জুটিতেছে না। যদি তোমাদের কাহারও নিকট কন্যা থাকে, আর যদি তাহার আমার নামে নাম হয়, আর যদি আমায় টাকা না দিতে হয়, আর মেয়েকেও খাইতে-পরিতে দিতে না হয়, তবে নিয়া আইস, আমি তাহাকে বিবাহ করিব।’
এদিকে হইয়াছে কি—বাসুকির লোকেরা সেই তখন হইতেই জরৎকারুকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments