-
দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের ভয়ানক শত্রুতা ছিল। দিনরাতই কেবল ইহাদের মারামারি চলিত, তাহাতে অনেক সময় অসুররাও হারিত, অনেক সময় দেবতারাও হারিতেন। দেবতারা অসুরদের জালায় অস্থির থাকিতেন; আবার অসুরেরা তপস্যা করিলে তাহাদিগকে বর না দিয়াও পারিতেন না। বর দিয়া তারপর তাহার ধাক্কা সামলাইতে তাহাদের প্রাণান্ত হইত।
একটা অসুর ছিল, তাহার নাম ময়। জাদু, মায়া, ভেলকিবাজি যত আছে ময় তাহার সকলই জানিত, আর তাহার জোরে সময় সময় দেবতাদিগকে সে ভারি নাকাল করিত।
একবার যুদ্ধে হারিয়া ময় তপস্যা করিতে লাগিল। বিদ্যুন্মালী আর তারক নামে আর দুই অসুরও তাহার দেখাদেখি তপস্যা আরম্ভ করিল। তাহার উপবাস করিয়া, শীতে ভূগিয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া এমনি তপস্যা করিল যে, ব্রহ্মা
-
একটা ভারি ভয়ঙ্কর অসুর ছিল। সে মহিষ সাজিয়া বেড়াইত, তাই সকলে তাহাকে বলিত মহিষাসুর।
দেবতারা কিছুতেই মহিষাসুরের সহিত আঁটিয়া উঠিতে পারিতেন না। একশত বৎসর ধরিয়া তাঁহারা তাহার সহিত যুদ্ধ করিলেন। তাহাতে সে তাঁহাদিগকে হারাইয়া স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়া নিজে আসিয়া ইন্দ্র হইল।
দেবতারা তখন আর কী করেন? তাঁহারা ব্রহ্মাকে সঙ্গে করিয়া মহাদেব আর বিষ্ণুর নিকটে গিয়া উপস্থিত হইলেন, বলিলেন, ‘হে প্রভু, মহিষাসুর তো আমাদের বড়ই দুর্দশা করিয়াছে, আমাদিগকে যুদ্ধে হারাইয়া স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়াছে; এখন আপনারা যদি আমাদের রক্ষা না করেন, তবে আমাদের উপায় কী হইবে?’
অসুরদের অত্যাচারের কথা শুনিয়া শিব ও বিষ্ণুর বড়ই রাগ হইল। সেই রাগে তাঁহাদের আর
-
শুম্ভ আর তাহার ভাই নিশুম্ভ, এই দুটো অসুর দেবতাদিগকে বড়ই নাকাল করিয়াছিল। তাহারা তাঁহাদিগকে স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়া আর অস্ত্র-শস্ত্র কাড়িয়া লইয়াই সন্তুষ্ট থাকে নাই, তাঁহাদের ব্যবসায় পর্যন্ত নিজেরা করিতে আরম্ভ করিল। চন্দ্র, সূর্য, কুবের, পবন, অগ্নি কাহারও ব্যবসাই তাঁহাদের হাতে রাখিল না।
বিপাকে পড়িয়া দেবতারা বলিলেন, ‘আর কাহার কাছে যাইব! মহিষাসুরের হাত হইতে যে দেবী আমাদিগকে বাঁচাইয়াছিলেন সেই চণ্ডিকা দেবীকেই ডাকি।’ এই বলিয়া তাঁহারা হিমালয় পর্বতে গিয়া চণ্ডিকা দেবীর স্তব করিতে লাগিলেন। সেই সময় পার্বতী সেই পথে যাইতেছিলেন, তিনি দেবতাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আপনারা কাহার স্তব করিতেছেন?’ তাঁহার কথা শেষ হইতে না হইতেই তাঁহার শরীর হইতে চন্ডিকা দেবী বাহির হইয়া
-
শিবের সঙ্গে যখন পার্বতীর বিবাহ হইল তখন পার্বতী কৈলাস পর্বতে আসিয়া ঘরকন্না করিতে লাগিলেন। শিব খেয়ালশূন্য লোক, তাহাতে আবার ভূতের দল নিয়া থাকিতেন—মেয়েরা বাড়িতে থাকিলে কেমন করিয়া চলাফেরা করিতে হয় সেদিকে তাঁহার নজর একটু কম। যখন-তখন তিনি তাঁহার ভূতদের নিয়া বাড়ির ভিতর আসিয়া উপস্থিত হন, পার্বতী আর তাঁর সখীদের তাহাতে বড় অসুবিধা হয়। দারোয়ান নন্দী তাঁহাকে মানা করিলেও তিনি তাহা শোনেন না, তাঁহাকে ধমকাইয়া ঠিক করিয়া দেন।
পার্বতীর সখী জয়া আর বিজয়া ক্রমাগত বলেন, ‘ইহারা সকলেই শিবের লোক, কাজেই তাঁহার ধমকে ভয় পায়। আমাদের নিজের একটি ভাল লোক হইলে বেশ ভাল হইত।’ এ কথায় পার্বতী কাদা দিয়া যারপরনাই সুন্দর একটা
-
গণেশ কেমন যুদ্ধ করিয়াছিলেন তাহা বলিয়াছি, গণেশের বিবাহ কেমন করিয়া হইয়াছিল আজ তাহা বলিব।
যুদ্ধের পর হইতে শিব গণেশকে যারপরনাই স্নেহ করতেন, আর পার্বতীর তো কথাই নাই। কার্তিক যেমন শিব আর পার্বতীর পুত্র, গণেশ তাঁদের তেমনি পুত্র হইলেন, আর তাঁদের নিকট তেমনি স্নেহ পাইতে লাগিলেন।
কার্তিক আর গণেশ যখন বড় হইলেন, তখন একটা কথা লইয়া দু-জনের মধ্যে বড়ই তর্ক উপস্থিত হইল; কার্তিক বলেন, ‘আমি আগে বিবাহ করিব,’ গণেশ বলেন, ‘না, আমি আগে বিবাহ করিব।’
তাঁহাদের এইরূপ তর্ক শুনিয়া শিব আর পার্বতী বড়ই ভাবনায় পড়িলেন। দুই পুত্রকেই তাঁহারা সমান স্নেহ করেন; ইহাদের কাহাকে চটাইয়া কাহার বিবাহ আগে দেন? শেষে অনেক ভাবিয়া
-
অসুরেরা দেবতাদের শত্রু, তাই তাহাদিগকে মারিবার জন্য দেবতারা সর্বদাই চেষ্টা করেন। একবার ইন্দ্রের হুকুমে অগ্নি আর বায়ু দুজনে মিলিয়া অসুরদিগকে পোড়াইয়া ফেলিতে গেলেন। বাতাস যদি আগুনের সাহায্য করে, তবে তাহার তেজ বড়ই ভয়ংকর হয়। হাজার হাজার অসুর সেই আগুনের তেজে পুড়িয়া মরিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে আর সকল অসুরই মারা গেল, খালি পাঁচজন অসুর যে সমুদ্রের ভিতরে লুকাইয়া ছিল, অগ্নি আর বায়ু তাহাদিগকে মারিতে পারিলেন না।
সেই পাঁচটা অসুর যে কেবল জলের ভিতরে ঢুকিয়া প্রাণ বাঁচাইল তাহা নহে, মাঝে মাঝে জলের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া সংসারের সকল লোককে বিষম জ্বালাতনও করিতে লাগিল। তখন ইন্দ্র বলিলেন যে, “অগ্নি আর বায়ু সাগর
-
ইক্ষবাকু বংশে সগর নামে একজন অতি প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। বীরত্বে তাঁহার সমান আর সেকালে কোন রাজাই ছিলেন না। রূপে, গুণে, বিদ্যায়, সব বিষয়েই তিনি সুখী ছিলেন, কেবল এক বিষয়ে তাঁহার বড়ই দুঃখ ছিল, তাঁহার পুত্র ছিল না। পুত্র-লাভের জন্য তিনি তাঁহার বৈদর্ভী এবং শৈব্যা নাম্নী দুই রানীকে লইয়া কৈলাস পর্বতে গিয়া কঠিন তপস্যা আরম্ভ করিলেন। কিছুদিন পরে শিব রাজার তপস্যায় ভুষ্ট হইয়া তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, ‘মহারাজ, তুমি কী চাও?’
রাজা ভক্তিভরে শিবকে প্রণাম করিয়া জোড়হাতে বলিলেন, ‘ভগবান, আমার পুত্র নাই। আমার মৃত্যুর পর আমার বিশাল সাম্রাজ্য ভোগ করিবার লোক থাকিবে না, আমার বংশ লোপ হইয়া যাইবে। সুতরাং যদি আমার
-
বিশ্বকর্মার নাম তোমরা সকলেই শুনিয়াছ। বিশ্বকর্মা দেবতাদের কারিগর, আর কারিগরদের দেবতা। এই দেবতার একটি মেয়ে ছিল, তাঁহার নাম সংজ্ঞা। কেহ কেহ তাঁহাকে উষা আর সুরেণু বলিয়াও ডাকিত।
বাপের ঘরে সংজ্ঞা সুখেই ছিলেন। কিন্তু শেষে তাঁহার পিতা যখন সূর্যদেবের সহিত তাঁহার বিবাহ দিলেন, তখন হইতেই বেচারির দুঃখের দিন আরম্ভ হইল। সূর্যের যে কী ভয়ানক তেজ, তাহা তোমরা সকলেই দেখিতেছ। দূরে থাকিয়াই এত তেজ, কাছে গেলে সে কি রকম হইবে তাহা তো আমরা ভাবিয়াই উঠিতে পারি না। এর উপর আবার সেকালে নাকি সূর্যের তেজ এখনকার চেয়ে ঢের বেশি ছিল। তখন সূর্যের দেহ এমন সুন্দর গোল ছিল না, কদম ফুলের কেশরের মত ছিল,
-
দধীচি মুনির নাম হয়ত তোমরা অনেকেই শুনিয়াছ। তাঁহার মতন তপস্যা অতি অল্প লোকেই করিয়াছে। মহর্ষি দধীচি অতিশয় শান্ত আর পরম দয়ালু ছিলেন। গঙ্গার ধারে নিজের আশ্রমে থাকিয়া পত্নী প্রাতিথেয়ীকে লইয়া ভগবানের নাম করা, গাছপালার প্রতি যত্ন, সকল জীবে দয়া আর অতিথি আসিলে তাহার সেবা করা, এ সকল ছাড়া তাঁহার আর কাজ ছিল না। কিন্তু এই নিরীহ লোকটির তপস্যার এমনি তেজ ছিল যে, তাহার ভয়ে অসুরেরা তাহার আশ্রমের কাছে আসিতেই থর থর করিয়া কাঁপিত। অথচ দেবতাদিগকে সেই অসুরেরা জ্বালাতনের একশেষ করিত। কতকাল ধরিয়া যে ইহাদের যুদ্ধ চলিয়াছিল তাহার ঠিকানাই নাই। সেই যুদ্ধে কখনও দেবতারা জিতিতেন, কখনও বা অসুরদিগের নিকট হারিয়া বিধিমত
-
এক রাজা ছিলেন, তাঁহার নাম ছিল রৈবত ককুম্মী। পশ্চিম সমুদ্রের ধারে কুশস্থলী নামক নগরে তিনি বাস করিতেন। রৈবতের একটি কন্যা ছিল, তাহার নাম রেবতী। রেবতীর গুণের কথা আর বলিয়া শেষ করা যায় না। মেয়েটি দেখিতে যেমন অপরূপ সুন্দরী তেমনি সুশীলা ও মিষ্টভাষিণী আর বুদ্ধিমতীও যতদূর হইতে হয়।
রেবতী যতই বাড়িয়া উঠিলেন, রাজার মনেও ততই ভাবনা হইল যে, ‘আহা! আমার এই স্নেহের মেয়েটিকে এখন কাহার হাতে সমর্পণ করি?’
সংসারের যত ভাল ভাল রাজপুত্র একে একে সকলের সংবাদই রাজা লইলেন, কিন্তু; কাহাকেও তাঁহার পছন্দ হইল না। মন্ত্রী, পুরোহিত, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সকলকেই বলিলেন, কেহই তেমন ভাল একটি পাত্রের সন্ধান দিতে পারিল না।
শেষে
-
দেবতাদের যিনি রাজা, তাঁহাকে বলে ইন্দ্র। তাঁহার কথা তোমরা অবশ্যই শুনিয়াছ। (তাঁহার এক হাজার চক্ষু আর সবুজ রঙের দাড়ি ছিল; তাঁহার আসল নাম শক্রু, পিতার নাম কশ্যপ, রাণীর নাম শচী, পুত্রের নাম জয়ন্ত, হাতির নাম ঐরাবত, ঘোড়ার নাম উচ্চৈঃশ্রবা, সারথির নাম মাতলি, সভার নাম সুধর্মা, বাগানের নাম নন্দন আর অস্ত্রের নাম বজ্র। তাঁহার সভায় গন্ধর্বেরা গান গাহিত, অপ্সরারা নাচিত।
লোকে ভাবিত ইন্দ্র বড়ই সুখে থাকেন, আর অনেক সময়ই যে তিনি খুব জাঁক-জমকের ভিতর দিন কাটাইতেন, একথা সত্যও বটে। কিন্তু সময় সময় তাঁহাকে বেগও কম পাইতে হইত না। দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের ভয়ানক শত্রুতা ছিল, আর সেই সুত্রে অসুরেরা মাঝে মাঝে ইন্দ্রকে
-
এক রাজা ছিলেন, তাঁহার নাম ছিল শূরসেন। রাজার পুত্র না থাকায় তাঁহার মনে বড়ই দুঃখ ছিল। সেই দুঃখ দূর করার জন্য তিনি অনেক দান-ধ্যান, অনেক যাগযজ্ঞ করিলেন। তাহার ফলে শেষে তাঁহার একটি পুত্র হইল বটে, কিন্তু সে সাধারণ লোকের ছেলেপিলের মতন নহে। সে একটি ভীষণ সর্প। যদিও মানুষের মতন কথা কয়।
রাজা মনের দুঃখে বলিলেন, ‘হায় হায়। এই সর্প লইয়া আমি কী করিব? ইহার চেয়ে যে পুত্র না হওয়া আমার অনেক ভাল ছিল।’
কিন্তু সাপ সে কথা ভাবিলই না, সে রাজাকে বলিল, ‘বাবা, আমার চূড়াকরণ উপনয়ন করাইলে না? আমার হাতে-খড়ি দিলে না? তাহা হইলে যে আমি মুখ থাকিয়া যাইব!’
রাজা
ক্যাটাগরি
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.