-
দক্ষিণ এশিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস চর্চার বিষয় হচ্ছে, কিভাবে নতুন শক্তির প্রভাবে স্থানীয় রাজ্যসমূহে ভাঙ্গন ধরে, কিভাবে শাসকশ্রেণীকে পর্যুদস্ত করা হয়; এবং কিভাবে ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানাদি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ার ফল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন। এ রাষ্ট্র গঠন ছিল এমনি একটি রাজনৈতিক আইনগত প্রক্রিয়া যার মধ্যে বিশাল যুদ্ধের ভূমিকা খুব গৌণ। নতুন নতুন এলাকা একের পর এক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, প্রণীত হয়েছে নতুন আইন, স্থাপিত হয়েছে নতুন শোষণ ব্যবস্থা। ঐতিহাসিকগণ জানেন যে, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন ছিল একটি অবিরাম প্রক্রিয়া, যা সব সময় শ্রেষ্ঠ ঘটনাসমূহের সমান্তরালে চলেনি, যদিও তাঁরা ওসব ঘটনাকে সমধিক গুরুত্ব
-
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ লোকের মুখে মুখে সিপাহী বিদ্রোহ নামে প্রচলিত হয়ে এসেছে, এই নামটা আমরা পেয়েছিলাম ইংরেজদের কাছ থেকে। ব্র্রিটিশ সরকার এর নাম দিয়েছিলো Sepoy Mutiny অর্থাৎ সৈন্য বিদ্রোহ। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে তাই মনে হবে বটে তার কারণ গোরা সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহীদের স্বল্পবেতন উর্ধ্বতন নাগরিক প্রভুদের দুর্ব্যবহার এবং নানা রকম অভাব-অভিযোগ সৈন্যদের মধ্যে দীর্ঘদীন ধরে অসন্তোষ সঞ্চিত করে তুলছিল। এই সমস্ত অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল বলে ১৭৬৪ সালে দেশীয় সৈন্যদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সৈন্যদের মধ্যে এই জুলুম অবাধেই চলে আসছিল। ১৮৫৭ সালে দেশীয় সৈন্যরাই বিদ্রোহে প্রথম এবং প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এই সমস্ত কারণে
-
ভারত সরকারে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়ে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম সাহেব অনুভব করেছিলেন যে সরকারের কার্যকলাপের উপর নজর রাখার জন্য ব্রিটেনের মতো ভারতেরও একটি প্রতিনিধি সভা চাই। No taxation without representation—এই নীতি অনুসারে প্রতিনিধিসভা প্রয়োজন। তিনি সরকারি পদ ছেড়ে দিয়ে ভারতের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে তাঁদের নিয়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরজী, বদরুদ্দিন তৈয়বজী প্রমুখ ভারত বিখ্যাত গুণিজন। এঁদের মতে ব্রিটেনের মতো ভারত একটি নেশন। অতএব ব্রিটেনের মতো ভারতেরও একটি পার্লামেন্ট চাই। সেটি হবে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে যাবতীয় ভারতবাসী দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি সমূহের প্রতিষ্ঠান।
স্যর সৈয়দ আহমদ খান ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন অগ্রগণ্য নেতা। তাঁর
-
দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্র ও আলীগড় শিক্ষা কেন্দ্র এই উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে বিশেষ পরিচিত। অবশ্য আজকালকার দিনের শিক্ষিত তরুণ মুসলমানেরা আলীগড়ের নাম যে ভাবে জানে দেওবন্দ এর নাম তেমন করে জানে না। হিন্দুদের পক্ষে এ কথা সত্য, আলীগড়ের কথা তারা অনেকেই জানে কিন্তু দেওবন্দের কথা খুব কম লোকেই জানে। অথচ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্র যে দেশপ্রেমিক ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে, সেজন্য হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলের কাছেই তা স্মরণীয় থাকা উচিত ছিল।
এই উপমহাদেশের সুদুর পল্লী অঞ্চলে মুসলমানদের কাছে একসময় আলীগড়ের চেয়েও দেওবন্দের নামই কিন্তু অনেক বেশী পরিচিত ছিল। এর প্রধান কারণ দেওবন্দ কেন্দ্র উলেমাদের দ্বারা পরিচালিত এবং এখানে প্রাচীন
-
ডা. আনসারী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সর্বজন পরিচিত নেতা। তার পুরো নাম ডা. মুখতার আহ্মদ আনসারী। তাঁর পূর্বপুরুষেরা সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে বাইরে থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁরা সরকারের সামরিক ও বেসামরিক বিভাগে বিশিষ্ট পদ অধিকার করে এসেছেন। ডা. আনসারী ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান বর্তমান উত্তর প্রদেশের গাজীপুর জেলার ইউসুফপুর গ্রামে। ডা. আনসারী তাঁদের পরিবারের অন্যান্যদের মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেছিলেন। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পরেই তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য নিজাম সরকারের বৃত্তি পেয়ে লণ্ডনে চলে গেলেন। সেখানে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং পর্যায়ক্রমে এল.
-
১৯৩০-১৯৩১ সালে ধরা পড়ে আমরা বিপ্লববাদীরা যখন জেলে গেলাম—তখন ফ্যাসিবাদ কেন, সাম্রাজ্যবাদ কথাটারও সঠিক মানে বুঝতাম না। আমরা বুঝতাম আমাদের শত্রু বিদেশী ইংরেজ রাজত্ব; তারা শোষক ও লুণ্ঠনকারী। তাদের তাড়াতে হবে, পরাধীনতার শৃঙ্খল চূর্ণ করতে হবে। আন্দামানে দ্বীপান্তরে যখন গেলাম, তখনও এই রকমই মনোভাব।
আন্দামানেই প্রথম শুরু হল সবকিছু তলিয়ে বুঝবার চেষ্টা। পৃথিবীর নতুন নতুন ঘটনাবলী, নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং দেশকে স্বাধীন করবার উদগ্র বাসনা—সবকিছু মিলিয়ে আমরা অসীম আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম, বুঝতে চাইলাম—সাম্রাজ্যবাদ কি, সমাজতন্ত্রই বা কি, মুক্তির পথই বা কি রকম?
আন্দামানে প্রথম দিকে ওরা আমাদের কাছে খবরের কাগজ, পত্রিকা, বই, কিছুই আসতে দিত না। পরে অনশন ধর্মঘটে
-
১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটল। ভারতের রাজধানী দিল্লী শহর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্বাধীনে এসে গেল, আসলে এটা একটা আকস্মিক ব্যাপার নয়। বহুদিন আগে থেকেই ভারতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাকে এই অনির্বায পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল। যাদের দেখবার মত চোখ ছিল তারা দেখতেও পাচ্ছিলেন যে তার সর্বদেহে ক্ষয়রোগের লক্ষণগুলি ফুটে উঠেছে। এ এক বিরাট মহীরুহ, যার ভিতরকার সমস্ত সার পদার্থ একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাহলেও সাধারণের দৃষ্টির সামনে এতদিন সে তার প্রভুত্বব্যঞ্জক মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, অবশেষে সেই মহীরুহের পতন ঘটল; চমকিত হয়ে উঠল সবাই। দিল্লীশ্বরেরা জগদীশ্বরেরা শেষকালে এই হলো তার পরিণতি।
মুঘল সাম্রাজ্য সত্য কথা বলতে
-
ময়মনসিংহের উত্তরে গারো পাহাড়ের পাদদেশে ১৯৩৭ সাল থেকে শুরু করে সুদীর্ঘ বারো বৎসর টংক প্রথার বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী ও জঙ্গী সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল টংক প্রথা হচ্ছে কৃষকদের উপর এক প্রকার জঘন্য ও বর্বরতম সামন্তবাদী শোষণ। টংক কৃষকদের জমিতে কোন কর্তৃত্ব ছিল না। জমিতে ধান হোক বা না হোক টংক কৃষকদের জমির মালিক জমিদার ও অন্যান্যদের ধানে খাজনা দিতেই হতো। টাকায় খাজনা না দিয়ে এই প্রথার খাজনায় কৃষকরা মারাত্মক রকম শোষণের শিকার হতো। এই প্রথার বিরুদ্ধে এবং টাকায় খাজনা দেওয়ার দাবিতে টংক কৃষকের মরণপণ সংগ্রাম বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনে এক গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে।
শোষণে জর্জরিত হয়ে টংক কৃষকরা যখন
-
জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁদের নাম বিশেষ ভাবে স্মরণীয়। কিন্তু নিজেদের ইতিহাস সম্বন্ধে অজ্ঞতার ফলে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকদের ত্রুটি বিচ্যুতির দরুণ এই সমস্ত নাম বিস্মৃতির তলায় চাপা পড়ে যায়। এমনি একটি নাম বদরুদ্দিন তায়াবজী। ভারতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টদের নামের ধারাবাহিক তালিকায় তাঁর নামটা খুঁজে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তাঁর দেশের মানুষ তার সর্ম্পকে খুব কম খবরই রাখে।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যখন প্রথম গঠিত হয়, সে সময় যে ক’জন নেতৃস্থানীয় মুসলমান তার সঙ্গে যোগদান করেন, নিঃসন্দেহে বদরুদ্দিন তায়াবজী তার মধ্যে প্রধান। তিনি সে সময় ভারতের একজন বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী মুসলমান হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এটা এখনকার মুসলমান সমাজ
-
১৮২৬ সালের ১৭ই জানুয়ারী। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই দিনটি অবিস্মরণীয়। অবিস্মরণীয় বটে, কিন্তু স্মরণ করা যাক এই দিবসটির ইতিহাস ও তাৎপর্য আমাদের কজনেরই বা জানা আছে। আমাদের দেশের ঐতিহাসিকদের মধ্যে অধিকাংশের অজ্ঞতা, অবহেলা বা একদেশ দর্শিতার বশে এই দিবসটি বিস্মৃতির তলায় চাপা পরে গিয়াছে। আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ, এমনকি রাজনীতিবিদ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা পর্যন্ত এই দিবসটির তাৎপর্য সম্পর্কে উদাসীন। অথচ এই সময় থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা, এই তারিখেই যুক্ত প্রদেশের (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) রায়বেরেলির সৈয়দ আহমদ তার দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ বিরোধী জেহাদ শুরু করেছিলেন।
এই ব্রিটিশ বিরোধী জেহাদ অর্থাৎ স্বাধীনতা সংগ্রাম একমাত্র মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তার দুটো কারণ
-
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী-আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। এই সময় থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এক নূতন রূপ-সংগ্রামী রূপ গ্রহণ করল। নানা কারণে সারা ভারতের মধ্যে বাংলাদেশ সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সচেতনতা লাভ করেছিল। ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে সমগ্র ভারতকে এক নূতন পথের নিশানা দিল। এই আন্দোলন প্রধানতঃ বাংলা প্রদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বটে কিন্তু তার প্রবাহ দেখতে দেখতে সারা দেশে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই নূতন পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মূলে যার দায়িত্ব সর্বাধিক তিনি হচ্ছেন ভারতের তদানীন্তন বড়লাট লর্ড কার্জন। অবশ্য দুদিন আগে হোক বা পরে হোক ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামকে কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখা যেত
-
মওলবী লিয়াকত হোসেন
আজকের দিনে এই নামটি খুব কম লোকের কাছেই পরিচিতি। কিন্তু জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ নামটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। বস্তুতঃ লিয়াকত হোসেন বাঙালী নন তাঁর জন্ম হয়েছিল বিহারে। তা হলেও বাংলাদেশকে তিনি জন্মভূমির মতোই আপন বলে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। আমরা বাঙালিরাও যেন সেই দৃষ্টি নিয়ে তাঁকে দেখতে পারি।
মৌলবী লিয়াকত হোসেন এর প্রাথমিক জীবন সম্বন্ধে আমাদের কোনো কিছুই জানা নেই। একজন উদ্যোগী ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসাবেই তাঁর সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয়। তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপের মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। ১৯০৫ সালের কথা। সে সময় বড়লাট লর্ড কার্জন নবজাগ্রত বাঙালী শক্তিকে নিষ্পেষিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গভঙ্গের
ক্যাটাগরি
উৎস
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.