কৃষকসভা কেন?
১৯৩৭ ও ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের ভিতর থেকে অনেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা করতেন যে, আলাদা কৃষক সভা গড়ার আবার কী দরকার আছে? কংগ্রেসই তো কৃষক সভা, কংগ্রেসের দ্বারাই কৃষকদের দাবি-দাওয়ার আন্দোলন ও লড়াই চলতে পারে। কংগ্রেসের ভিতর থেকে কেউ কেউ আমাদের বিরুদ্ধে এই নালিশও করেছেন যে, কৃষক সভা গড়তে গিয়ে আসলে আমরা একটা পাল্টা কংগ্রেস গড়ছি। পরে অবশ্য এই সব আপত্তি কমে যায়। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মতো বড় বড় কংগ্রেস নেতা মেনে নেন যে কৃষকদের আলাদা সংগঠনের, অর্থাৎ, কৃষক সভার দরকার আছে।
বাংলার মুসলিম লীগের অনেকেও ঐ রকম কথাই তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, কী দরকার আছে আলাদা কৃষক সমিতির? মুসলিম লীগই তো কৃষকদের দাবি-দাওয়ার জন্যে লড়ে, মুসলিম লীগের মেম্বার হলেই তো কৃষকদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হতে পারে। এ সম্বন্ধে আমার প্রথম কথা এই যে, কলকারখানার এলাকাগুলোতে মজুরদের শ্রেণিগত সংগঠনের রূপে মজুর ইউনিয়নগুলো যেমন আছে, গাঁ-এর অঞ্চলগুলোতেও তেমনই খেত-খামারের কৃষকদের জন্যে গড়ে উঠেছে তাদের শ্রেণিগত সংগঠন হিসাবে কৃষক সমিতিগুলো। কারখানার এলাকাগুলোতে যত সব মজুর ইউনিয়ন আছে সেই সব একত্রে মিলিত হয়েছে ‘সারা ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’ নামক প্রতিষ্ঠানে। কৃষকদের শ্রেণি সংগঠন সারা ভারতের গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠছে। সারা ভারতের আলাদা আলাদা জায়গার কৃষক সভা বা সমিতিগুলো এক হয়ে যে নাম নিয়েছে সে নাম হচ্ছে সারা ভারতের কৃষক সভা। আগেই আমি সে-কথা বলেছি।
কৃষকরা হচ্ছেন দেশের সবচেয়ে বড় অংশ, শতকরা প্রায় ৮০ জন। কৃষক না বাঁচলে, খাওয়ার ফসল পয়দা করে সবাইকে না খাওয়ালে দেশ বাঁচতে পারে না। কৃষক ধ্বংস হলে দেশও ধ্বংস হবে। ...এই কৃষককে বাঁচতে হবে, এবং মানুষের মতো বাঁচতে হবে। তারই জন্যে চাই কৃষকের আপন সংগঠন কৃষক সভা।
সারা ভারত কৃষক সভা কংগ্রেস কিংবা লীগ কারুর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে গড়ে ওঠেনি। তাদের কারুর শক্তি খর্বও করেনি। বরং তাদেরই শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক গণ-প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠেছে। কৃষকদের স্বতন্ত্র সংগঠনের দরকার যদি না থাকত তবে তা সম্ভব হত না। সরকার, জমিদার এবং মহাজনের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে কৃষক সভার জন্ম। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা জমিদারি প্রথা ভারতবর্ষকে শিল্পে অনুন্নত করে রেখেছে, কৃষির উন্নতিকে ঠেকিয়ে রেখেছে, ভারতের অধিকাংশ লোককে করে রেখেছে গরিব এবং পরনির্ভরশীল। এই প্রথার বিরুদ্ধে মজুর এবং কৃষকেরাই লড়তে পেরেছে। এই লড়াইয়ের ভিতর দিয়েই কৃষক সভার শক্তি বেড়েছে। কৃষক সভা কৃষকদের শিখিয়েছে ফসল বাড়িয়ে সর্বসাধারণের খাদ্যের অভাব দূর করতে। এ বছর কৃষক সভার উদ্যোগে শুধু বাংলা এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষকেরা প্রায় ২২ লক্ষ মন চাউল বেশি পয়দা করেছে। যখন দুর্ভিক্ষে দেশময় হাহাকার উঠেছিল তখন কৃষক সভা নেমেছিল খাল কেটে, বাঁধ বেঁধে, বীজ জোগাড় করে জমির চাষ বাড়াবার কাজে, যাতে দেশের সকল লোক সস্তায় পেট ভরে খেতে পায়। কৃষক সভা লড়েছে দাসত্ব ও দমননীতির বিরুদ্ধে, কৃষক সভা লড়েছে কৃষকদের খাজনা, দেনা ও করভার থেকে মুক্ত করবার জন্যে। কৃষক সভার ভিতর কৃষকরা একতাবদ্ধ হয়েছে এবং রাজনীতিক্ষেত্রে ঐক্য আনার জন্যে লড়ে চলেছে। কৃষকদের যেখানে সমস্বার্থ সেখানেই কৃষক সভা বুক পেতে দাঁড়িয়েছে, কৃষকদের শিখিয়েছে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে সাহস করে এগিয়ে যেতে। এই কাজের ভিতর দিয়েই কৃষক সভা প্রমাণ করেছে যে তার আলাদা অস্তিত্বের দরকার আছে, বিনা প্রয়োজনে কোনও দলের কল্পনা থেকে এর সৃষ্টি হয় নি। কাগ্রেসপন্থী কৃষক, লীগপন্থী কৃষক, কমিউনিস্ট কৃষক, এবং যে কৃষকরা কোনো পন্থারই নয়— তাদের সকলেই আসবেন কৃষক সভার ভিতরে, যাতে কৃষক সভা সমস্ত যুবকদের একতা ও শক্তি বাড়াতে পারে। কৃষকদের একতা ও শক্তি কংগ্রেস
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments