মূল্য প্রকাশের বিভিন্ন রূপ
বিনিময় প্রথার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পণ্যোৎপাদন বিকাশ লাভ করিয়াছে। পণ্যোৎপাদনের বিকশিত অবস্থায় সরাসরি দুইটী পণ্যের বিনিময় হয় না। পণ্য ক্রয় বিক্রয় হয়, উহাদের মুদ্রায় পরিবর্তিত করা হয়। মূল্যের মুদ্রারূপটি সম্পর্কে ভাল করিয়া জানার পূর্বে আগেকার মূল্যরূপ এবং উহাদের ক্রমিক বিকাশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া আবশ্যক।
উৎপাদন যখন প্রায় সবটাই ছিল স্বাভাবিক, তখন পণ্যে পণ্যে বিনিময় হইত আকস্মিক ভাবে। পণ্যের সহিত পণ্যের বিনিময় হইত পৃথক পৃথক ভাবে। এইরূপ বিনিময়কে বলা যাইতে পারে প্রাথমিক মূল্যরূপ। ২০ গজ বস্ত্র = ১ কোট, অথবা ক পণ্য ব = খ পণ্য দ; এইরূপ সমীকরণের মধ্য দিয়া প্রাথমিক মূল্যরূপের প্রকাশ হয়। বৈজিক সংখ্যায় সমীকরণটীতে ‘ব’ এবং ‘দ’ পণ্যের নাম, ‘ক এবং ‘খ’ পণ্যেও পরিমাণ।
সমীকরণের দক্ষিণ পক্ষটীকে বলা হয় আপেক্ষিক রূপ, বাম পক্ষটীকে বলা হয় তুল্যরূপ; দুইটীর একই কাজ নয়। কাজ নয়। বস্ত্র নিজের মূল্য প্রকাশ করিতেছে কোটের মধ্যে; কোট নিষ্ক্রিয়—ইহা যেন একটি দর্পণ। বস্ত্র মূল্য প্রকাশ করিতেছে কোটের মধ্যে, কোট নিজের মধ্যে বস্ত্রের মূল্য প্রকাশিত হইতে দিতেছে। কোনও পণ্যই নিজের মধ্যে দিয়া আপন মূল্য প্রকাশ করিতে পারে না। ২০ গজ বস্ত্র = ২০ গজ বস্ত্র এইরূপ বলায় কোন অর্থ হয় না। অতএব কোন একটী পণ্যের মূল্য প্রকাশ করিতে প্রয়োজন অন্য একটি পণ্যের।
উপরের দৃষ্টান্তটি হইতে আমরা দেখিতেছি, একটী পণ্যের ব্যবহার মূল্য অপর একটি পণ্যের মূল্য প্রকাশ করিতেছে। মূল্য এবং ব্যবহার মূল্য যেন এখানে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে। এখানে বস্ত্র শুধু মূল্যরূপেই প্রকাশ পাইতেছে, কোট শুধু ব্যবহার মূল্যরূপেই প্রকাশ পাইতেছে। বস্ত্রের মূল্য যেন উহার ব্যবহার মূল্য হইতে পৃথক হইয়া পড়িয়াছে এবং অপর একটি পণ্যের সঙ্গে সমীকৃত হইয়াছে।
উপরের সমীকরণটীতে কোটকে আমরা তুল্যরূপে দেখিয়াছি; এই তুল্যটির মধ্য দিয়া বস্ত্র নিজের মূল্য প্রকাশ করে; বস্ত্রকে আমরা বলি আপেক্ষিক। আপেক্ষিক ও তুল্যের মধ্য দিয়া দু’য়ের মধ্যে নিহিত শ্রমের পরিমাণকেই ব্যক্ত করা হইতেছে। বুনন ও সীবন বিভিন্ন কাজ হইলেও মূলত দুই-ই মানুষের শ্রম, মানুষেরই দৈহিক অপচয়। এখানে আমরা দেখিতেছি বিভিন্ন পণ্য সমাজের মোট শ্রমের বিভিন্ন রূপ।
তুল্য সম্পর্কে এখানে আমরা তিনটি বিষয় লক্ষ্য করিতেছি।
তুল্য স্বয়ং একটি ব্যবহার মূল্য, ইহার মধ্য দিয়া মূল্যের প্রকাশ হয়। তুল্য বাস্তব শ্রমের ফল, কিন্তু ইহার মধ্য দিয়া মূর্ত্ত শ্রমের প্রকাশ হয়। তুল্য যথার্থত ব্যক্তির শ্রমের ফল, কিন্তু ইহার মধ্য দিয়া সর্বসাধারণের সামাজিক শ্রমের প্রকাশ হয়। ব্যবহার মূল্য ও মূল্য, বাস্তব শ্রম ও বিমূর্ত্ত শ্রম, ব্যক্তিগত শ্রম ও সামাজিক শ্রম—তুল্যের মধ্যে আমরা এই বিরুদ্ধ সত্যগুলির অবস্থিতি দেখিতে পাই।
বিনিময়ের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক রূপটি প্রসারিতরূপে (Expanded Form) পরিণত হইয়াছে। এখন একটি পণ্যের সঙ্গে একটি পণ্যেরই নয়, অনেক বেশী পণ্যের সমীকরণ হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বস্ত্র, এখন মাত্র কোটের সঙ্গেই নয়, শস্য, লোহা প্রভৃতি অন্যান্য পণ্যের সঙ্গেও সমীকৃত হয়। প্রাথমিক রূপটিতে বস্ত্র অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে পৃথক পৃথক সম্বন্ধ স্থাপন করে; যথা—
২০ গজ বস্ত্র = ১ কোট
২০ গজ বস্ত্র = ২ জোড়া জুতা
২০ গজ বস্ত্র = ১ মণ ধান, ইত্যাদি।
কিন্তু মূল্য প্রকাশের প্রসারিত রূপটীতে বস্ত্র বহু প্রকার পণ্যেও সঙ্গে সমীকৃত হয়, যথা
১ কোট
২০ গজ বস্ত্র : } ২ জোড়া জুতা
১০ পাউণ্ড চা, ইত্যাদি।
বস্ত্রের মূল্য এখন অপরাপর যাবতীয় পণ্যের মধ্য দিয়া প্রকাশ করা হইয়াছে। ইহাদের প্রত্যেকটাই এখন বস্ত্রের নিকট দর্পণের মতো; কারণ ইহাদের মধ্য দিয়া বস্ত্র নিজের সারবস্তু অর্থাৎ মূল্যকে দেখিতেছে একটী বিশেষ পণ্যের মূল্য বহু পণ্যের মধ্য দিয়া প্রকাশিত হওয়ায়, ইহা এখন সুস্পষ্ট
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments