জটাধরের বিপদ
নূতন দিল্লির গোল মার্কেটের পিছনের গলিতে কালীবাবুর বিখ্যাত দোকান ক্যালকাটা টি ক্যাবিন। এই আড্ডাটির নাম নিশ্চয়ই আপনারা শুনেছেন।
সতরোই পৌষ, সন্ধ্যা ছটা। পেনশনভোগী বৃদ্ধ রামতারণ মুখুজ্যে, স্কুলমাষ্টার কপিল গুপ্ত, ব্যাংকের কেরানী বীরেশ্বর সিংগি, কাগজের রিপোর্টার অতুল হালদার, এবং আরও অনেকে আছেন। আজ নিউইয়ার্স ডে, সেজন্য ম্যানেজার কালীবাবু একটু বিশেষ আয়োজন করেছেন। মাংসের চপ তৈরি হচ্ছে। রামতারণবাবু নিষ্ঠাবান সাত্ত্বিক লোক, কালীবাড়ির বলি ভিন্ন অন্য মাংস খান না। তাঁর জন্য আলাদা উননে মাছের চপ ভাজবার ব্যবস্থা হয়েছে।
সিগারেট তামাক আর চপ ভাজার ধোঁয়ায় ঘরটি ঝাপসা হয়ে আছে, বিচিত্র গন্ধে আমোদিত হয়েছে। উপস্থিত ভদ্রলোকদের জনকয়েক পাশা খেলছেন, কেউ খবরের কাগজ পড়ছেন, কেউ বা রাজনীতিক তর্ক করছেন।
অতুল হালদার বললেন, ওহে কালীবাবু আর দেরি কত? চায়ের জন্যে যে প্রাণটা চ্যাঁ চ্যাঁ করছে। কিন্তু খালি পেটে তো চা খাওয়া চলবে না, চটপট খানকতক ভেজে ফেল।
কালীবাবু বললেন, এই যে সার, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চপ রেডি হয়ে যাবে।
এমন সময় জটাধর বকশী প্রবেশ করলেন।[১] চেহারা আর সাজ ঠিক আগের মতনই আছে, ছ ফুট লম্বা মজবুত গড়ন, কাইজারী গোঁফ, গায়ে কালচে-খাকী মিলিটারী ওভারকোট, মাথায় পাগড়ির মতন বাঁধা কম্ফর্টার, অধিকন্তু কপালে গুটিকতক চন্দনের ফুটকি আর গলায় একছড়া গাঁদা ফুলের মালা। ঘরে ঢুকেই বাজখাঁই গলায় বললেন, নমস্কার মশাইরা, খবর সব ভাল তো?
বীরেশ্বর সিংগি একটু আঁতকে উঠলেন, রামতারণবাবু রেগে ফুলতে লাগলেন। কপিল গুপ্ত সহাস্যে বললেন, আসতে আজ্ঞা হক জটাধরবাবু আপনি বেঁচে উঠেছেন দেখছি। আজকেও ভুত দেখাবেন নাকি?
পটকার মতন ফেটে পড়ে রামতারণবাবু বললেন, তোমাকে পুলিসে দেব, বেহায়া ঠক জোচ্চোর! ভূত দেখাবার আর জায়গা পাও নি।
জটাধর বকশী প্রসন্নবদনে বললেন, মুখুজো মশায়ের রাগ হবারই কথা, আমার রসিকতাটা একটু বেয়াড়া রকমের হয়েছিল তা মানছি। মরা মানুষ সেজে আপনাদের ভয় দেখিয়েছিলুম সেটা ঠিক হয়নি। তার জন্যে আমি ভেরি সরি। মশাইরা যদি একটু ধৈর্য ধরে আমার কথা শোনেন তো বুঝবেন আমার কোনও কুমতলব ছিল না।
রামতারণ মুখুজো ক্রুদ্ধে বিড়ালের ন্যায় মৃদুমন্দ গর্জন করতে লাগলেন। কপিল গুপ্ত বললেন, কি বলতে চান বলুন জটাধরবাবু।
অতুল হালদারের পাশে বসে পড়ে জটাধর বললেন, মশাইরা নভেল পড়ে থাকেন নিশ্চয়? প্রেমের গল্প, বড় ঘরের কেচ্ছা, ডিটেকটিভ কাহিনী, রূপসী বোম্বেটে, এই সব? তার জন্যে কিছু পয়সাও খরচ করে থাকেন। কিন্তু বলুন তো, গল্পের বইএ কিছু সত্যি কথা পান কি? আজ্ঞে না, আপনারা জেনে শুনে পয়সা খরচ করে ডাহা মিথ্যে কথা পড়েন, তা শরৎ চাটুজ্যেই লিখুন আর পাঁচকড়ি দেই লিখুন। কেন পড়েন? মনে একটু ফুর্তি একটু সুড়সুড়ি একটু টিপুনি একটু ধাক্কা লাগাবার জন্যে। গল্প হচ্ছে মনের ম্যাসাজ, চিত্তের ডলাই মলাই, পড়লে মেজাজ চাঙ্গা হয়। আমি কি-এমন অন্যায় কাজটা করেছি মশাই? রামতারণবাবু প্রবীণ লোক, ওঁকে ভক্তি করি, ওঁর সামনে তো ছ্যাবলা প্রেমের কাহিনী বলতে পারি না, তাই নিজেই নায়ক সেজে একটি নির্দোষ পবিত্র ভূতের গল্প আপনাদের শুনিয়েছিলুম।
রামতারণ বললেন, তোমার চা চুরুট পানের জন্যে আমার যে সাড়ে চোদ্দ আনা গচ্চা গিয়েছিল তার কি?
—তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ। ছ-সাত টাকার কমে আজকাল একটা গল্পের বই মেলে না সার। আমি সেদিন অতি সস্তায় আপনাদের মনোরঞ্জন করেছিলুম।
কপিল গুপ্ত বললেন, যাই হক, কাজটা মোটেই ভাল করেন নি, আচমকা সবাইকে একটা শক দেওয়া অতি অন্যায়। একটু হলেই তো বীরেশ্বরবাবুর হার্ট ফেল হত।
জটাধর হাত জোড় করে বললেন, আচ্ছা, সে অপরাধের জন্যে মাপ চাচ্ছি, আজ তার দণ্ডও দেব। ও ম্যানেজার কালীবাবু মশাই, বিস্তর চপ ভাজছেন দেখছি, এক-একটার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments