মেশিনের উৎপত্তি

একজন পুঁজিপতির অধীনে যখন বহু শ্রমিক উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত হইয়াছে, তখন হইতেই পুঁজিতন্ত্রী উৎপাদনের শুরু। বহু শ্রমিকের এক সঙ্গে একই কারখানায় কাজ করাকে মার্কস্ আখ্যা দিয়াছেন ‘কো-ওপারেশন’। পুঁজিতন্ত্রের শুরুতে উৎপাদনের যন্ত্রপাতির চেহারা বদলায় নাই। যন্ত্রপাতির দিক হইতে আগেকার যুগের সহিত পুঁজিতন্ত্রের তখনো তেমন প্রভেদ দেখা দেয় নাই। একজন পুঁজিপতি এখন বহু শ্রমিককে সমবেত ভাবে খাটায়। পূর্ববর্ত্তী যুগের সঙ্গে প্রভেদ শুধু এতটুকুই।

সকল শ্রমিকের উৎপাদন ক্ষমতা একই রকম নয়। একজন শ্রমিক ঘণ্টায় যতটুকু উৎপাদন করে, অন্য একজন হয়ত তাহার চেয়ে কম উৎপাদন করে। কিন্তু দশজন শ্রমিক একসঙ্গে সমবেত ভাবে কাজ করিলে, একজনের উৎপাদনের ন্যুনতা অন্য শ্রমিকদের অধিক উৎপাদন দ্বারা পরিপূরণ হইতে পারে। পুঁজিপতি তাহার অধীন সমস্ত শ্রমিককে একটী সমষ্টি অথবা একজন শ্রমিক রূপে দেখে। সমবেত শ্রমের দরুন উৎপাদন কার্য্যে কতকগুলি পরিবর্তনের সৃষ্টি হয়। কাজ হয় একই কারখানাবাড়ীতে, আসবাবপত্রও সকলে একসঙ্গেই ব্যবহার করে। দশজন শ্রমিকের জন্য যেটুকু স্থান এবং যে-সরঞ্জামের আবশ্যক হয়, পনের জনেরও প্রায় তাহাতেই চলিয়া যায়। যে-ঘরে কুড়িজন শ্রমিক কাজ করে তাহা একজন শ্রমিকের পক্ষে খুবই বড়। কিন্তু দুই দুই জন শ্রমিকের জন্য যদি পৃথক পৃথক দশটী ঘর করিতে হয়, তবে যে-খরচ পড়িবে তাহা নিঃসন্দেহে কুড়িজনের উপযোগী একটী ঘরের খরচ অপেক্ষা বেশী। উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ সম্পর্কেও ইহা খাটে বেশী লোক একত্র খাটিলে বেশী উপকরণের প্রয়োজন হয় সত্য, কিন্তু পৃথক পৃথক কাজ করিলে যে খরচ হয় সেই অনুপাতে তাহা বাড়ে না। বহু শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করে বলিয়াই এই সুবিধাটুকু দেখা দেয় একসঙ্গে কাজ করার দরুন নূতন একটা শক্তির উদ্ভব হয়—ইহা শ্রমিকের সমষ্টিগত শক্তি। সমবেত কাজে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়; শ্রমিকের পৃথক পৃথক কাজের যোগফল আর সমষ্টিগত শ্রমের মোট উৎপাদন কখনো এক নয়। একটী সৈন্য বাহিনীর সমষ্টিগত শক্তি নিশ্চয়ই একক সৈন্যদের পৃথক পৃথক শক্তির যোগফল হইতে ভিন্ন।

পুঁজিতন্ত্রের গোড়ার দিকটায় উৎপাদনের রীতি মোটেই বদলায় নাই। তখনো হাতিয়ার ছিল আগেকার যুগের হস্তশিল্পীদেরই হাতিয়ার। মার্কস্ পুঁজিতন্ত্রের এই স্তরটীর নাম দিয়াছেন ‘মেনুফেকচার’। মেনুফেকচারের সময়েই শ্রমবিভাগ সূক্ষ্মতর হইয়াছে। কারখানার শ্রমিকেরা এখন পুরা দ্রব্যটী তৈয়ার না করিয়া উহার বিভিন্ন অংশ তৈয়ার করে। একটী বিশেষ কাজই করিতে হয় বলিয়া শ্রমিক এখন তাহার নিজের কাজটিতে দক্ষতা অর্জন করে। প্রত্যেক শ্রমিককে দ্রব্যের এক একটী অংশ তৈয়ার করিতে হয়, এই কারণে নূতন নূতন হাতিয়ারেরও প্রয়োজন হয়। ইহা হইতেই ধীরে ধীরে সৃষ্টি হইয়াছে সূক্ষ্ম যন্ত্রাদির এবং কলকব্জার।

‘মেনুফেকচার’-শ্রমবিভাগের প্রবর্তন দ্বারা শ্রমিককে কতকটা পুঁজিপতির বশবর্ত্তী করিতে পারিয়াছে। কিন্তু তখনো হাতের কাজেরই প্রাধান্য; এই কারণেই মেনুফেকচারের যুগে শ্রমিক তাহার ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ হারায় নাই। মেশিনের আবিষ্কার ব্যতীত শ্রমিককে সম্পূর্ণ ভাবে পুঁজির বশীভূত করা সম্ভব নয়। মেশিনের আবিষ্কার করেন আর্করাইট; ইহার আবিষ্কার দ্বারাই উৎপাদন পদ্ধতির যথার্থ পরিবর্তন সংঘটিত হইয়াছে।

এখন আমরা দেখিব কি ভাবে সামান্য হাতিয়ার হইতে জটিল মেশিনের উৎপত্তি হইয়াছে।

একটী মত আছে, সরল মেশিনই হাতিয়ার, আর জটিল হাতিয়ারই মেশিন; দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কিছুই নাই। অপর একটী মত আছে, হাতিয়ার চালনা করে মানুষের শক্তি; কিন্তু মেশিন অন্য কোন কিছুর শক্তিদ্বারা চালিত হয়, যেমন জন্তু, জল, বায়ু। এই উক্তি অনুসারে লাঙ্গলও এক প্রকারের মেশিন: কেননা লাঙ্গল টানে জন্তুতে।

পূর্ণ বিকশিত কলের তিনটী অংশ: প্রথম, প্রেরক যন্ত্র (motor mechanism); দ্বিতীয়, বাহন যন্ত্র (transmitting); তৃতীয়, কাজ করার যন্ত্র (working tool)। ষ্টীম, ইলেক্ট্রিসিটি, জল, বায়ু ইত্যাদি প্রেরক শক্তি। ফ্লাই হুইল, পুলি, দড়িদড়া প্রভৃতি বাহন যন্ত্র। কিন্তু যে-যন্ত্র দ্বারা কাজ করা হয়, সর্বপ্রথম তাহাই রূপান্তরিত হইয়া শিল্প বিপ্লব প্রবর্তন করিয়াছে।

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice