মরুভূমির কথা
‘দুই পপলার’ কুয়ো
আমরা যাচ্ছি কারাকুম মরুভূমিতে। আমাকে সঙ্গে নিয়েছেন কুলি চাচা। তিনি মেষপালক।
আগে রাখালেরা ভেড়ার পাল নিয়ে চলে যেত বহু মাসের জন্যে। কিন্তু এখন মোটর গাড়ি অনেক, রাখালদের বদলি আসে দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর। আমরাও বদলিতে চলেছি। লম্বা রাস্তা, যাব ‘দুই পপলার’ নামে একটা কুয়োর কাছে। লোকেদের মতো মরুভূমির সমস্ত কুয়োরই এক-একটা নাম আছে। এ কুয়োটার কাছে আছে দুটো পপলার গাছ। গোটা মরুভূমিটার মাঝখানে দুটো পপলার, সমস্ত রাখাল তাদের জানে। রাখালদের ডেরায় আমার অপেক্ষায় আছেন দাদু চারি-আগা। ভেড়ার পাল নিয়ে সারা জীবন তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন মরুভূমিতে। বসন্ত শুরু হতেই তিনি চলে যান ‘দুই পপলারে’, থাকেন বেশ শীত পড়া পর্যন্ত। আর শীত তুর্কমেনিয়ায় অল্পকালের জন্যে।
ডেরায় আমার অপেক্ষায় আরো আছে বুঝদার কুকুর আকবাই, আছে বাইরও, বুড়ো উটের এই নাম। বুড়ো ওরা সবাই: চারি-আগা, আকবাই, বাইর—সবাই।
মরুতে বসন্ত
ভাবছ কারাকুম মরুভূমি কেবল বালি? মরা, আগুনে মাটি। তবে সেটা সব সময়ের জন্যে নয়।
বসন্তে সবকিছু জেগে ওঠে। ঢিপিগুলোয় যেন আগুন ধরে লাল পপি ফুলে, তার পরে সবকিছু, সবুজ।
গজায় সিউজেন, কান্দিম, বর্জাক, গ্রেবেনশিক, চেরকেজ, শক্ত কাঠের সাকসাউল ঝাড়, কাঁটাগাছ। ইশ্কি— চায়ের বদলে সেদ্ধ করে খাওয়া যায়। সের্পোনোসিক—অনেকটা যেন রশুন।
ওখানে বালিয়াড়ির ওপর ছতরে আছে সেলিন। শিগগিরই রোদে সব পুড়ে যাবে কিন্তু সেলিন থাকবে সবুজ। গমজাতীয় এই তৃণ জল জমিয়ে রাখে তার শিকড়ে।
উড়ে এল ঈগল পাখি, মেঠো ইঁদুর কিংবা খরগোশের সন্ধানে।
পথ থেকে সরে এসে গর্তে ঢুকতে লাগল মুটকো বেলে ছুঁচো।
জিরিয়ে নেবার জন্যে আমরা থামলাম পরিত্যক্ত একটা কুয়ার কাছে, দেখলাম কেউটে সাপ। লেজের ওপর সেটা দাঁড়িয়েছিল ফণা তুলে, কিন্তু আমরা ওকে ছুঁলাম না। এখন সাপ বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। তাদের বিষ ওষুধে লাগে।
আরো আমরা দেখলাম জেইরান। আহ্, কী জোরে যে ছোটে! পরে আমাদের মাথার ওপর পাক দিতে থাকল রোলার পাখি—প্রকান্ড, আকাশের মতো জ্বলজ্বলে।
ডেরায় আমরা পৌঁছলাম সন্ধ্যায়। ধবধবে প্রকান্ড সূর্য নেমে এসেছে দূরের বালিয়াড়িটায়। রাখালেরা ফেল্ট কম্বলের ওপর বসে খাচ্ছে চা আর ভেড়ার মাংসের কোর্মা।
চারি-আগা উঠে দাঁড়িয়ে আদাব দেয়া-নেয়া করলেন কুলি চাচার সঙ্গে, হাত রাখলেন আমার কাঁধে।
ভেড়াগুলো এক জায়গায় জড়ো হয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখছিল নবাগতদের। চারি-আগার যোগাড়ে বাঁধাছাঁদা করছিল উটকে। স্তেপে, রাত কাটাবার জায়গায় তা খাবার, জল, কম্বল নিয়ে যাবে। মাঝরাতে ভেড়াগুলোও সেখানে জিরবে। এরা চরে রাতে। দিনের বেলা খুবই গরম।
কুলি চাচা তাড়াতাড়ি জুতো বদলে নিলেন। পরলেন নকল চামড়ার উঁচু বুট যাতে কাঁটা-টাঁটা থেকে পা বাঁচে, অন্ধকারে সাপখোপ বিছে-টিছের গায়েও তো পা পড়তে পারে।
‘এতটা রাস্তা এলি, একটু জিরিয়ে নে,’ কুলি চাচাকে বললেন চারি-আগা। ‘এমনিতেই অনেক জিরিয়েছি, স্তেপে যাবার জন্যে আর তর সইছে না।’
জিগ্যেস করলাম, ‘‘আমিও স্তেপে যেতে পারি?’
‘তুই আর আমি যাব কালকে,’ কথা দিলেন চারি-আগা, ‘আজকে চা খাব আর আসমানের তারা দেখব।’
‘গল্প বলবে আমায়?’
‘বলব।’
গল্প
সূর্য অস্ত গেল। অন্ধকার নামল মরুভূমিতে। ছাউনির পেছন থেকে এল আমার বন্ধু বাইর, সে আমায় চিনতে পারল। আমি তার গা-গলা চুলকে দিলাম। নিশ্বাস ফেলে উটও বসে পড়ল হাঁটু মুড়ে। সেও এসেছে চারি-আগার গল্প শুনতে।
চারি-আগা কথা বলেন আস্তে আস্তে, যেন নিজের কথাই শুনছেন কান পেতে। একটা গল্প শেষ করেই উনি শুরু করেন আরেকটা।
অন্ধকারের মধ্যে থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল বুড়ো কুকুর আকবাই, চারি-আগার কাছে বসে সেও শুনতে লাগলে। শোনে, শোনে আর ঝিমোয়। একেবারে বুড়িয়ে গেছে।
‘অনেককাল আগে ছিল এক ধনী বাই। ভেড়া আর ঘোড়া তার এত যে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments